কুমিল্লায় যত্নে গড়া হাসানের ‘বনসাই রাজ্য’

বনসাইয়ের সঙ্গে হাসান ফিরোজের চার দশকের সখ্য। কুমিল্লায় তাঁর বাড়ির ছাদজুড়ে বনসাই আর বনসাই।

কুমিল্লায় বনসাইয়ের বিশাল সংগ্রহশালা গড়ে তুলেছেন বৃক্ষপ্রেমী হাসান ফিরোজ। সম্প্রতি নগরের শুভপুর এলাকা থেকে তোলাছবি: প্রথম আলো

বাড়ির নাম ‘সহোদরা’। প্রধান ফটক দিয়ে ঢুকতেই আঙিনায় চোখে পড়ে বেশ কিছু বনসাই। দোতলা বাড়ির ছাদে ওঠার সিঁড়িতেও বনসাইয়ের মেলা। সৌন্দর্য দেখতে দেখতে ছাদে যেতেই চোখে পড়ল মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। ছাদজুড়েই বনসাই আর বনসাই। বাইরের বিশাল আকৃতির বটগাছও সেখানে ছোট্ট টবের মধ্যে মুগ্ধতা ছড়িয়ে যাচ্ছে।

বাড়িটির অবস্থান কুমিল্লা নগরের শুভপুর এলাকায়। সেখানে বনসাইয়ের এই বিশাল সংগ্রহশালা গড়ে তুলেছেন বৃক্ষপ্রেমী হাসান ফিরোজ। বনসাইয়ের সঙ্গে তাঁর চার দশকের সখ্য। বর্তমানে বিভিন্ন প্রজাতির পাঁচ শতাধিক বনসাই রয়েছে তাঁর। দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিটি গাছকে পরম যত্নে লালন করেন তিনি। প্রতিটি গাছ যেন তাঁর সন্তানের মতোই। কোনোটির বয়স ৫০ বছর, কোনোটির ৫ বছর। বড় গাছকে টব বা ছোট পাত্রে ছোট করে রাখার বিশেষ পদ্ধতিকে বলা হয় বনসাই।

৭০ বছর বয়সী হাসান ফিরোজ দীর্ঘদিন বাংলাদেশ টেলিভিশনে চাকরি করেছেন। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনের পরিচালক হিসেবে অবসর নেন। ব্যক্তিগতভাবে দেশে তাঁর সংগ্রহেই সবচেয়ে বেশি বনসাই আছে বলে ধারণা হাসান ফিরোজের। তিনি একজন লেখকও। তাঁর লেখা বেশকিছু বই প্রকাশিত হয়েছে।

বনসাইয়ের রাজ্যে একদিন

স্থানীয় শুভপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে গিয়ে হাসান ফিরোজের বাড়ি কোন দিকে, জিজ্ঞাসা করতেই এক তরুণ বলে উঠলেন, সামনে গিয়ে ডান দিকের গলিতে ঢুকলেই ‘বনসাই বাড়ি’। তাঁর কথা অনুযায়ী গলিতে ঢুকতেই দূর থেকে দোতলা বাড়িটির ছাদে চোখে পড়ল সারি সারি বনসাই।

আমার কাছে যেসব বনসাই আছে, এগুলোর বাজারমূল্য হিসাব করলে পাঁচ হাজার টাকা থেকে পাঁচ লাখ টাকা। কিন্তু এগুলো আমি বিক্রি করি না। বনসাইগুলো আমার প্রাণ।
হাসান ফিরোজ, বনসাই শিল্পী

বাড়িতে ঢুকতেই আঙিনায় ‘ফাইকাস’ গোত্রের একটি গাছ দেখিয়ে হাসান ফিরোজ বললেন, এটির বয়স ৪০ বছর। সাইকাস গোত্রের আরেকটি গাছের বনসাই দেখালেন তিনি। প্রায় ৫০ বছর বয়সী গাছটি বলা চলে মাটি ছাড়াই বেঁচে আছে।

বাড়ির ছাদে ফাইকাস গোত্রের একটি বটগাছ দেখিয়ে হাসান ফিরোজ বললেন, বনসাইটির বয়স অন্তত ৪৫ বছর। এটি তাঁর পুরোনো গাছগুলোর একটি।

এভাবেই পুরো ছাদটি ঘুরিয়ে শতাধিক বনসাইয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন তিনি। তবে বয়সের ভারে বর্তমানে অনেক গাছের নাম মনে রাখতে পারেন না বলে জানান তিনি।

