গ্যাস লিকেজের আলামত মেলেনি, তদন্ত কমিটি যা পেল

বিস্ফোরণে তছনছ হয়ে যায় ঘরের আসবাবপত্রছবি: প্রথম আলো

চট্টগ্রাম হালিশহরের একটি ফ্ল্যাটে বিস্ফোরণের ঘটনায় তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (কেজিডিসিএল)। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, গ্যাস লিকেজ থেকে ওই বিস্ফোরণ হয়নি।

গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ভোর সাড়ে চারটার দিকে চট্টগ্রাম নগরের হালিশহরের হালিমা মঞ্জিল নামের একটি ছয়তলা ভবনের তৃতীয় তলার একটি ফ্ল্যাটে ওই বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। সেখানে মোটর পার্টস ব্যবসায়ী শাখাওয়াত হোসেন পরিবার নিয়ে থাকতেন। বিস্ফোরণে ওই বাসার ৯ জন দগ্ধ হন, যার মধ্যে ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসা নিচ্ছে তিন শিশু।

ঘটনার পর সেখানে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা আগুন নেভানোর কাজ করেন। বিস্ফোরণের সময় ভবনটির অন্তত ১৫টি ফ্ল্যাটের মূল দরজা ভেঙে যায়। ফলে বিস্ফোরণের কারণ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ফায়ার সার্ভিসের ধারণা, বাসাটির গ্যাসের লাইন থেকে নির্গত হওয়া গ্যাস জমে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। তবে গ্যাস লিকেজ থেকে এ ঘটনা হয়নি বলে দাবি কেজিডিসিএলের তদন্ত কমিটির।

ঘটনার পর সেখানে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা আগুন নেভানোর কাজ করেন। বিস্ফোরণের সময় ভবনটির অন্তত ১৫টি ফ্ল্যাটের মূল দরজা ভেঙে যায়। ফলে বিস্ফোরণের কারণ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ফায়ার সার্ভিসের ধারণা, বাসাটির গ্যাসের লাইনে থেকে নির্গত হওয়া গ্যাস জমে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। তবে গ্যাস লিকেজ থেকে এ ঘটনা হয়নি বলে দাবি কেজিডিসিএলের তদন্ত কমিটির।

বিস্ফোরণের ঘটনায় এ ছাড়া পৃথক তদন্ত কমটি গঠন করেছিল ফায়ার সার্ভিস ও জেলা প্রশাসন। দুটি কমিটিকেই সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। তবে দুটি কমিটিই এখন পর্যন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি। কেজিডিসিএলের কমিটিকে চার কর্মদিবস সময় দেওয়া হয়েছিল। ঘটনার প্রায় তিন সপ্তাহের মাথায় প্রতিবেদন দিয়েছে সংস্থাটির গঠিত তদন্ত দল।

তদন্ত প্রতিবেদনে যা আছে

কেজিডিসিএলের বিতরণ উত্তর বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ রফিক খানকে প্রধান করে তদন্ত কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল। গত বৃহস্পতিবার তিনি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন। প্রতিবেদনের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কমিটি তদন্ত শেষে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। বিস্তারিত তথ্য ও সুপারিশ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।’

তদন্ত–সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে জানান, ঘটনাস্থল পরিদর্শনে রান্নাঘরের চুলা, চুলার পেছনের গ্যাস লাইন, নবসহ আশপাশের বেশ কিছু জিনিসপত্র প্রায় অক্ষত অবস্থায় পাওয়া গেছে। রান্নাঘরে থাকা তেজপাতা, প্লাস্টিকের কাগজসহ কিছু দাহ্য বস্তুতেও বড় ধরনের ক্ষতির চিহ্ন দেখা যায়নি।

কমিটি তদন্ত শেষে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। বিস্তারিত তথ্য ও সুপারিশ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মোহাম্মদ রফিক খান, উপমহাব্যবস্থাপক, কেজিডিসিএল।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা বলেন, চুলার পেছনের লাইনে সামান্য লিক পাওয়া গেছে। তবে রান্নাঘরে দুটি দরজা, বড় জানালা ও ভেন্টিলেশন থাকায় সেখানে গ্যাস জমে থাকার সম্ভাবনা কম। বিস্ফোরণের সময় তীব্র কম্পনের কারণে গ্যাস লাইনে ক্ষতি হয়ে পরেও লিক তৈরি হতে পারে। তিনি বলেন, ‘বিস্ফোরণের প্রধান কারণ গ্যাস লিকেজ নয়। তবে গ্যাসজনিত দুর্ঘটনা এড়াতে চুলা জ্বালানোর আগে ১৫-২০ মিনিট দরজা-জানালা খুলে পর্যাপ্ত ভেন্টিলেশনের পরামর্শ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।’

