কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগ, সালিসে কান ধরে সাতবার উঠবসের ‘শাস্তি’

ধর্ষণপ্রতীকী ছবি

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে এক কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে তার আপন চাচাতো ভাইয়ের বিরুদ্ধে। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর স্থানীয়ভাবে সালিস বসিয়ে অভিযুক্ত তরুণকে কান ধরে মাত্র সাতবার উঠবস করিয়ে ‘শাস্তি’ দেওয়া হয়। তবে এ বিচার প্রত্যাখ্যান করেছে ওই কিশোরীর পরিবার।

ভুক্তভোগী কিশোরীকে গতকাল সোমবার বিকেলে চিকিৎসার জন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে কিশোরীর প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যপরীক্ষা ও আলামত সংগ্রহ করেছেন। অভিযুক্ত তরুণের নাম জাহিদুল ইসলাম (২৪), পেশায় একজন প্রসাধন (কসমেটিকস) ব্যবসায়ী।

এটা দশে বইয়্যা বিচার করছে। আমি না, দশে মিলে শেষ করছে। আর ধর্ষণের ঘটনা তো আমি চোখে দেখিনি। কইতারতাম না, আল্লাহ জানে। আমি দেখছিও না, আমি সাক্ষীও না।
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত নারী সদস্য

নাসিরনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শাহিনুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, স্বাস্থ্যপরীক্ষার জন্য কিশোরীকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় মামলা দিতে কিশোরীর পরিবারকে বলা হয়েছে। অভিযুক্ত তরুণকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, গত শনিবার রাত ৯টার দিকে জাহিদুল ওই কিশোরীকে প্রলোভন দেখিয়ে বাড়ির পাশে একটি নির্জন স্থানে নিয়ে যান। সেখানে একটি পরিত্যক্ত ঘরে তাকে ধর্ষণ করা হয়। বিষয়টি কাউকে জানালে কিশোরীকে প্রাণনাশের হুমকি দেন জাহিদুল। তবে ঘটনাটি ওই কিশোরী তার বড় বোনকে বলে। পরে বিষয়টি জানাজানি হয়। গত রোববার সকালে ওই কিশোরীর বড় ভাই অভিযুক্ত জাহিদুলকে বিষয়টি জিজ্ঞাসা করেন। এতে অভিযুক্ত তরুণ উল্টো চড়াও হন এবং কিশোরীর বড় ভাইকে মারধর করেন। এ ঘটনায় মামলা করলে পরিণাম খারাপ হবে বলে হুমকিও দেন।

বিষয়টি স্থানীয় সর্দারদের অবগত করলে তাঁরা জাহিদুলকে সাতবার উঠবস করিয়েই ঘটনা ধামাচাপা দেন। এ রায়ে আমি সন্তুষ্ট নই এবং রায় প্রত্যাখান করেছি। বোনকে নিয়ে হাসপাতালে আছি। এ ঘটনায় আমি মামলা করব। আমি খুব সহজ-সরল প্রকৃতির। এই সুযোগ নিয়ে জাহিদুল এমন জঘন্য কাজ করেছে। এই ন্যক্কারজনক ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।
ভুক্তভোগী কিশোরীর বড় ভাই

পরে ভুক্তভোগী পরিবার বিষয়টি স্থানীয় গ্রাম সর্দারদের জানালে গতকাল সকাল ৯টার দিকে স্থানীয় ইউপির সংরক্ষিত নারী সদস্য শেখ ফাহিমা বেগমের উপস্থিতিতে বিষয়টি নিয়ে গ্রামে সালিস হয়। সালিসে অভিযুক্ত জাহিদুলকে মাত্র সাতবার কান ধরে উঠবস করানোর মাধ্যমে দায়সারা বিচার করেন।

ভুক্তভোগী কিশোরীর পরিবার এ রায়ে অসন্তুষ্ট হয় এবং সালিসের বিচার প্রত্যাখ্যান করে। পরে কিশোরীকে প্রথমে নাসিরনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে পুলিশের পরামর্শে স্বাস্থ্যপরীক্ষার জন্য তাকে গতকাল বিকেল চারটার দিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালের গাইনি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ওই কিশোরীর প্রয়োজনীয় আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। প্রতিবেদনের পর ধর্ষণের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে।

কিশোরীর বড় ভাই প্রথম আলোকে, ‘বিষয়টি স্থানীয় সর্দারদের অবগত করলে তাঁরা জাহিদুলকে সাতবার উঠবস করিয়েই ঘটনা ধামাচাপা দেন। এ রায়ে আমি সন্তুষ্ট নই এবং রায় প্রত্যাখান করেছি। বোনকে নিয়ে হাসপাতালে আছি। এ ঘটনায় আমি মামলা করব। আমি খুব সহজ-সরল প্রকৃতির। এই সুযোগ নিয়ে জাহিদুল এমন জঘন্য কাজ করেছে। এই ন্যক্কারজনক ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’

সালিসের পর থেকে গা ঢাকা দিয়েছেন জাহিদুল ইসলাম। তাঁর মুঠোফোন নম্বরে কল করা হলেও সংযোগ বন্ধ পাওয়া যায়।

স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত নারী সদস্য প্রথম আলোকে বলেন, ‘এটা দশে বইয়্যা বিচার করছে। আমি না, দশে মিলে শেষ করছে। আর ধর্ষণের ঘটনা তো আমি চোখে দেখিনি। কইতারতাম না, আল্লাহ জানে। আমি দেখছিও না, আমি সাক্ষীও না।’