‘গাছের জন্য’ বানালেন বাড়ি, এখন ছাদবাগানে লাখ টাকার ব্যবসা শারমিনের
রাজশাহীর একটি তিনতলা বাড়ির ছাদ। সেখানে সারি সারি টব, বাহারি ফুল, বনসাই, ক্যাকটাস, অর্কিড, সাকুলেন্ট, অ্যাডেনিয়াম—কী নেই সেখানে! গাছের সংখ্যা এত বেশি যে জায়গা বাঁচাতে বানানো হয়েছে একাধিক স্তরের কাঠামো। ছাদ ছাড়িয়ে এখন বাড়ির সীমানা ছড়িয়ে পড়ছে এই বাগান।
এই বাগানের মালিক শারমিন আক্তার। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবস্থাপনায় বিবিএ ও এমবিএ করেছেন তিনি। তাঁর স্বামী জাহাঙ্গীর আলম পেশায় ব্যাংকার। দুজনের মিলিত শখ এখন ব্যবসায় রূপ নিয়েছে। ‘নেসারস টাচ’ নামে তাঁদের গাছের ব্যবসা চলছে। শারমিন জানান, মাসে গড়ে লাখ টাকার বেশি বিক্রি হয়। কোনো কোনো মাসে বিক্রি হয় তিন লাখ টাকা পর্যন্ত। তাঁদের বাড়ি রাজশাহী নগরের ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের মোহনপুর এলাকায়।
গাছের প্রতি ভালোবাসা
গাছের প্রতি শারমিনের ভালোবাসা শুরু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়। প্রথম বর্ষের প্রথম সেমিস্টারেই তাঁর বিয়ে হয়। তখন থাকতেন হলে। হলের বারান্দায় কয়েকটি গাছ রাখতেন। বিভাগ ও হলের আশপাশে থাকা মানিপ্ল্যান্ট কিংবা অন্য গাছের ডাল-চারা এনে লাগাতেন।
প্রথম সন্তান হওয়ার সময় স্বামীর সঙ্গে ভাড়া বাসায় ওঠেন। গাছের সঙ্গে সম্পর্কটা তখন আরও গভীর হয়। এক বাসা থেকে আরেক বাসায় যাওয়ার সময় কাপড়চোপড়ের সঙ্গে গাছও যেতে থাকে। শারমিন জানালেন, একপর্যায়ে গাছ রাখাকে কেন্দ্র করে ভাড়া বাসায় অশান্তিও হয়েছে। কোনো বাড়ির মালিক বলেছেন, বাসায় থাকা যাবে, কিন্তু ছাদে গাছ রাখা যাবে না।
গাছ নিয়ে লড়াই
শারমিন জানালেন, একসময় পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে গাছের জন্যই নতুন বাসা খোঁজা শুরু করতে হয়। কয়েকটি বাসা দেখেও শেষ পর্যন্ত পছন্দমতো জায়গা মেলেনি। গাছের সংখ্যা তখন এত বেড়ে গিয়েছিল যে সাধারণ ভাড়া বাসার ছাদে সেগুলো রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। তখনই সিদ্ধান্ত—নিজেদের বাড়ি করতে হবে। আর সেই বাড়ির নকশায় গাছের জায়গা থাকতেই হবে।
২০২১ সালের শেষ দিকে গাছগুলো নতুন বাড়ির ছাদে ওঠানো শুরু হয়। ২০২২ সালের ১৪ জানুয়ারি তাঁরা নতুন বাড়িতে ওঠেন। তবে বাড়ি পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগেই ছাদে গাছ চলে আসে।
বাজারের টাকায় গাছ কেনা
শারমিন জানালেন, স্বামী তাঁকে বাজারের জন্য টাকা দিলে তিনি অনেক সময় তার বড় একটি অংশ গাছ কিনতে খরচ করতেন। গাছ কেনার এই প্রবণতা এমন পর্যায়ে যায় যে বাসা ছাড়ার নোটিশ পাওয়ার দিনও শারমিন একটি গাছ কিনে বাসায় ফিরেছিলেন। সেটি আবার ছিল স্বামীর অপছন্দের সাকুলেন্ট।