তদন্ত কমিটি সূত্রে জানা গেছে, বাসায় গাড়ির যন্ত্রাংশের কিছু কমপ্রেসিং ইউনিট ছিল, যেগুলোতে উচ্চ চাপে গ্যাস থাকে। এ ছাড়া গাড়িতে রং করার কাজে ব্যবহৃত কিছু রাসায়নিক পদার্থও সেখানে সংরক্ষণ করা ছিল। এসব দাহ্য পদার্থ থেকে কোনোভাবে আগুনের সঞ্চার হয়ে বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ত্রুটিপূর্ণ বিদ্যুতের সংযোগ, রাসায়নিক পদার্থ বা যন্ত্রাংশ—এসবের যেকোনোটি থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে।

আগুনে দগ্ধ হওয়া ভবনটির একটি ফ্ল্যাট। সম্প্রতি চট্টগ্রাম নগরের হালিশহরে
ছবি: জুয়েল শীল

পাঁচ স্থানে বিস্ফোরণ, লন্ডভন্ড ফ্ল্যাট

স্বজন ও তদন্ত কমিটির সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ফ্ল্যাটটির ভেতরে মোট পাঁচটি স্থানে বিস্ফোরণ হয়েছে। এর মধ্যে তিনটি স্থান ছিল বারান্দাগুলোর কাছাকাছি। বিস্ফোরণের আলামত সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে রান্নাঘরের সঙ্গে লাগোয়া বারান্দা এবং পাশের করিডরে। ড্রয়িংরুমে থাকা আইপিএসের ব্যাটারিও বিস্ফোরণে ছিটকে পড়েছে এক পাশে। ঘরের আসবাবের অধিকাংশই পোড়া।

ফায়ার সার্ভিসের তদন্ত কমিটির সূত্রে জানা গেছে, ভবনে জরুরি নির্গমন সিঁড়ি, নিরাপত্তাব্যবস্থা ও ফায়ার সেফটি প্ল্যানের মতো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা চোখে পড়েনি। মালিকপক্ষের প্রতিনিধিও ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না। ভবনের অনুমোদন ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত কাগজপত্র মালিকপক্ষকে তাঁদের কাছে জমা দিতে বলা হয়েছে।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক মো. জসীম উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে বিভিন্ন ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে। কেউ বলছেন লিফট, কেউ এসি, আইপিএস বা বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটের কথা বলছেন। আবার কেউ রাসায়নিক বা বাইরে থেকে নাশকতার মাধ্যমে বিস্ফোরণের কথাও উল্লেখ করেছেন। সব বিষয় তদন্ত কমিটি খতিয়ে দেখছে। দ্রুত প্রতিবেদন দেওয়া হবে।’

চিকিৎসাধীন তিন শিশু

দুর্ঘটনার সময় তৃতীয় তলার ওই ফ্ল্যাটটিতে ছিল তিন ভাইয়ের পরিবার। তাঁরা হলেন—শাখাওয়াত হোসেন (৪৯) ও তাঁর স্ত্রী এবং দুই সন্তান, তাঁর প্রবাসী ভাই সামির আহমেদ (৪০) ও তাঁর স্ত্রী এবং দুই সন্তান এবং ছোট ভাই শিপন হোসেন (৩০)। ঘটনার পর মারা যান তিন ভাই, দুই ভাইয়ের স্ত্রী এবং শাখাওয়াতের ছেলে। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শাখাওয়াতের মেয়ে উম্মে আইমান (১০) এবং সামিরের দুই সন্তান ফারহান আহমেদ (৬) ও আয়েশা (৪)।

শিশুদের চিকিৎসার খরচ জোগাচ্ছেন শাখাওয়াত হোসেনের ফুফাতো ভাই মো. জামশেদ। জানতে চাইলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘একই সঙ্গে পাঁচ স্থানে বিস্ফোরণ। তা–ও বারান্দার দিকে বেশি। এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া উচিত। আমরা গিয়েও সেখানে গ্যাসের লাইন ঠিক পেয়েছি। অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিন্ন তথ্য ছাড়াচ্ছেন। আমরা সুষ্ঠু তদন্ত চাই।’