ভোটের মাঠে কৃষকের হাহাকার

চন্দনাইশের কাঞ্চননগরের আমতল এলাকার বাসিন্দাদের মূল সমস্যা ইটভাটা। ভাটার ধুলায় ঢেকে গেছে আবুল কালামের ফসলি জমি। ১ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ১০টায়ছবি: জুয়েল শীল

ধুলাবালুতে গাছের পাতাগুলো ধূসর হয়ে গেছে। পাশে ফসলহীন পড়ে আছে কয়েক টুকরা জমি। চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার আমতল গ্রামে দাঁড়িয়ে কৃষক আবুল কালাম আঙুল তুলে এই দৃশ্য দেখালেন। কণ্ঠে চাপা হতাশা, ইটভাটার ধুলা গাছগাছালি নষ্ট করে দিচ্ছে। ফলন কমে যাচ্ছে। পানিও নেই।

এই ক্ষোভ প্রকৃতির দিকে নয়, মানুষের তৈরি বিপদের দিকে। আগামী নির্বাচনে যিনি জয়ী হবেন, তাঁর কাছে আবুল কালামের চাওয়া খুবই সাধারণ। দায়িত্ব নেওয়ার পর অবৈধ ইটভাটা বন্ধ করতে হবে, আর কৃষির জন্য পানির ব্যবস্থা করতে হবে।

চন্দনাইশ হলো চট্টগ্রাম-১৪ সংসদীয় আসন। ভোটের আগে মানুষের কথা শুনতে চন্দনাইশের কয়েকটি গ্রাম ঘুরে দেখা হলো। শুরু আমতল থেকে। কথা হলো আবুল কালামসহ আরও ২৫ কৃষকের সঙ্গে। গ্রামে গ্রামে ঘুরে শোনা গেল প্রায় একই অভিযোগ। কোথাও লবণাক্ততার চাপ, কোথাও পানির তীব্র সংকট, কোথাও ইটভাটার দূষণ। এসব অভিযোগ এখন ঢুকে পড়েছে ভোটের আলাপেও।

১ ফেব্রুয়ারি ভোর। চট্টগ্রাম নগরের শাহ আমানত সেতু থেকে বাসে উঠে যাত্রা শুরু হয়। জানালার বাইরে শহরের আলো ফিকে হতে থাকে। খুলতে থাকে দক্ষিণের পথ। কর্ণফুলী আর পটিয়া পেরিয়ে এক ঘণ্টার মধ্যেই পৌঁছে যাই চন্দনাইশের কাঞ্চনাবাদ ইউনিয়নের কাঞ্চননগরে।

কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চন্দনাইশে নির্বাচনী ক্যাম্প করে ধানের শীষ ও ছাতা প্রতীকের প্রচার চালাচ্ছেন প্রার্থীরা। ১ ফেব্রুয়ারি বেলা সাড়ে ১১টায় চন্দনাইশের বাগিচার হাটে
ছবি: প্রথম আলো

কাঞ্চননগরে সকাল হলেই জমে ওঠে ছোটখাটো হাট। চারদিকে সবজির গন্ধ, মানুষের ডাকাডাকি। কেউ এনেছেন লাউ, কেউ কাঁচা মরিচ, কেউ ফুলকপি। যাঁর হাতে যা, তাই নিয়েই বসেছেন। বিক্রি হলেই দিনের খরচ উঠবে।

হাটের এক পাশে পুকুরের কই মাছের ঝুড়ি সামনে রেখে হাঁক দিচ্ছিলেন আসলাম মিয়া—‘কই মাছ কেজি তিন শ’ কথার ফাঁকে জানালেন, তাঁর বাড়ি আমতল গ্রামে। নিজের পুকুরের মাছই বাজারে তুলেছেন। আমতলের পথও দেখিয়ে দিলেন। বিদায় নেওয়ার আগে একটু থেমে বললেন, ‘গ্রামে ঢোকার আগে মাস্ক নেন। ওখানে ধুলাবালু অনেক।’ কথাটায় বোঝা গেল, আমতলের ধুলা শুধু রাস্তার নয়, পুরো গ্রামের মানুষেরই নিত্যসঙ্গী।

বালুতে ডুবছে জমি

ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় আমতলের পথে রওনা। গ্রামে ঢুকতেই চোখে পড়ে প্রার্থীদের ছোট ছোট ব্যানার। চালক মোহাম্মদ ইউনুস। তিনি জানালেন, ধানের শীষ, ছাতা আর মোমবাতি—এই তিন প্রতীকের প্রচারই বেশি চোখে পড়ছে এবার।

অটোরিকশা এগোয় হেলেদুলে। মেঠো পথে বালু উড়ছে। নাক চেপে ধরতে হলো বারবার। পথে চোখে পড়ে ৮ থেকে ১০টি ইটভাটা। চাষের জমিতেই গড়ে উঠেছে ভাটাগুলো। চিমনির ধোঁয়ার সঙ্গে ধুলা ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। বসে পড়ছে গাছের পাতায়, জমির ওপর।

গ্রামের একেবারে শেষ মাথায় এসে গাড়ি থামে। সামনে আর পাকা রাস্তা নেই। শুধু মাটির পথ আর দূরে পাহাড়ের সারি। পথের ধারে দুটো চায়ের দোকান, যেন এই প্রান্তের শেষ ভরসা। ধুলোমাখা বাতাস গায়ে মেখে ঢুকলাম একটিতে।

