সার্ফিংকে পানির মতো সহজ করে তোলেন যে তরুণ
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে গত এক যুগে দেশ-বিদেশের ২৮২ তরুণ-তরুণীকে সার্ফিং শিখিয়েছেন সাইফুল্লাহ সিফাত। দেশের প্রথম আইএসএ স্বীকৃত সার্ফিং কোচ ও আন্তর্জাতিক লাইফসেভিং রেফারি হিসেবে তিনি তরুণদের জলক্রীড়ায় আগ্রহী করে তুলছেন।
বালুচরে এলোমেলোভাবে ফেলে রাখা হয়েছে কয়েকটি সার্ফবোর্ড। পাশেই সার্ফবোর্ড হাতে ঢেউয়ের দিকে ছুটছেন ১০-১২ জন তরুণ। সাগরের লোনাজলে নেমেই কেউ বোর্ডে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন, আবার কেউ ভেসে যাচ্ছেন ঢেউয়ের মাথায়। ঢেউয়ের ধাক্কায় বোর্ড থেকে কেউ ছিটকে পড়েও যাচ্ছেন কেউ কেউ। তবে ভয়ের কোনো চিহ্নি দেখা গেল না কারও মধ্যে। পড়ে গিয়েও আবার শুরু হয় জলক্রীড়া। ঢেউকে বশ করে নিজেকে কীভাবে সুরক্ষিত রাখা যায়, এমন কৌশল রপ্ত করার প্রতিযোগিতা।
দৃশ্যটা কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের কলাতলী পয়েন্টে, ৬ মে সকালের। সেখানে সার্ফিং শিখতে আসা কিশোর–তরুণদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছিলেন সার্ফার মো. সাইফুল্লাহ সিফাত (৩৯)। যার হাত ধরে গত এক যুগে সার্ফিং শিখেছেন দেশ-বিদেশের ২৮২ জন তরুণ-তরুণী। সার্ফিং শেখা যতই কঠিন মনে হোক না কেন, সাইফুল্লাহ সেটাকে পানির মতো সহজ করে দিয়েছেন।
দুই দশক আগে সমুদ্রের এই নীল জলরাশিকে আপন করে নিয়ে সার্ফিং শেখার এক অভাবনীয় বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন দেশের প্রথম সার্ফার জাফর আলম। তাঁর অনুপস্থিতিতে ১২ বছর ধরে সার্ফিংয়ের কৌশল স্বেচ্ছাশ্রমে শিখিয়ে চলেছেন জাফরেরই শিষ্য সাইফুল্লাহ সিফাত।
তিনি প্রথম আলোকে বলেন, কক্সবাজারের সমুদ্রের ঢেউয়ের যে ছন্দ ও শক্তি, তা সার্ফিং শেখার জন্য বিশ্বের অনেক জনপ্রিয় স্পটের চেয়ে ভালো। বিশেষ করে শিক্ষানবিশদের জন্য এই সৈকত নিরাপদ ও উপযুক্ত। ভ্রমণে আসা পর্যটকদের সার্ফিংয়ে আগ্রহী করা গেলে বহির্বিশ্বে কক্সবাজারের সুনাম যেমন বাড়বে, তেমনি বিদেশি পর্যটক টানতে ভূমিকা রাখবে।
সাইফুল্লাহ সিফাতের বাড়ি কক্সবাজার পৌরসভার ১২ নম্বর ওয়ার্ডের কলাতলীতে। দেশের প্রথম সার্ফার জাফর আলমের কাছে তিনি সার্ফিং শেখেন ২০০৬ সালে। ২০০৮ সাল থেকে কক্সবাজারে অনুষ্ঠিত সার্ফিং প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছেন। বেশ কয়েকবার চ্যাম্পিয়ন হন তিনি। ২০১৬ সালে সার্ফিং প্রতিযোগিতা থেকে অবসর নিলেও সার্ফিং প্রশিক্ষণের পাশাপাশি সার্ফিং প্রতিযোগিতার বিচারকের দায়িত্ব পালন করে চলেছেন।
কলাতলী থেকে বিশ্বের আঙিনায়
সাইফুল্লাহ সিফাতের বাড়ি কক্সবাজার পৌরসভার ১২ নম্বর ওয়ার্ডের কলাতলীতে। দেশের প্রথম সার্ফার জাফর আলমের কাছে তিনি সার্ফিং শেখেন ২০০৬ সালে। ২০০৮ সাল থেকে কক্সবাজারে অনুষ্ঠিত সার্ফিং প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছেন। বেশ কয়েকবার চ্যাম্পিয়ন হন তিনি। ২০১৬ সালে সার্ফিং প্রতিযোগিতা থেকে অবসর নিলেও সার্ফিং প্রশিক্ষণের পাশাপাশি সার্ফিং প্রতিযোগিতার বিচারকের দায়িত্ব পালন করে চলেছেন।
