মাঝযমুনায় জেগে উঠেছে অসংখ্য ডুবোচর। মাঝে বিস্তীর্ণ ধু ধু বালুচর। চরে জেগেছে সবুজ ঘাসের চাদর। বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠে মরিচ, ভুট্টা, শসা, মসুর ডাল, বোরো ধান। বগুড়ার সারিয়াকান্দি বন্দরের কালীতলা খেয়াঘাট থেকে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় প্রায় দুই ঘণ্টা লেগে যায় চরাঞ্চলের জামথল নৌঘাটে পৌঁছাতে। সেখান থেকে কাছাকাছি জনপদ শাহজালাল বাজার ও আনন্দবাজার।
দুর্গম বালুচরের ভাঙাচোরা রাস্তায় যাতায়াতের ভরসা ঘোড়ার গাড়ি ও ইজিবাইক। ইজিবাইকে খেয়াঘাট থেকে পাঁচ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে শাহজালাল বাজারে পৌঁছাতে লেগে গেল প্রায় এক ঘণ্টা। দুপুরের আগেই খাঁ খাঁ করছে চরের এ বাজার। জেলা শহরের মতো এখানে ভোটের আমেজ নেই। মোড়ে মোড়ে নেই ব্যানার, ফেস্টুন, বিলবোর্ড। নেই মিছিল-স্লোগান, মাইকিং। ভোট নিয়ে ভোটারদেরও আগ্রহ নেই। তবে আছে মানুষের চাওয়া-পাওয়া আর হতাশা-বঞ্চনার নানা আক্ষেপ।
গতকাল শনিবার দুপুরে কাজলার চরের শাহজালাল বাজারে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা হয়। নির্বাচনের পর কে ক্ষমতায় যাবে, চরের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হবে কি না, এসব নিয়ে আশা-নিরাশার দোলাচলে তাঁরা। চরবাসীর ভাষ্য, ভোট এলেই চরের মানুষের কদর বাড়ে। ভোটের পর কারও খোঁজ থাকে না।
টেংরাকুরা চরের আজগর আলী (৭০) বলেন, ‘চরে লাখো মানুষের বাস। জিতপার গেলে চরের ভোট লাগবি। চরের ভোটাররা যাক ভোট দিবি, সেই এমপি হবি। ভোটত জিতে সরকারত যাই যাক, হামাকেরে ভাগ্য বদলাবি না। চরত খালি নাই আর নাই।’
সারিয়াকান্দি ও সোনাতলা উপজেলা নিয়ে গঠিত বগুড়া-১ আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৫৫ হাজার ১৫৫ জন। সারিয়াকান্দির ১২টি ইউনিয়নের মধ্যে কাজলা, কর্ণিবাড়ী, চালুয়াবাড়ি ও বোহাইল ইউনিয়নের পুরোটা যমুনার দুর্গম চরাঞ্চলে। এ ছাড়া হাটশেরপুর, কুতুবপুর, কামালপুর, চন্দনবাইশা ও সারিয়াকান্দি সদরের একাংশও যমুনার চরে। ভোটের জয়-পরাজয়ের সমীকরণে বড় ভূমিকা রাখেন ৮২টি চরের লাখো ভোটার।
এবারের নির্বাচনে এখানে বিএনপির কাজী রফিকুল ইসলাম ধানের শীষ প্রতীকে, জামায়াতে ইসলামীর মো. শাহাবুদ্দিন দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে, বাংলাদেশ কংগ্রেসের মো. আসাদুল হক ডাব প্রতীকে, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের এ বি এম মোস্তাফা কামাল পাশা হাতপাখা প্রতীকে এবং গণফোরামের জুলফিকার আলী সূর্য প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
‘চরত ভোটের উৎসব নাই’
বেড়া পাঁচবাড়িয়া চরের জয়নাল শেখ (৫৫) বলেন, ‘দ্যাশত এত বড় ভোট হচ্চে। চরত ভোটের উৎসব নাই। ভোট লিয়ে চরের মানুষের মধ্যে আগ্রহও নাই। সরকার যাবি, সরকার আসপি, কিন্তু হামাকেরে ভাগ্য বদলাবি না। চরের মানুষের কষ্ট থ্যাকেই যাবি।’
খেয়ানৌকার যাত্রী হযরত শেখ (৬০) বলেন, ‘ধানের শীষ আর দাঁড়িপাল্লা মার্কার মধ্যে ফাইট হবি। কিন্তু হ্যাঁ-না ভোটত কে দাঁড়াচে সেডা খালি বুঝবার পারিচ্চি না। এডা আবার কার মার্কা?’
