সন্দ্বীপের সবুজচরে বাইন পদ্ধতির ধান চাষ কীভাবে খরচ বাঁচাচ্ছে

বীজতলার মাধ্যমে অন্য এলাকায় ধানের চাষ হলেও সন্দ্বীপের সবুজচরে ধান চাষ হয় ‘বাইন’ পদ্ধতিতে। এ পদ্ধতিতে চাষ তুলনামূলক সহজ। প্রথমে ধানবীজকে অঙ্কুরিত করা হয়। তারপর সারি করে ছিটানো হয় জমিতে। বীজতলা তৈরির বাড়তি ঝামেলা না থাকায় এতে বাড়তি কৃষিশ্রমিকেরও প্রয়োজন হয় না।

সবুজচরে ধানের অঙ্কুরিত বীজ ছিটাচ্ছেন চাষি। বীজ ছিটিয়ে এমন পদ্ধতির চাষের নাম বাইন। এই প্রদ্ধতিতে বীজতলা করতে হয় না বলে খরচ ও শ্রম কম লাগেছবি: প্রথম আলো

চলছে আষাঢ়ের শেষভাগ। চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের সবুজচরের বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এখন কৃষকদের ব্যস্ততা। বালতি আর বস্তায় করে অঙ্কুরিত বীজ নিয়ে জমিতে ছিটিয়ে যাচ্ছিলেন কৃষকেরা। কৃষকদের কাছে এ ধরনের চাষপদ্ধতির নাম ‘বাইন’। এ পদ্ধতিতে বীজতলা করতে হয় না বলে কৃষকের খরচও যেমন কম হয়, তেমনি শ্রমও দেওয়া লাগে কম।

কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অন্য এলাকায় বীজতলের মাধ্যমে ধান চাষ হলেও এখানে হয় ‘বাইন’ পদ্ধতিতে। এ পদ্ধতিতে চাষ তুলনামূলক সহজ। প্রথমে ধানবীজকে অঙ্কুরিত করা হয়। তারপর সারি করে ছিটানো হয় জমিতে। বীজতল তৈরির বাড়তি ঝামেলা নেই এতে।

চাষিরা জানিয়েছেন, সপ্তাহখানেকের মধ্যে অঙ্কুরিত ধানবীজ থেকে মাথা তুলে দাঁড়াবে চুলের মতো সরু ধানের চারা। আষাঢ় শেষ হতেই সবুজে ছেয়ে যাবে পুরো চর, আর শ্রাবণে বাতাসে দোল খাবে পরিপূর্ণ ধানের গাছ। চাষিদের হিসাবে, এবার ডোবাচরসহ সবুজচরের প্রায় পাঁচ হাজার হেক্টর জমিতে ধান চাষ হচ্ছে। সুস্থ-সবল ধান জন্মাতে এখন দরকার আর্দ্র আবহাওয়া।

এখানকার প্রায় চার হাজার হেক্টর জমিতে ছিটানো হচ্ছে রাজাশাইল ও লেম্বু ধানের বীজ। অঙ্কুরিত বীজকে কৃষকদের ভাষায় বলা হয় ‘বাইন’। সন্দ্বীপের উপকূলবর্তী নোনা জমিতে কয়েক শ বছর ধরে চাষ হচ্ছে স্থানীয় রাজাশাইল ধান। পাশাপাশি ইদানীং স্থানীয় জাত লেম্বু ধানও চাষ করা হচ্ছে। গত কয়েক বছরে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এই লেম্বু ধানের চাষ।

সন্দ্বীপে ‘বাইন’ পদ্ধতিতে আমন বা শাইল ধানের চাষ হচ্ছে যুগ যুগ ধরে। উপকূলীয় এলাকাগুলোতে এটি ধান চাষের জনপ্রিয় একটি পদ্ধতি। মৌসুমি বৃষ্টি শুরু হলে, বিশেষ করে আষাঢ়ের প্রথম ভাগে জমিতে পানি জমিয়ে রেখে চাষ দিয়ে নরম কাদামাটিতে পরিণত করা হয়। একাধিক দফায় জমি চাষ দেওয়ার পর ছিটিয়ে দেওয়া হয় অঙ্কুরিত ধানের বীজ।

