চোখে দেখেন না, কম্পিউটার শিখিয়ে গড়েছেন নিজের পরিচয়

ওমর ফারুকের চোখে আলো নেই। তবে কম্পিউটার প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অন্যকে দেখান আলোর পথ। সম্প্রতি মেহেরপুরের সমাজসেবা কার্যালয়ের কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্রেছবি: প্রথম আলো

দৃষ্টিশক্তি হারানো মানুষ মাঝসমুদ্রে পড়ে সাঁতার কাটতে থাকা একজন মানুষ। চারদিকে অন্ধকার, সামনে এগোনোর পথও অজানা। তবু হাল ছাড়লে চলে না। অদম্য ইচ্ছাশক্তিই পারে সেই মানুষকে তীরে পৌঁছাতে। কথাগুলো বলছিলেন ৩৬ বছর বয়সী ওমর ফারুক মামুন। দুই চোখে দেখতে পান না তিনি। অথচ সেই মানুষই এখন অন্যদের কম্পিউটার প্রশিক্ষণ দেন।

ওমর ফারুক মেহেরপুরের মুজিবনগর উপজেলার মোনাখালী ইউনিয়নের শিবপুর গ্রামের বাসিন্দা। গ্রামে তাঁদের দ্বিতল বাড়ি আছে। পরিবারের অবস্থা সচ্ছল হলেও নিজের পরিচয় তৈরি করার তাগিদ ছিল তাঁর। অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে নয়, নিজের যোগ্যতায় কিছু করতে চেয়েছেন তিনি। সেই চেষ্টায় তিনিও সফল হয়েছেন। তিনি এখন কম্পিউটার প্রশিক্ষক।

ওমর ফারুকের দুই চোখে গ্লুকোমা ধরা পড়ে নবম শ্রেণিতে পড়ার সময়। চিকিৎসা করিয়েও দৃষ্টিশক্তি রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। ২০০৪ সালে তিনি এসএসসি পাস করেন। উচ্চমাধ্যমিকে বিজ্ঞান বিভাগে পড়ার সময় পুরোপুরি দৃষ্টিশক্তি হারান তিনি। ২০০৬ সালে তাঁর এইচএসসি পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দৃষ্টিশক্তি হারানোর কারণে তখন পরীক্ষা দেওয়া সম্ভব হয়নি। দীর্ঘ বিরতির পর ২০১২ সালে তিনি এইচএসসি পাস করেন। পরে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পড়াশোনা করে ২০১৮ সালে তিনি ডিগ্রি পাস করেন।

দৃষ্টিশক্তি না থাকায় কম্পিউটার শেখার কাজটি ওমর ফারুকের জন্য ছিল চ্যালেঞ্জের। তাঁকে নিজের মতো করে কাজের কৌশল আয়ত্ত করতে হয়। ইউটিউবের সহায়তায় কম্পিউটারের হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যারের কাজ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করেন তিনি। অনুশীলনের মাধ্যমে শেখেন টাইপিং ও কম্পিউটার পরিচালনার বিভিন্ন পদ্ধতি।
জানতে চাইলে ওমর ফারুক বলেন, ২০১৩ সালে মেহেরপুরের সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে তিনি কম্পিউটারের ওপর প্রশিক্ষণ নেন। পরে ২০১৫ সালের ৭ জুলাই সমাজসেবা অধিদপ্তর তাঁকে খণ্ডকালীন প্রশিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়। বর্তমানে তিনি মেহেরপুরের সমাজসেবা কার্যালয়ে খণ্ডকালীন কম্পিউটার প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সেখানে নিজের শেখা বিষয়গুলো অন্যদের বোঝান, প্রশিক্ষণ দেন হাতে-কলমে। কাজের প্রতি তাঁর মনোযোগ শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ দিতে সহায়তা করছে।

কম্পিউটার প্রশিক্ষণে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করছেন ওমর ফারুক। সম্প্রতি মেহেরপুরের সমাজসেবা কার্যালয়ের কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে
ছবি: প্রথম আলো