তবে প্রচারণায় কমতি নেই দাবি করে চরের ভোটার উজ্জ্বল মিঞা বলেন, ধানের শীষের প্রার্থী রফিকুল ইসলাম ভোট চাইতে এসেছেন। দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী মো. শাহাবুদ্দিনও এসেছেন কয়েক দিন আগে। চরে রাস্তাঘাট, কলেজ, হাসপাতাল স্থাপন ছাড়াও কর্মসংস্থানের দাবির কথা জানিয়েছেন ভোটাররা। যমুনায় দ্বিতীয় সেতু নির্মাণের দাবি সরকারের কাছে তুলে ধরার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন দুই প্রার্থী।
চরের নারীদের অন্দরমহলেও ভোট চাইছেন প্রার্থীদের কর্মীরা। জামথল গ্রামের গৃহবধূ শাহিনুর বেগম বলেন, ‘ধানের শীষ আর দাঁড়িপাল্লার লোকজন ভোট চাবার জন্যি বাড়িত আসিচ্চে। সগলি খালি বাড়িত পাক পারিচ্চে।’
বেড়া পাঁচবাড়িয়া চরের আবদুল করিম প্রামাণিক (৫০) বলেন, ‘এইবার ভোটত নৌকা নাই। কিন্তু আওয়ামী লীগের ভোটার আছে। আওয়ামী লীগের ভোট যে যত বেশি টানতে পারবি, সেই এমপি হবি।’
‘খালি অ্যাকনা কাজ চাচ্চি’
ধারাবর্ষার চরের কৃষক গণি শেখ বলেন, ‘চরত হাট বসপি ক্যাংকা করে? নদী পারাপারে ভরসা খালি নৌকা। হাট বসলেও তো ব্যাপারী মিলবি না। নেতারা ভোট চাবার আসিচ্চে। হামাকারে কষ্ট ক্যাংকা করে শ্যাষ হবি, সেডা কেউ কচ্চে না। চরে অ্যাকনা পাকা সড়ক নাই। খ্যাতের ফসল বিক্রি করার জন্যি হামরা চরত হাট চাই।’
চালুয়াবাড়ি ইউনিয়নের দুর্গম হাটবাড়ি ও দলিকার চরেও ভোটের আমেজ নেই। সেখানে শুধু কর্মহীন মানুষের কষ্ট-হাহাকার। হাটবাড়ি চরের নজরুল শেখ যমুনায় মাছ ধরে সংসার চালান। ভোটের আলাপ তুলতেই বললেন, ‘মাছ না জুটলে বউ-ছলের মুখত ভাত জোটে না। যমুনায় পানি নেই। মাছের আনাগোনা কমেছে। সারা দিন জাল টেনেও নদীতে মাছ ধরা পড়ে না। ভোট দিতে হবিই। লেতাকেরে কাছে শুধু একটাই চাওয়া, দশবার বসতঘর ভাঙছে যমুনায়। একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই চাই। কাজ করে বাঁচার চাই।’
দলিকার চরের দিনমজুর লাল মিয়া বললেন, ‘খুব কষ্টে আচি। হাতত কাজ নাই। কামাই-রোজগার নাই। খাবারের কষ্ট। কামলা জোটে না। সংসারত চারডা মানুষ। চরত ভোট চাবার যারা আসিচ্চে তারকেরে কাচে কিচ্চু চাচ্চি না, খালি অ্যাকনা কাজ চাচ্চি।’
পুলিশ ফাঁড়ি, কলেজসহ নানা দাবি
কাজলা ইউনিয়নের অবস্থান যমুনা নদীর পূর্ব পাড়ে জামালপুরের সীমানা ঘেঁষে। এখান থেকে নানা প্রয়োজনে বাসিন্দাদের সারিয়াকান্দি উপজেলা সদর ও বগুড়া শহরে যেতে হয়। জামথল খেয়াঘাট থেকে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় যেতে প্রায় ৩-৪ ঘণ্টা লেগে যায়। চরে একটি স্কুল থাকলেও নেই কলেজ, স্বাস্থ্যকেন্দ্র। পাকা রাস্তাঘাটও নেই। বর্ষায় পানিবন্দী ও নদীভাঙন–আতঙ্কে থাকতে হয়।