কক্সবাজারের একটি দরিদ্র পরিবার থেকে আসা সুইফুল্লাহ ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টারন্যাশনাল সার্ফিং অ্যাসোসিয়েশনের (আইএসএ) থেকে প্রশিক্ষণ নেন। পরবর্তী সময়ে তিনি আইএসএর স্বীকৃতি পাওয়া বাংলাদেশের প্রথম সার্ফার কোচ নিযুক্ত হন। সার্ফিং কোচ হিসেবে সনদও পান। ২০২১ সালে আএসএ তাঁকে সার্ফিং প্রতিযোগিতার বিচারকও নির্বাচিত করে। সর্বশেষ গত ৩ ও ৪ এপ্রিল কক্সবাজারে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ সার্ফিং অ্যাসোসিয়েশনের সপ্তম জাতীয় সার্ফিং প্রতিযোগিতায় সাইফুল্লাহ সিফাত প্রধান বিচারকের দায়িত্ব পালন করেন। অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে ২০১৭ সাল থেকে এই সৈকতে নিয়মিত সার্ফিং প্রতিযোগিতা হয়ে আসছে। সব কটিতে তিনি বিচারক ছিলেন।
২০২৩ সালে সাইফুল্লাহ সিফাতের নেতৃত্বে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ সার্ফিং টিম মালদ্বীপে অনুষ্ঠিত এশিয়ান সার্ফিং চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নেয়। দলটিতে ছিলেন কক্সবাজারের দুজন তরুণ সার্ফার। তাঁরা হলেন মো. মান্নান ও রাশেদ আলম। সেবার ২০টি দেশের প্রতিযোগীদের সঙ্গে লড়ে বাংলাদেশের দুই সার্ফার কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত যান।
সার্ফিং প্রশিক্ষক, বিচারকের পাশাপাশি সাইফুল্লাহ সিফাত আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত লাইফগার্ড মাস্টার ট্রেইনারও। তিনি মালয়েশিয়া, ভারত, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশ থেকে লাইফগার্ড প্রশিক্ষণ নেন।
সিফাত বর্তমানে লাইফসেভিং স্পোর্টসের সঙ্গেও জড়িয়ে গেছেন ভালোভাবে। লাইফসেভিং স্পোর্টস হচ্ছে লাইফগার্ড এবং লাইফসেভারদের একটি সমন্বিত খেলা। লাইফসেভিং ফেডারেশন (আইএলএস) এই খেলার নিয়ন্ত্রক সংস্থা। প্রতি দুই বছর অন্তর আন্তর্জাতিকভাবে ওয়ার্ল্ড লাইফসেভিং চ্যাম্পিয়নশিপ অনুষ্ঠিত হয়। যেখানে বিশ্বের সব লাইফগার্ড এবং লাইফসেভাররা অংশ নেন। এর ধারাবাহিকতায় ২০২২ ও ২০২৪ সালে ইতালি এবং অস্ট্রেলিয়াতে অনুষ্ঠিত হয় লাইফসেভিং ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপ। সেখানে টেকনিক্যাল রেফারি হিসেবে সাইফুল্লাহ সিফাত অংশ নেন। ইন্টারন্যাশনাল লাইফসেভিং ফেডারেশন তাঁকে মনোনীত করে। এর আগে ২০২১ সালে বাংলাদেশে ‘লাইফসেভিং স্পোর্টস বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠা করেন সাইফুল্লাহ। কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে স্থানীয় সার্ফার ও তরুণদের লাইফগার্ডিং এবং লাইফসেভিং প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছেন তিনি।
ঢেউয়ের সঙ্গে মিতালি
৬ মে সকালে কলাতলী সৈকতের সার্ফ লাইফসেভিং ক্লাবে গিয়ে দেখা গেছে, ১০-১৫ জন বালুচরে সার্ফিং প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। কোচ সাইফুল্লাহ তাদের সাঁতার, সার্ফবোর্ড পরিচালনা, লাইফসেভিং এবং ঢেউয়ের সঙ্গে কীভাবে মিতালি করতে হবে, তার কৌশল শেখাচ্ছেন। সাগরের পানিতে চলছে সাঁতার, সার্ফিং শেখানোর কাজ। ক্লাবের বর্তমান সদস্য ৩০ জন, এর মধ্যে মেয়ে ৩ জন।