সেদিনের কথা বলতে গিয়ে জাহাঙ্গীর হাসতে হাসতে বলেন, বাড়িওয়ালা বাসা ছাড়তে বলেছেন, নতুন বাসা খুঁজতে হবে, অথচ স্ত্রী সেই সময়ও গাছ নিয়ে হাজির।
গাছ নিয়ে যত বিড়ম্বনা
এই দম্পতি জানালেন, একটি ভাড়া বাসায় প্রায় ৯ বছর থাকার পর বাড়ির মালিক তাঁদের বাসা ছাড়তে বলেন। কারণ হিসেবে বলা হয়, বাসা ভাড়া দেওয়া হলেও ছাদ ভাড়া দেওয়া হয়নি; সেখানে এত গাছ রাখা যাবে না। এরপর গাছের জন্য নতুন বাসা খোঁজা শুরু হয়। একটি বাসা পছন্দ হলেও প্রায় ১০০টি গোলাপের টব রাখা হবে শুনে বাড়ির মালিক ভাড়া দেননি।
আমরা গাছের জন্যই বাড়ি করেছি। ভাড়া বাড়িতে কত কষ্ট করেছি। কত কটু কথা শুনতে হয়েছে। হয়তো গাছের জন্যই বাড়ি করার সাহস দেখেছিলাম।শারমিন আক্তার, ছাদবাগানের উদ্যোক্তা
তত দিনে শারমিনের গাছের সংখ্যা এত বেড়েছে যে সাধারণ বাসার ছাদে সেগুলো রাখা সম্ভব নয়। গাছগুলো কোথায় যাবে, এ নিয়ে পরিবারকে বড় ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
‘গাছের জন্যই বাড়ি করেছি’
শেষ পর্যন্ত নিজেদের বাড়ি করার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হয়। বাড়ির কাজ চলার সময় অগ্রাধিকার পায় ছাদ। শারমিন বলেন, দ্রুত ছাদ ঢালাই করে গাছগুলো সেখানে তুলে দিতে চেয়েছিলেন তাঁরা। বাড়ি পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগেই ছাদে পানি দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। গাছগুলো একে একে সেখানে তোলা হয়। জায়গা কমে গেলে গাছ রাখার জন্য তৈরি হয় কাঠামো। একটির ওপর আরেকটি স্তর তৈরি করে জায়গার সর্বোচ্চ ব্যবহার করা হয়। এখন তিনতলা বাড়ির ছাদজুড়ে সেই বাগান।
শারমিন বলেন, ‘আমরা গাছের জন্যই বাড়ি করেছি। ভাড়া বাড়িতে কত কষ্ট করেছি। কত কটু কথা শুনতে হয়েছে। হয়তো গাছের জন্যই বাড়ি করার সাহস দেখেছিলাম। আর বাড়ি করার আগে থেকেই ভাবছিলাম, গাছগুলো কোথায় রাখব।’
বাগানে যেসব গাছ
বাগানটিতে গাছের বৈচিত্র্যই সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ে। অ্যাডেনিয়ামের ২০০-এর বেশি ভ্যারাইটি, অ্যাগলোনিমার ৬০-এর বেশি, অর্কিডের ৬৫-এর বেশি, সাকুলেন্টের প্রায় ১০০, স্নেক প্ল্যান্টের ১০০-এর বেশি এবং ক্যাকটাসের ৫০-এর বেশি ভ্যারাইটি রয়েছে বলে জানান এই দম্পতি।
এ ছাড়া আছে বিভিন্ন ধরনের বনসাই, মনস্টেরা, জিজি প্ল্যান্ট, জেড প্ল্যান্ট, ক্যালাথিয়া, সিঙ্গোনিয়াম, পিস লিলি, পাথোস, অ্যান্থুরিয়াম, ফিটোনিয়া, হাওয়ারথিয়া, ইউফরবিয়া, বাগানবিলাসসহ নানা ধরনের ফুল ও পাতাবাহার গাছ।