গাছ দিয়ে শিল্পকর্ম

হাসান ফিরোজের বনসাই বাগানে দূর থেকে একটি গাছের আকৃতি দেখলে মনে হবে ‘উট’ বসে আছে। ওই গাছের বয়সও ৩০ বছরের বেশি বলে জানিয়েছেন তিনি। ফাইকাস গোত্রের একটি গাছে পুরোনো আমলের ‘চাবি’র আকৃতি তৈরি করেছেন তিনি। হাসান ফিরোজ এটির নাম দিয়েছেন ‘প্রকৃতির চাবি’। বাঁশের একটি বনসাই দেখিয়ে তিনি বলেন, এটির বয়স ৩০ বছরের বেশি।

ছাদে গিয়ে দেখা যায়, ছোট ছোট মাটির পাত্র বা টবে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রজাতির গাছের শত শত বনসাই।

হাসান ফিরোজের এই সংগ্রহশালা হারিয়ে যাওয়া অনেক গাছের অস্তিত্ব জানান দেয়। কুমিল্লায় তাঁর চেয়ে বেশি বনসাই কারও কাছে নেই। তিনি আসলেই বনসাইয়ের ‘জাদুকর’।
আহসানুল কবীর, ইতিহাস গবেষক

যেভাবে জড়ালেন বনসাইয়ের মায়ায়

শুরুর গল্পটা বলতে গিয়ে হাসান ফিরোজ ফিরে যান ১৯৭৫-৭৬ সালে। ওই সময় চীন থেকে আসা একটি বনসাই দেখে তিনি মুগ্ধ হন। যা থেকে বনসাইয়ের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়।

হাসান ফিরোজ জানান, এর পর থেকে তিনি চেষ্টা করতে থাকেন কীভাবে বনসাই করা যায়। তখন বনসাইয়ের নির্মাণকৌশল বা কোনো কিছুই সহজে পাওয়া যেত না। এখন তো ইউটিউব বা অনলাইনে সার্চ করলেই সবকিছু জানা যায়। একপর্যায়ে দেখলেন, চেষ্টা করতে করতে বোধ হয় বনসাই হচ্ছে। ১৯৮৬ সালে চাকরির সূত্রে চট্টগ্রাম চলে যান। সেখানে বড় একটা ছাদ পান, যাতে বৃহৎ পরিসরে বনসাই নিয়ে কাজ শুরু করেন।

২০০৩ ও ২০০৫ সালে চট্টগ্রামে হাসান ফিরোজের একক বনসাইয়ের প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। তিনি বলেন, ‘একক বনসাই প্রদর্শনী তখনো দেশে একমাত্র আমারটাই ছিল। পরবর্তী সময়ে বদলির সূত্রে চলে গেলাম ঢাকায়, সেখানে তো আর এত বড় ছাদ পাওয়া সম্ভব নয়। তখন আমাকে কিছু গাছ কমাতে হয়েছিল।’

২০১৬ সালে চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর থেকে তাঁর অস্তিত্বজুড়ে এখন শুধু বনসাই।

বনসাইগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা

শত শত বনসাই তৈরি করলেও বিক্রি করেন না উল্লেখ করে হাসান ফিরোজ বলেন, ‘আমার কাছে যেসব বনসাই আছে, এগুলোর বাজারমূল্য হিসাব করলে পাঁচ হাজার টাকা থেকে পাঁচ লাখ টাকা। কিন্তু এগুলো আমি বিক্রি করি না। বনসাইগুলো আমার প্রাণ। আমি তাদের লালন-পালন করে তৃপ্তি পাই।’

স্ত্রী আর দুই কন্যাসন্তান রয়েছে হাসান ফিরোজের। বড় মেয়ের নাম সানজিদা হোসেন আর ছোট মেয়ে নাজিয়া হোসেন। আক্ষেপ প্রকাশ করে হাসান ফিরোজ বলেন, ‘পরিবারের সদস্যরা সবাই যার যার কাজে ব্যস্ত। এখন আমি একটু চিন্তিত, আমার বিদায়ের পর এই গাছগুলোর কী হবে?’

 কুমিল্লার ইতিহাস–গবেষক আহসানুল কবীর প্রথম আলোকে বলেন, হাসান ফিরোজের এই সংগ্রহশালা হারিয়ে যাওয়া অনেক গাছের অস্তিত্ব জানান দেয়। কুমিল্লায় তাঁর চেয়ে বেশি বনসাই কারও কাছে নেই। তিনি আসলেই বনসাইয়ের ‘জাদুকর’।