নারায়ণগঞ্জের সঙ্গে ভোলার নৌপথে নতুন দুয়ার খুলল

কাঁচপুর-ইলিশা নৌপথে ফেরি সার্ভিস চালু। গত মঙ্গলবার বিকেলে নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর সেতুর নিচে কাঁচপুর ফেরিঘাটেছবি: প্রথম আলো

নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর থেকে ভোলার ইলিশা ঘাট পর্যন্ত নতুন ফেরি সার্ভিস চালু হয়েছে। এর মাধ্যমে নারায়ণগঞ্জের সঙ্গে ভোলার নৌপথে যোগাযোগের নতুন দুয়ার উন্মোচন হলো। সড়ক পথের যানজট, দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তি ও নানা হয়রানি এড়ানোর সুযোগ তৈরি হওয়ায় খুশি পণ্যবাহী পরিবহনের চালক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

১২টি বড় মালবাহী ট্রাক ও দুটি ছোট গাড়ি নিয়ে মঙ্গলবার দিবাগত রাত ৩টায় কাঁচপুর সেতুর নিচ থেকে ইলিশা ঘাটের উদ্দেশে ছেড়ে যায় ফেরি বেগম সুফিয়া কামাল। সাড়ে সাত ঘণ্টা পর বুধবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ফেরিটি ইলিশা ঘাটে পৌঁছায়।

ফেরিটির ক্যাপ্টেন মো. জহির উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, নতুন ফেরি সার্ভিস চালু হওয়ায় চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন বন্দর এলাকার যানবাহনের জন্য সুবিধা হবে। নরসিংদী, সিলেটসহ অন্যান্য অঞ্চলের পণ্যবাহী যানবাহনের যাতায়াতেও এ ফেরি কাজে লাগবে। ইলিশা থেকে বুধবার বেলা ১টায় আবার রওনা হয়েছেন। কাঁচপুরে পৌঁছাতে রাত ১০টা বাজতে পারে।

এ নৌপথে বড় মালবাহী ট্রাকের ফেরি ভাড়া সাড়ে ১২ হাজার টাকা, মিনি ট্রাকের ৯ হাজার টাকা, ব্যক্তিগত গাড়ির ৫ হাজার টাকা এবং মোটরসাইকেলের ৫০০ টাকা।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) সূত্রে জানা যায়, দুটি ফেরি বেগম সুফিয়া কামাল ও বেগম রোকেয়া এই নৌপথে চলাচল শুরু হয়েছে। প্রতিদিন দুই প্রান্ত থেকে একটি করে ফেরি ছাড়ছে। একেক ফেরি পারাপারে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা সময় লাগছে। পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর অনেক ফেরি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। অন্য জায়গা থেকে দুটি ফেরি এনে এ নৌপথে কাজে লাগানো হয়েছে।

পরিবহনচালক ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, এখন কাঁচপুর থেকে পণ্যবোঝাই ট্রাক ফেরিতে সরাসরি ইলিশা যেতে পারছে। আবার ইলিশা থেকে পণ্য নিয়ে ট্রাক সরাসরি আসতে পারছে কাঁচপুরে। ফেরির মাধ্যমে ভোলার মাছ, কৃষিপণ্য ঢাকাসহ দেশের বড় বাজারে পাঠানো সহজ হবে। একই সঙ্গে চিকিৎসা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের জন্যও ভোলার মানুষের যাতায়াতে পরিবহন জটিলতা ও ভোগান্তি কমবে।

গত ২৭ আগস্ট কাঁচপুর-ইলিশা নৌপথে পরীক্ষামূলকভাবে ফেরি চলাচল শুরু হয়। আর মঙ্গলবার বিকেলে কাঁচপুর সেতুর নিচে কাঁচপুর ফেরিঘাট থেকে ফেরি সার্ভিসটির উদ্বোধন করেন সড়ক পরিবহন, সেতু ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।
নারায়ণগঞ্জের নিতাইগঞ্জ পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি শংকর সাহা প্রথম আলোকে বলেন, ফেরি চালু হওয়াতে ব্যবসার গতি বাড়বে, দক্ষিণাঞ্চলে পণ্যের চাহিদা বাড়বে। পরিবহন ব্যয় কমে গেলে মানুষ সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য কিনতে পারবেন।