সেখানেই বসে ছিলেন কৃষক আবুল কালাম। দোকানটিও তাঁর। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে চট্টগ্রামের ভাষায় বললেন, ‘ভোটর সমত মিষ্টি মিষ্টি হতা হুনা যায়। ভোট গেলে গোই কেউর হবর ন থাকে। গোটা গ্রামত ইটভাটা। বেগ্গিন অবৈধ। ভাটার বালু উড়ি আয়েরে খেত হামারি নষ্ট গই দের।’

কৃষকদের অভিযোগের সত্যতা জানতে যোগাযোগ করা হয় পরিবেশ অধিদপ্তরের সঙ্গে। তারা জানায়, চন্দনাইশ উপজেলায় ৩২টি ইটভাটা রয়েছে, যার কোনোটিরই অনুমোদন নেই। পাহাড় কেটে ও কৃষিজমির মাটি তুলে এসব ভাটায় ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে পরিবেশ ও কৃষি—দুটিই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

‘হনে চাইব আঁরারে’

আমতল থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় পৌঁছাই হাশিমপুর ইউনিয়নে। ইউনিয়নটি উত্তর, দক্ষিণ ও মধ্যম—এই তিন ভাগে বিভক্ত। দক্ষিণ হাশিমপুর গ্রামে ঢুকতেই চোখে পড়ে কয়েকটি বড় দালান। সেখানে ঝুলছে বিএনপি, এলডিপি (১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্য), মোমবাতিসহ বিভিন্ন প্রতীকের ব্যানার। গ্রামে ভোটের উপস্থিতি স্পষ্ট, কিন্তু উত্তাপ কম।

গ্রামের ভেতর একটি পানের দোকানের সামনে থামি। দোকানে রং–চা, কলা আর কিছু চিপস। ভেতরে রাখা বড় একটি ক্যারম বোর্ড ঘিরে খেলায় মগ্ন চার যুবক—নিজাম উদ্দিন, মোহাম্মদ আকবর, তৌহিদুল আলম ও মোহাম্মদ আরহান। বয়স ২৮ থেকে ৩০-এর মধ্যে। তাঁরা জানালেন, সবাই ভোট দিতে যাবেন। ১২ ফেব্রুয়ারি সকালেই বাড়ির পাশের কেন্দ্রে ভোট দেবেন। সহিংসতার আশঙ্কাও তাঁরা দেখছেন না।

ভোট নিয়ে তাঁদের কথায় স্বস্তি আছে। কিন্তু গ্রামের সমস্যার কথা উঠতেই আলাপ থেমে যাওয়ার ভঙ্গি। তারপর সড়কের আরেক পাশে বসে থাকা একজনকে দেখিয়ে বললেন, ‘উনি এলাকার মুরব্বি। ওনার সঙ্গে কথা বলেন।’

কাছে গিয়ে জানা গেল, তিনি কৃষক আবুল হাশেম। বয়স ৫০ ছুঁই ছুঁই। কুশল বিনিময়ের পর গ্রামের সমস্যা আর নির্বাচিত প্রার্থীর কাছে প্রত্যাশার কথা জানতে চাইলে ধীরে ধীরে খুলে যায় তাঁর হতাশার গল্প। চট্টগ্রামের ভাষায় তিনি বলেন, ‘গ্রামত সমস্যার অভাব নাই। উদিনত চাষর পানি পঅন ন যায়। দূরদূরান্তর তুন পানি আনা লাগে। হিসাব গরি পানি হরচ গরঅন পড়ে। নির্বাচন অইলে আঁরারে হনে চাইব। হনে ইন সমাধান গরিবঅ। আঁরা ন জানি।’

(গ্রামে সমস্যার অভাব নেই। শুষ্ক মৌসুমে সেচের পানি পাওয়া যায় না। দূরদূরান্ত থেকে পানি আনতে হয়। হিসাব করে পানি খরচ করতে হয়। নির্বাচন হলে আমাদের কে দেখবে, কে এসব সমস্যার সমাধান করবে—আমরা জানি না।)

ভোটের সমীকরণ

এ আসনে ভোটের সমীকরণ এবার কিছুটা জটিল। লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান অলি আহমদ এবার নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন না। এবার তাঁর দল জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ‘১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্য’-এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। চন্দনাইশ আসন থেকে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন অলি আহমদের ছেলে ওমর ফারুক। তাঁর মার্কা ছাতা।

এই আসনে বিএনপি প্রার্থী করেছে জসীম উদ্দীন আহমদকে। তবে দলটির দক্ষিণ জেলা শাখার সাবেক সহসভাপতি মোহাম্মদ মিজানুল হক চৌধুরী এবং দক্ষিণ জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি শফিকুল ইসলাম—দুজনই স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচনে লড়ছেন।

আসনটিতে আরও প্রার্থী হয়েছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মোহাম্মদ আবদুল হামিদ, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের এইচ এম ইলিয়াছ, জাতীয় পার্টির মোহাম্মদ বাদশা মিয়া, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের মো. সোলাইমান।

এখানে ভোটার আছেন ৩ লাখ ১৩ হাজার ৫১৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৬৫ হাজার ৮৪৭ জন।