বাকি এক হাজার হেক্টরে চাষ হচ্ছে স্বর্ণ ইরি, বাংলা শাইল, কাজল শাইলসহ আমনের কয়েকটি জাত। কৃষি কর্মকর্তার মতে, আয়তনে সবুজচর এখন দেশের বৃহত্তম একক আমনভান্ডার। তবে উচ্চ ফলনশীল (উফশী) জাতের স্বাদুপানির আমনের আবাদ হয় না বলে উৎপাদন তুলনামূলক কম।

সবুজচরে গিয়ে দেখা যায়, বেশির ভাগ জমিতে ‘বাইন’ ছিটানোর কাজ শেষ করেছেন চাষি। তাঁদের মতে, আগামী কিছুদিন বিশেষ শ্রম দেওয়ার দরকার পড়বে না। চারা গজিয়ে শক্তপোক্ত হওয়া পর্যন্ত এখন কেবল জমিতে পানি ধরে রাখা নিশ্চিত করলেই চলবে। তারপর সার ছিটিয়ে চারার দ্রুত বেড়ে ওঠা নিশ্চিত করতে হবে।

‘বাইন’ পদ্ধতিতে খরচ কম

সন্দ্বীপে ‘বাইন’ পদ্ধতিতে আমন বা শাইল ধানের চাষ হচ্ছে যুগ যুগ ধরে। উপকূলীয় এলাকাগুলোতে এটি ধান চাষের জনপ্রিয় একটি পদ্ধতি। মৌসুমি বৃষ্টি শুরু হলে, বিশেষ করে আষাঢ়ের প্রথম ভাগে জমিতে পানি জমিয়ে রেখে চাষ দিয়ে নরম কাদামাটিতে পরিণত করা হয়। একাধিক দফায় জমি চাষ দেওয়ার পর ছিটিয়ে দেওয়া হয় অঙ্কুরিত ধানের বীজ।

শনিবার সকাল আটটায় সবুজচরের থাক দীর্ঘাপাড় মৌজায় গিয়ে দেখা যায়, একটি টংয়ের পাশে অপেক্ষায় আছেন কয়েকজন চাষি। ট্রাক্টরের জন্য অপেক্ষা তাঁদের। ট্রাক্টর এলে জমিতে দেওয়া হবে শেষ ধাপের চাষ। এরপরই বস্তা বা বালতিভর্তি অঙ্কুরিত ধান নিয়ে জমিতে নামবেন তাঁরা। হাতের মুঠোয় ধান নিয়ে পুরো জমিতে সমান তালে ছিটিয়ে দেবেন।

চাষিরা জানান, বীজধান তিন দিন ধরে কয়েক দফা পানিতে ডুবিয়ে ও শুকিয়ে শিকড় বেরিয়ে আসা নিশ্চিত করা হয়। প্রতিটি ধানের মুখে সাদা শিকড় বেরিয়ে এলে ছিটিয়ে দেওয়া হয় জমিতে। পানির নিচে নরম কাদায় দ্রুত শিকড় ছড়িয়ে পড়লে পানির উপড়ে মাথা তোলে ধানের চারা। এতে চাষির শ্রম ও অর্থ ব্যয় কম হয়। চারা গজিয়ে ধানের গোছা জমিতে বুনতে গেলে সময়, শ্রম আর খরচ বেড়ে যায় কয়েক গুণ।

সাদ্দাম হোসেন (৩২) নামের এক চাষির মতে, ‘গোছা বুনে ধান চাষ করতে গেলে লোক মিলবে না। বিশাল সবুজচরে হাজারো শ্রমিকের দরকার হবে। খরচ বাড়বে, লাভ কমে যাবে।’ এ জন্য বাইন ছিটিয়েই আবাদ করেন তাঁরা।

সবুজচরের কৃষিজমিতে এখন ব্যস্ততা। তবু কাজের ফাঁকে ট্রাক্টরের পাশে একটুখানি জিরিয়ে নিচ্ছেন চাষিরা। গত শনিবার সকালে তোলা
ছবি: প্রথম আলো

