ঘটনাস্থলে আজও যাচ্ছে উৎসুক মানুষ, পড়ে আছে চুষনি-জুতা, টুকরা কাচ

দুর্ঘটনাস্থলে এখনো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে মাইক্রোবাস আরোহীদের ব্যবহার্য বিভিন্ন জিনিস। আজ শুক্রবার সকালে খুলনা-মোংলা মহাসড়কে বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার বেলাই ব্রিজ এলাকায়ছবি: ইনজামামুল হক

পাকা সড়কের ঢালজুড়ে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য কাচের টুকরা। গাড়ির খণ্ড খণ্ড অংশের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কয়েক জোড়া জুতা-স্যান্ডেল। এর মাঝেই পড়ে আছে শিশুদের একটি চুষনি। আজ শুক্রবার সকালে বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার বেলাই ব্রিজ এলাকার খুলনা-মোংলা মহাসড়কে দেখা যায় এমন দৃশ্য।

গন্তব্য থেকে মাত্র ১৫ কিলোমিটার দূরে বর-কনেবাহী মাইক্রোবাসটিতে ঘটে ভয়াবহ এই দুর্ঘটনা। বিয়ের আনন্দযাত্রা মুহূর্তেই রূপ নেয় শোকে।

গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে নৌবাহিনীর একটি স্টাফ বাসের সঙ্গে মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ১৪ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ৪টিই শিশু। তাদের মধ্যে দুই শিশুর বয়স দুই বছরের কম। নিহত হয়েছেন তাদের মায়েরাও।

গাড়িতে শিশুদের শান্ত রাখতে মায়েরা হয়তো চুষনি মুখে তুলে দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই মা-সন্তান কেউই এখন আর বেঁচে নেই। দুর্ঘটনাস্থলে পড়ে থাকা সেই চুষনি যেন মর্মান্তিক ঘটনাটির নীরব সাক্ষী।

দুর্ঘটনার প্রায় ১৬ ঘণ্টা পরও আজ সকালে ঘটনাস্থলে ভিড় করেন স্থানীয় বাসিন্দা ও উৎসুক জনতা। কেউ কেউ ভয়াবহতা উপলব্ধি করে শিউরে উঠছিলেন, কেউ আফসোস করে স্বজন হারানো পরিবারগুলোর ব্যথা উপলব্ধির চেষ্টা করছিলেন।

দুর্ঘটনাস্থলের কাছেই রফিকুল ইসলামের বসতবাড়ি। আজ সকালে তিনি রাস্তার ওপর ছড়িয়ে থাকা কাচের টুকরা, জুতা ও অন্যান্য জিনিস দেখছিলেন। তিনি বলেন, ‘জীবনে এত বড় দুর্ঘটনা দেখিনি। মাঠে গরু রেখে ঘরে ফিরছিলাম। হঠাৎ শুনি বিকট শব্দ। প্রথমে ভেবেছিলাম গরুটা হয়তো বাসের সামনে পড়েছে। পরে দেখি, দুই গাড়ির সংঘর্ষ। চারদিকে রক্ত আর আহত মানুষ। একসঙ্গে এত মানুষকে আহত হতে আগে দেখিনি।’

রফিকুল ইসলামের পাশাপাশি স্থানীয় অনেকেই ঘটনাস্থলে এসে শোক প্রকাশ করছেন। শিশুসন্তানকে সঙ্গে নিয়ে সকালে সেখানে এসেছিলেন শান্তি রানী বিশ্বাস। তিনি বলেন, ‘রাতে খবরে দেখেছি কী ভয়াবহ দুর্ঘটনা হয়েছে। তাই দেখতে এলাম।’

সড়ক দিয়ে চলাচলকারী অনেক যানবাহনের চালককেও গাড়ি থামিয়ে দুর্ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। তবে রাতেই দুর্ঘটনাকবলিত দুটি যানবাহন সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। কাটাখালী হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাফর আহমেদ বলেন, পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ময়নাতদন্ত ছাড়াই মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

বিয়েবাড়িতে শোকে স্তব্ধ সবাই

গতকাল সন্ধ্যার আগেই নববধূকে নিয়ে মোংলা উপজেলার শেলাবুনিয়া গ্রামের বাড়িতে পৌঁছানোর কথা ছিল বরপক্ষের। আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীরা অপেক্ষা করছিলেন বর-কনেকে বরণ করার জন্য। আজ সকালে নতুন বউকে ঘিরে হাসি-আড্ডা, খাওয়াদাওয়া আর শিশুদের কোলাহলে মুখর থাকার কথা ছিল বাড়িটি। কিন্তু এখন সেখানে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। বাড়ি ও আশপাশে শত শত মানুষ জড়ো হয়েছেন ঠিকই, তবে পরিবেশ ভারী হয়ে আছে অনাকাঙ্ক্ষিত শোকে।

নিহত ১৪ জনের মধ্যে ৯টি মরদেহ নেওয়া হয়েছে মোংলায়, ৪টি কয়রায়। আর রামপালে নেওয়া হয়েছে মাইক্রোবাসচালকের মরদেহ। এখন শেষবিদায়ের অপেক্ষায় স্বজনেরা।

নিহত বর আহাদুর রহমান ছাব্বির মোংলা পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আবদুর রাজ্জাকের ছোট ছেলে। আবদুর রাজ্জাকের পাঁচ ছেলে ও এক মেয়ে। এ দুর্ঘটনায় তাঁর দুই ছেলে, মেয়ে, এক পুত্রবধূ ও চার নাতি মারা গেছে। তাঁদের মরদেহ এখন বাড়িতে। আহাজারি করছেন তাঁর স্ত্রী, জীবিত তিন ছেলে ও অন্য স্বজনেরা।

নিহত আবদুর রাজ্জাকের বড় ছেলে আশরাফুল আলম (জনি) বলেন, ‘দুর্ঘটনায় স্ত্রী, এক ছেলে, দুই মেয়ে, দুই ভাই, বাবা ও বোনকে হারিয়েছি। আমার সব শেষ হয়ে গেছে। আমি একা হয়ে গেলাম।’ এরপর আর কোনো কথা বলতে পারেননি তিনি।

একসঙ্গে এত মরদেহ দেখে নির্বাক হয়ে পড়েছেন স্বজন ও প্রতিবেশীরাও। প্রতিবেশী জাহিদুল ইসলাম বলেন, মরদেহগুলোর গোসল সম্পন্ন হয়েছে। জুমার নামাজের পর দাফন করা হবে।