এ নৌপথে বড় মালবাহী ট্রাকের ফেরি ভাড়া সাড়ে ১২ হাজার টাকা, মিনি ট্রাকের ৯ হাজার টাকা, ব্যক্তিগত গাড়ির ৫ হাজার টাকা এবং মোটরসাইকেলের ৫০০ টাকা। ট্রাকচালকদের দাবি, ফেরির ভাড়া আরও কমানো হলে এ নৌপথ তাঁদের জন্য আরও কার্যকর হবে। বড় মালবাহী ট্রাকচালক সোহেল রানা প্রথম আলোকে বলেন, ফেরি সার্ভিস চালু হওয়ায় পণ্যবাহী গাড়ি নিয়ে দিনে ভোলায় যাওয়া সম্ভব হয়েছে। আবার রাতে ফেরার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

ফেরিতে যাতায়াতের সময় চালকেরা বিশ্রাম নেওয়ারও সুযোগ পাবেন উল্লেখ করে আরেক ট্রাকচালক আবুল কাশেম বলেন, সড়কপথে যানজটসহ নানা ধরনের ভোগান্তি পোহাতে হতো। চাঁদাবাজদের হয়রানির শিকার হতে হয়। ফেরি চালু হওয়ায় সেই ভোগান্তি কমবে।

স্থায়ী সড়ক যোগাযোগ চালু হওয়ার আগ পর্যন্ত কাঁচপুর-ইলিশা ফেরি সার্ভিস ভোলার মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগব্যবস্থা হয়ে উঠতে পারে। এ নৌপথে মানুষের চলাচলের চাহিদা বাড়লে ফেরির সংখ্যা বাড়ানো হবে।
শেখ রবিউল আলম, সড়ক পরিবহন, সেতু ও নৌপরিবহনমন্ত্রী

বিআইডব্লিউটিএ সূত্রে জানা যায়, ফেরি চালুর স্থানে আগে থেকেই রাস্তা ছিল। সেটি যান চলাচলের উপযোগী করে পন্টুন বসানো হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ নদী বন্দরের যুগ্ম পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বিআইডব্লিউটিএর প্রকৌশল বিভাগ থেকে ব্যয়ের হিসাব করা হচ্ছে। তাই এই নৌপথ চালু করতে ব্যয়ের বিষয়টি এখনো বলা সম্ভব হচ্ছে না।

চিকিৎসা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে নতুন সুযোগ

এ ফেরি সার্ভিসের সুবিধা শুধু পণ্য পরিবহনে সীমাবদ্ধ থাকবে না। উন্নত চিকিৎসার জন্য ভোলার মানুষকে প্রায়ই ঢাকা, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বড় শহরগুলোতে যেতে হয়। সরাসরি ফেরি যোগাযোগ থাকায় যাত্রা সহজ হবে। একইভাবে শিক্ষার্থী, চাকরিপ্রার্থী ও কর্মজীবীদের দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যাতায়াতের সুযোগ বাড়বে। এই নৌপথ কেন্দ্র করে মানুষের কর্মসংস্থান, ব্যবসা ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম সম্প্রসারিত হবে।

নতুন এ নৌপথে ফেরি সার্ভিস চালু হয়েছে। গত মঙ্গলবার বিকেলে নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর সেতুর নিচে কাঁচপুর ফেরিঘাটে
ছবি: প্রথম আলো

চলাচল বাড়লে ফেরির সংখ্যা বাড়বে

ফেরি উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সড়ক পরিবহন, সেতু ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, ভোলার সঙ্গে দেশের মূল ভূখণ্ডের স্থায়ী সড়ক যোগাযোগ স্থাপনে তিনটি সেতু ও সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এ কাজ শেষ হতে চার থেকে পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে। ফলে স্থায়ী সড়ক যোগাযোগ চালু হওয়ার আগ পর্যন্ত কাঁচপুর-ইলিশা ফেরি সার্ভিস ভোলার মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগব্যবস্থা হয়ে উঠতে পারে। এ নৌপথে মানুষের চলাচলের চাহিদা বাড়লে ফেরির সংখ্যা বাড়ানো হবে।

ব্যবসায়ী ও পরিবহন–সংশ্লিষ্ট লোকজনের ভাষ্য, ফেরিভাড়া যৌক্তিক পর্যায়ে রাখা, নির্ধারিত সময়ে ফেরি ছাড়ার ব্যবস্থা করা, ঘাটে যানবাহন ব্যবস্থাপনা এবং চালকদের বিশ্রাম ও খাবারের সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি। সব মিলিয়ে কাঁচপুর-ইলিশা ফেরি শুধু একটি নতুন নৌপথ নয়, ভোলার সঙ্গে নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা ও দেশের অন্যান্য অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক যোগাযোগের একটি নতুন পথ খুলে গেল। এ পথ কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে ফেরির সংখ্যা, সেবার মান, নিয়মিত পরিচালনার ওপর।