শিবপুর গ্রামের বাসিন্দা ও ওমর ফারুকের শৈশবের বন্ধু তৌফিকুল ইসলাম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ওমর ফারুক তাঁর বন্ধু ও সহপাঠী। তাঁদের বন্ধুদের মধ্যে কেবল তিনি-ই চোখে দেখেন না। তা সত্ত্বেও অন্ধত্বকে জয় করে তিনি–ই সবার চেয়ে এগিয়ে গেছেন। যেখানে তাঁদের অনেক বন্ধু মাধ্যমিকের গণ্ডিও পার হতে পারেননি—কেউ পড়াশোনা ছেড়ে ব্যবসায় বা কৃষিকাজে যোগ দিয়েছেন, সেখানে ওমর ফারুক নিজের অদম্য চেষ্টায় আজ একজন সফল কম্পিউটার প্রশিক্ষক হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলেছেন।

ওমর ফারুকের কথায়ও উঠে আসে দৃষ্টিশক্তি হারানোর পর জীবনের বাস্তবতা এবং সেই বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করে এগিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা। তাঁর কাছে আত্মনির্ভরশীল হওয়ার অর্থ শুধু নিজের কাজ নিজে করা নয়; নিজের যোগ্যতা দিয়ে সমাজে একটি অবস্থান তৈরি করাও। তাঁর এই পথচলায় গর্বিত তাঁর মা খাদিজা খাতুন। দৃষ্টিশক্তি হারানো ছেলের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া, কম্পিউটার প্রশিক্ষণ নেওয়া এবং সেই দক্ষতা দিয়ে অন্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়া তাঁর মায়ের কাছে আনন্দের ও অন্যদের জন্য অনুপ্রেরণার।

ওমর ফারুক দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হওয়া সত্ত্বেও শিক্ষার্থীদের ১১ বছর ধরে নিরলসভাবে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন, যা ভাবতেও অবাক লাগে। তাঁর প্রশিক্ষণের ধরন দেখে কেউ বুঝতেই পারবে না, তিনি চোখে দেখেন না।
সোহেল মাহমুদ, সমাজসেবা কর্মকর্তা, মেহেরপুরের সমাজসেবা কার্যালয়

ওমর ফারুকের কাজের প্রশংসা করছেন সমাজসেবা কার্যালয়ের কর্মকর্তারাও। মেহেরপুরের সমাজসেবা কার্যালয়ের সমাজসেবা কর্মকর্তা সোহেল মাহমুদ বলেন, ওমর ফারুক দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হওয়া সত্ত্বেও শিক্ষার্থীদের ১১ বছর ধরে নিরলসভাবে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন, যা ভাবতেও অবাক লাগে। তাঁর প্রশিক্ষণের ধরন দেখে কেউ বুঝতেই পারবে না, তিনি চোখে দেখেন না। কেবল কি–বোর্ডের আওয়াজ শুনেই তিনি বুঝে নিতে পারেন কী শব্দ ও বাক্য লেখা হচ্ছে। কম্পিউটার প্রশিক্ষক হিসেবে তাঁকে স্থায়ী করার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

দৃষ্টিশক্তি হারানোর পর অনেকের জীবনেই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। পড়াশোনা, কর্মসংস্থান ও স্বাভাবিক জীবনযাপনে নানা বাধার মুখোমুখি হতে হয় তাঁদের। এ ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত উদ্যোগের পাশাপাশি প্রয়োজন উপযুক্ত প্রশিক্ষণ, কর্মক্ষেত্রে সুযোগ এবং দক্ষতার স্বীকৃতি। ওমর ফারুকের জীবন তাই কেবল দৃষ্টিশক্তি হারানোর পর ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প নয়; এটি নিজের সামর্থ্যকে চিনে নেওয়া, নতুন দক্ষতা অর্জন এবং সেই দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে অন্যদের শেখানোর গল্প।

চোখের আলো হারিয়েছেন ওমর ফারুক, কিন্তু নিজের ওপর বিশ্বাস হারাননি। প্রতিকূলতার মধ্যেও চেষ্টা চালিয়ে গেলে যে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলতে পারে, তার জীবন্ত উদাহরণ তিনি। নিজের ভাষায়, অদম্য ইচ্ছাশক্তিই তাঁকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে সাহায্য করেছে। এখন সেই আত্মবিশ্বাস নিয়েই সামনে এগিয়ে যেতে চান তিনি।