ফল ও সবজির গাছও আছে এই দম্পতির ছাদে। আনার, আম, সফেদা, থাই সফেদা, পেয়ারা, ম্যান্ডারিন, অ্যাভোকাডো, অ্যাপ্রিকট, আপেল, আঙুর, পেঁপে, কলা, বেগুন, টমেটো, মরিচসহ বিভিন্ন গাছ রয়েছে।
বাগানে শুধু সৌন্দর্যের জন্য গাছ নয়, পরিবারের খাবারের জন্যও সবজি উৎপাদন করা হয়। শারমিন বলেন, এসব সবজিতে তাঁরা কীটনাশক ব্যবহার করেন না।
গাছের দাম
বাগানের সব গাছের দাম এক নয়। কোনো চারা পাওয়া যায় ২০০-৩০০ টাকায়, আবার কোনো গাছের দাম প্রায় লাখ টাকা পর্যন্ত। শারমিন জানান, অ্যাডেনিয়ামের দাম ৫০ টাকা থেকে শুরু করে লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। তাঁর বাগানের একটি ক্যাকটাস ৬৫ হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন। কিছু বড় ও বিরল গাছের দাম কয়েক হাজার থেকে কয়েক লাখ টাকা।
বাগানের কিছু গাছ আবার ১৭ বছর ধরে তাঁদের কাছে রয়েছে। ২৮ বছর বয়সী ক্যাকটাসও আছে। সবচেয়ে দামি গাছগুলোর মধ্যে রয়েছে বিরল অ্যাডেনিয়াম।
প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে পুরস্কার
শারমিনের এই বাগানের সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি এসেছে জাতীয় পর্যায়ে। পরিবেশবান্ধব এ উদ্যোগের স্বীকৃতি হিসেবে সম্প্রতি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের আয়োজিত ‘বৃক্ষরোপণে জাতীয় পুরস্কার-২০২৫’-এ ‘ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে সৃজিত ছাদবাগান’ ক্যাটাগরিতে সারা দেশে প্রথম স্থান অধিকার করেন। পুরস্কার নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে। শারমিনের কাছে এটি শুধু একটি পুরস্কার নয়, বহু বছরের স্বপ্নপূরণের মুহূর্ত।
‘গাছের ডাক্তার’ শারমিন
শারমিন জানালেন, গাছের পরিচর্যা ও রোগবালাই নিয়ে তাঁর পরামর্শ নিতে আসেন অনেকেই। কারও গাছের পাতা কুঁকড়ে গেলে, পাতা হলুদ হয়ে গেলে, ফল ঝরে পড়লে কিংবা গাছের পরিচর্যায় সমস্যা হলে তাঁকে ছবি পাঠানো হয়।
শারমিন জানালেন, অনেকে মজা করে তাঁকে ‘গাছের ডাক্তার’ বলে ডাকেন। নামটি দিয়েছেন তাঁর নানিশাশুড়ি। পরিচিতদের মধ্যেও নামটি এখন বেশ জনপ্রিয়। তাঁর ভাষ্য, ছবি দেখেই অনেক সময় পরামর্শ দিতে পারেন। প্রয়োজন হলে নিজেও গিয়ে গাছ দেখে আসেন।
স্বামীর সহযোগিতা
এই পথচলায় স্বামীর সহযোগিতাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন শারমিন। গাছ কেনা, পরিচর্যার লোক ঠিক করা, কাঠামো তৈরি থেকে গাছ সরানো—সবকিছুতেই পাশে থাকেন জাহাঙ্গীর।
আগস্টে প্রায় তিন লাখ টাকার গাছ বিক্রি হয়েছে শারমিনের। গড়ে মাসে লাখ টাকার বেশি বিক্রি হয়।