সাইফুল্লাহ সিফাত বলেন, গত ১২ বছরে তিনি ২৮২ জন তরুণ–তরুণীকে সার্ফিং শিখিয়েছেন। এর মধ্যে ৭২ জন বিদেশি। ৩০ জন ছিলেন যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, ইতালিসহ বিভিন্ন দেশ থেকে ভ্রমণে আসা পর্যটক। বাকিরা কক্সবাজারের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে মানবিক সেবার বিভিন্ন সংস্থায় চাকরি করতে আসা বিদেশি নাগরিক।
সাইফুল্লাহ সিফাত বলেন, এখানকার সৈকতে হাঙরের উৎপাত নেই। সার্ফিং করার উপযোগী ঢেউ থাকে। পাথর বা প্রবালের আস্তর না থাকায় সার্ফিংয়ের সময় ঢেউয়ের ধাক্কায় বোর্ড থেকে ছিটকে পড়লে আঘাত বা শরীর কাটাছেঁড়ার ভয় থাকে না। প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের জন্য এই সৈকত খুবই উপযোগী।
সাইফুল্লাহ বলেন, দেশ-বিদেশের প্রশিক্ষণার্থীদের জন্য সম্প্রতি তিনি ৩ ও ৭ দিনের বিশেষ প্রশিক্ষণ কোর্স চালু করেছেন। প্রতিদিন সকাল ও বিকেলে কলাতলী সৈকতে এই প্রশিক্ষণ চলছে। দেড় ঘণ্টার প্রতিদিনের সেশন নিতে হলে নির্দিষ্ট পরিমাণের ( ৫০০-৭০০ টাকা) ফি পরিশোধ করতে হয়। এই টাকায় ক্লাবের ভাড়া, বিদ্যুৎ খরচ মেটানো হয়।
এক ছেলে এক মেয়ের জনক সাইফুল্লাহ সিফাত বলেন, ‘বর্তমান তরুণ প্রজন্ম ডিভাইসমুখী (প্রযুক্তি) হয়ে পড়েছে। খেলাধুলা থেকে তারা অনেক দূরে। অনেকে মাদক-সন্ত্রাসে জড়িয়ে পড়ছে। তাদের ক্রিকেট–ফুটবল খেলার পাশাপাশি ওয়াটার স্পোর্টসে নিয়ে আসা প্রয়োজন। এই চিন্তা মাথায় রেখে সার্ফ লাইফসেভিং বাংলাদেশ ক্লাব বা স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছি। যেখানে সাঁতার, সার্ফিং ও লাইফসেভিং স্পোর্টস শেখানো হয়। কিন্তু সামর্থ্যে কুলায় না। ভাড়া ঘরে খরচ চালানো কঠিন। সরকারি–বেসরকারি উদ্যোগে সহযোগিতা পেলে ভবিষ্যতে কক্সবাজারে একটি পূর্ণাঙ্গ সার্ফিং ও লাইফসেভিং স্কুল করার ইচ্ছা আছে।’
সার্ফিং কঠিন নয়
সার্ফিং প্রশিক্ষক সাইফুল্লাহ সিফাত বলেন, সার্ফিং শিখতে গেলে আগেই সাঁতার জানা যেমন আবশ্যক, তেমনি কিছুটা সাহসী হতে হয়। সার্ফিং শিখতে তিনটি সরঞ্জাম (সার্ফবোর্ড, লিশ ও ওয়াক্স) প্রয়োজন পড়ে। ‘সার্ফবোর্ড’ হচ্ছে লম্বা ও চওড়া ‘লংবোর্ড’ বা ‘ফোম বোর্ড’। এগুলো পানিতে ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। ‘লিশ’ হচ্ছে এমন একটি দড়ি, যা সার্ফারের পায়ের সঙ্গে বোর্ডকে যুক্ত রাখে, যাতে ঢেউয়ের ধাক্কায় ছিটকে পড়লে বোর্ডটি দূরে ভেসে না যায়। আর ‘ওয়াক্স’ বোর্ডে পিছলে যাওয়া রোধ করে এবং পায়ের গ্রিপ ঠিক রাখতে সার্ফবোর্ডের ওপর বিশেষ মোম ব্যবহার করে।
সাইফুল্লাহ সিফাত বলেন, যাঁরা সাঁতার জানেন না, তাঁদের সাঁতার শেখাতে ১২-১৫ দিন সময় লাগে। আর সার্ফিং শেখাতে লাগে ৩ থেকে ৭ দিন। এরপর নিজে নিজে সার্ফিং রপ্ত করা যায়। সার্ফিং মোটেও কঠিন কিছু নয়।
সাইফুল্লাহ সিফাত বলেন, এখানকার সৈকতে হাঙরের উৎপাত নেই। সার্ফিং করার উপযোগী ঢেউ থাকে। পাথর বা প্রবালের আস্তর না থাকায় সার্ফিংয়ের সময় ঢেউয়ের ধাক্কায় বোর্ড থেকে ছিটকে পড়লে আঘাত বা শরীর কাটাছেঁড়ার ভয় থাকে না। প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের জন্য এই সৈকত খুবই উপযোগী।