টেংরাকুরা চরের তরুণ ভোটার রুবেল রানা বলেন, চরে লাখেরও বেশি ভোটার। কিন্তু অনেক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত এখানকার মানুষ। চারদিকে মাদকের ছড়াছড়ি। কোনো পুলিশ ফাঁড়ি, হাসপাতাল নেই। অনেক সময় নদী পারাপার হতেই রোগী মারা যায়। বিদ্যালয়ের গণ্ডি পার হলে যমুনা পাড়ি দিয়ে কলেজে ভর্তি হতে হয়। নদীভাঙনে প্রতিবছর শত শত বসতবাড়ি ও হাজার হাজার একর আবাদি জমি যমুনা গর্ভে বিলীন হয়। এ জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দরকার।
বগুড়ার সারিয়াকান্দি ও জামালপুরের মাদারগঞ্জের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করতে যমুনায় দ্বিতীয় সেতু নির্মাণের দাবি চরগুলোর লাখো মানুষের। কর্ণীবাড়ি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন বলেন, দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থার কারণে উৎপাদিত মরিচ, ধান, বাদামসহ কৃষিপণ্যের ঠিকমতো দাম পাওয়া যায় না। চরে রাস্তাঘাট পাকাকরণ, নদীভাঙন রোধ ছাড়াও যমুনায় দ্বিতীয় সেতু নির্মাণের দাবি চরাঞ্চলের ভোটারদের। সেতুটি হলে উত্তরবঙ্গের সঙ্গে রাজধানীর উন্নত সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা নিশ্চিত হবে।
বিএনপির প্রার্থী কাজী রফিকুল ইসলাম বলেন, বিজয়ী হলে চরাঞ্চলের চিত্র পাল্টে দেবেন। ভাঙনরোধে প্রকল্প হবে। স্কুল-কলেজ ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র হবে। চরাঞ্চলের মানুষের জন্য কর্মসংস্থান করা হবে। বিএনপি ক্ষমতায় গেলে যমুনায় দ্বিতীয় সেতু নির্মাণ করা হবে।
অভিন্ন সুরে জামায়াতের প্রার্থী মো. শাহাবুদ্দিন বলেন, বগুড়ায় ভোটের অঙ্ক পাল্টে গেছে। মানুষ চাঁদাবাজি, বালু লুট, দুর্নীতি সন্ত্রাস থেকে মুক্তি চায়। চরের ভোটাররা দাঁড়িপাল্লার দিকে ঝুঁকেছেন।
ব্যালট ফিরিয়ে আনতে হেলিকপ্টার চায় প্রশাসন
সারিয়াকান্দি উপজেলার দুর্গম কাজলা, হাটশেরপুর, বোহাইল, চালুয়াবাড়ি ও কর্ণীবাড়ি ইউনিয়নে ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তায় ইতিমধ্যে চরে ক্যাম্প স্থাপন করেছে সেনাবাহিনী।
জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মো. তৌফিকুর রহমান বলেন, সারিয়াকান্দি ও সোনাতলার দুর্গম চরাঞ্চলের ভোটকেন্দ্রে অবাধ ও সুষ্ঠু ভোট গ্রহণ নিশ্চিতে সব ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রে কেন্দ্রে ব্যালট পেপারসহ সরঞ্জাম পাঠানো নিশ্চিত করা হয়েছে। ভোট গ্রহণের পর দুর্গম চরের কেন্দ্রগুলো থেকে দ্রুত ব্যালট পেপার উপজেলা সদরে আনতে নির্বাচন কমিশন থেকে হেলিকপ্টার চাওয়া হয়েছে।