কমেছে রোপা আমনের চাষ

সন্দ্বীপের পূর্ব উপকূল ঘেঁষে উত্তর থেকে দক্ষিণে বিস্তৃত দ্বীপটির অভ্যন্তরীণ চরাঞ্চল। বেড়িবাঁধের ভেতরের এসব জমিতে রোপা আমনের চাষ হয় যুগ যুগ ধরে। তবে বর্তমানে এখানেও বাইন ছিটিয়ে চাষের পরিমাণ বাড়ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শ্রম ও ব্যয় কম হওয়ায় পূর্বাংশের এসব জমিতেও বাইন ছিটিয়ে আমন বুনছেন অনেকে। তাঁদের মধ্যে অনেকে আবার গবাদিপশুর খাদ্য হিসেবে কাঁচা খড় পেতেও বাইন ছিটিয়ে চাষ করেন। একাধিকবার ধানের গোছা কেটে গবাদিপশুকে খাওয়ানো হয়। পরে সেসব জমি থেকে ধানও ঘরে তুলতে পারছেন চাষিরা।

চর সন্তোষপুরের তছলিম উদ্দিন (৫০) মহিষকে খাওয়ানোর জন্য এ রকম আমনের চাষ করেন। তিনি বলেন, ‘চাষের কারণে বর্ষাকালে গরু-মহিষ চরানোর জায়গার সংকট দেখা দেয়। খরচ কম হওয়ায় আমরা বাইন ছিটিয়ে দিই, খড় আর ধান দুটিই পাই।’

আছে ঝুঁকিও

স্বল্প শ্রম আর কম খরচে বাইন ছিটিয়ে ধান বুনতে পারলেও চাষিদের কপালে দেখা যায় চিন্তার ভাঁজ। শনিবার সকাল থেকে শেষ বিকেল পর্যন্ত ছিল প্রখর রোদ। চরের খোলা প্রান্তরে কোথায় একটুকরা মেঘের ছায়াও দেখা যায়নি। এ রকম রোদ টানা দু-তিন দিন অব্যাহত থাকলেই শুকিয়ে যাবে ধানবীজ। এতে ভোগান্তির পাশাপাশি বাড়বে খরচও।

মাইন উদ্দিন (৪০) নামের এক চাষি বলেন, ‘খরানে (খরায়) বাইন না ধরলে (চারা না হলে) ছিদ্দতে (ভোগান্তি) পড়তে হবে। রইদের (রোদের) যে অবস্থা, যেন গায়ের চামড়া পুড়ে যাবে। এ অবস্থা কাল-পরশু চললে মার খাব (ক্ষতির মুখে পড়া)।’

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মারুফ ইসলাম জানিয়েছেন, সবুজচরের প্রায় পাঁচ হাজার হেক্টর জমিতে আমনের চাষ হয় বাইন ছিটিয়ে বা ব্রডকাস্ট পদ্ধতিতে। খরার মুখে না পড়লে এ পদ্ধতি ভালো কাজ করে। তিনি বলেন, ‘এখানকার আউশ ধানের চাষিরা জমিতে ক্ষুদ্র গর্ত করে শুকনা ধান মাটিচাপা দেন। সেখানেই অঙ্কুরিত হয় ধান। সন্দ্বীপের বাইরে আর কোথাও এমনটি দেখা যায় না।’

সন্দ্বীপের উত্তর-পশ্চিম উপকূলে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ আর ৩ কিলোমিটার চওড়া সবুজচর। ধানের উৎপাদন, মাছের জোগান আর পশুপালনে সবুজচর এখন উপকূলীয় অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই চরের আয়তন এবং আমনের আবাদ দ্রুত বাড়ছে। চাষিদের প্রত্যাশা—প্রাকৃতিক দুর্যোগ, খরা, ঘূর্ণিঝড় ও উচ্চ জোয়ারের বড় কোনো ধাক্কা না এলে কার্তিকে সোনালি ধানে ভরে যাবে তাঁদের আঙিনা।