শারমিন বলেন, ‘গাছের প্রতি আমার এই ভালোবাসায় সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা পেয়েছি আমার স্বামীর কাছ থেকে। তিনি আর্থিক ও মানসিকভাবে সব সময় পাশে থেকেছেন। তাঁর সহযোগিতা না থাকলে এত বড় বাগান করা সম্ভব হতো না।’
জাহাঙ্গীরও এখন গাছের নাম মনে রাখেন, বনসাই তৈরি করেন। সন্তানদের মধ্যেও গাছের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়েছে। মেজ ছেলে বৃত্তির টাকা দিয়ে মাকে গাছ কিনে দিয়েছে।
মাসে আয় কত, ব্যয় কত
গাছের শখ এখন শারমিনদের ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। ‘নেসারস টাচ’ নামে তাঁদের ফেসবুক পেজ আছে। অফলাইন–অনলাইনে বিক্রি হচ্ছে। শারমিন জানান, গত মাসে প্রায় তিন লাখ টাকার গাছ বিক্রি হয়েছে। মাসভেদে বিক্রি কমবেশি হয়। গড়ে মাসে লাখ টাকার বেশি বিক্রি হয়।
বাগানের পরিচর্যার বিভিন্ন সময়ে ৮ থেকে ১০ জন মানুষ যুক্ত থাকেন। কেউ কমিশনভিত্তিতে গাছ বিক্রি করেন। দুজনকে নিয়মিত বেতন দিতে হয়। তাঁদের একজনকে ১২ হাজার এবং অন্যজনকে ১৮ হাজার টাকা।
তবে শারমিন ও তাঁর স্বামী নিজেদের শ্রমের কোনো মূল্য হিসাব করেন না। শারমিনের ভাষায়, ‘আমাদের শ্রমটা ফ্রি। কিন্তু এই বাগান থেকে যে মানসিক শান্তি পাই, সেটার দাম তো হিসাব করা যায় না।’
আরও বড় করার পরিকল্পনা
ছাদবাগানেই থেমে থাকতে চান না শারমিন। এখন বাগানকে আরও বড় করার পরিকল্পনা আছে তাঁর। বাড়ির সীমানার জায়গাও ফাঁকা রাখেননি তাঁরা। সেখানে লাউ, কলা, পেঁপে, বেগুন, টমেটো, মরিচসহ বিভিন্ন গাছ লাগানো হয়েছে। সামনে শীতের সবজির চাষও করার পরিকল্পনা রয়েছে।
অন্যদিকে রাস্তার পাশে একটি বিক্রয়কেন্দ্র করার প্রস্তুতি চলছে। সেখানে সাধারণ গাছের পাশাপাশি টব, সার ও অন্যান্য বাগানসংশ্লিষ্ট উপকরণ পাওয়া যাবে। শারমিনের লক্ষ্য, ক্রেতারা যেন শুধু একটি গাছ কিনতে না এসে গাছের পরিচর্যা সম্পর্কেও ধারণা পান।
শারমিনের স্বপ্ন এখন আরও বড়—ছাদবাগানকে একটি পূর্ণাঙ্গ নার্সারি ও প্ল্যান্ট সেন্টারে রূপ দেওয়া।
একপর্যায়ে গাছ রাখাকে কেন্দ্র করে ভাড়া বাসায় অশান্তিও হয়েছে। কোনো বাড়ির মালিক বলেছেন, বাসায় থাকা যাবে, কিন্তু ছাদে গাছ রাখা যাবে না।শারমিন আক্তার
গাছের জন্য একসময় এক বাসা থেকে আরেক বাসায় ছুটতে হয়েছিল শারমিনকে। গাছের জন্যই শেষ পর্যন্ত বানিয়েছেন তিনতলা বাড়ি। সেই ছাদের বাগানই এখন তাঁর পরিচয়, শখ ও আয়ের উৎস। শারমিনের কথা, গাছের প্রতি যে ভালোবাসা একসময় পরিবারের কাছে ছিল বিরক্তির কারণ। সেটিই এখন তাঁদের পরিবারের সবচেয়ে বড় সম্পদগুলোর একটি। প্রধানমন্ত্রী তাঁকে বলেছেন, তিনি যেন আরও অনেকের মধ্যে গাছের প্রতি এই ভালোবাসা ছড়িয়ে দেন।