ডিসেম্বরে ভূমি মন্ত্রণালয় বাঁওড়গুলোর ইজারা দেওয়ার জন্য দরপত্র আহ্বান করেছে। জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে ইজারা প্রক্রিয়া চলমান।

নিত্য, গোকুল ও সাধনের মতো ঝিনাইদহ ও যশোরের ছয়টি বাঁওড়পাড়ে এ রকম প্রায় ১ হাজার হালদার পরিবার (জেলে সম্প্রদায়) বসবাস করে। এত দিন তাঁরা ওই ছয়টি বাঁওড়ে মাছ ধরে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছিলেন। সম্প্রতি ভূমি মন্ত্রণালয়ের এক সিদ্ধান্তে তাঁরা সবাই কর্ম হারিয়ে পথে বসতে চলেছেন। 

মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ঝিনাইদহের মহেশপুরে কাঠগড়া ও ফতেপুর, কোটচাঁদপুরে বলুহর ও জয়দিয়া, কালীগঞ্জে মর্জাদ এবং যশোরের চৌগাছায় বেড়গোবিন্দপুর—এই ছয়টি বাঁওড় ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীন। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে মৎস্য অধিদপ্তর ভূমি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে এই ছয়টি বাঁওড়ে মৎস্য উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় মাছ চাষ শুরু হয়। ১৯৭৯ সাল থেকে এই প্রকল্প বিল ও বাঁওড়ে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি এবং সংশ্লিষ্ট সুফলভোগীদের (সহস্রাধিক হালদার পরিবার) আর্থসামাজিক উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। পরে দুই দফায় আরও ওই প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়। ১৯৯৮ সাল থেকে অদ্যাবধি বাঁওড় মৎস্য উন্নয়ন প্রকল্প রাজস্ব খাতের মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে আসছে। এই ছয়টি বাঁওড়ে রেণু সরবরাহের জন্য কোটচাঁদপুরে একটি কেন্দ্রীয় হ্যাচারি রয়েছে। যেখানে ২৯টি পুকুর আছে। একজন প্রকল্প পরিচালক এগুলো দেখভাল করেন, কর্মকর্তা-কর্মচারী আছেন ১১০ জন।

চলতি বছরের ১৩ এপ্রিল ভূমি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের চুক্তি শেষ হচ্ছে। মৎস্য অধিদপ্তর এই চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন জানালেও চুক্তি শেষ হওয়ার পূর্ব মুহূর্তে মেয়াদ বৃদ্ধির পরিবর্তে বাঁওড়গুলো ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। গত বছরের ডিসেম্বরে ভূমি মন্ত্রণালয় বাঁওড়গুলোর ইজারা দেওয়ার জন্য দরপত্র আহ্বান করেছে। জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে এগুলোতে ইজারা প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ছয়টি বাঁওড়ে নির্দিষ্ট পরিমাণ মাছ ছাড়া হয়। প্রতি বছর মাছ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা থাকে। বাঁওড়ের কর্মরতরা এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করে অতিরিক্ত মাছ উৎপাদন করে থাকেন। এই মাছ চাষের মাধ্যমে বাঁওড় পাড়ের জেলেদের জীবনমান উন্নত করতে বাঁওড়ে যে মাছ থাকবে, তার ৬০ শতাংশ সরকার, আর ৪০ শতাংশ জেলেরা পেয়ে থাকেন। এ ছাড়া বাঁওড়ের পানিতে যে ছোট ছোট দেশীয় মাছ থাকে, তা সবই জেলেদের প্রাপ্য। তাঁরা এই মাছ বিক্রি করে অর্থ উপার্জন করেন। এভাবে একদিকে সরকার মাছ উৎপাদনের মাধ্যমে চাহিদা পূরণ করছে, অন্যদিকে বাঁওড় পাড়ের জেলেদের জীবনমান উন্নয়ন করে যাচ্ছিল।

ফতেপুর বাঁওড় মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি সুশান্ত কুমার হালদার জানান, বাঁওড়গুলো ঘিরে তাঁরা জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন। ফতেপুর ও কাঠগড়া বাঁওড়ে হালদার সম্প্রদায়ের ১৫০ জন মৎস্যজীবী রয়েছেন। বলুহর ও জয়দিয়া বাঁওড়ে রয়েছেন আরও ৪৭২ জন। মর্জাদ বাঁওড়ে আছেন ১৪৫ জন ও বেড়গোবিন্দপুর বাঁওড়ে ২১০ জন মৎস্যজীবী রয়েছেন। বাঁওড় মৎস্য অধিদপ্তরের প্রকল্পের হাত থেকে চলে গেলে তাঁরা সবাই বেকার হয়ে পড়বেন। আর এই ৯৭৭ জন মৎস্যজীবীর সঙ্গে তাঁদের ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকা আরও কমপক্ষে ৫ হাজার মানুষ পথে বসবেন। পাশাপাশি প্রকল্পের কর্মচারীরাও চাকরি হারাবেন। 

জয়দিয়া বাঁওড়ের মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি নিত্য হালদার বলেন, তাঁরা বাঁওড়ে কোনো প্রকার সার-ওষুধ ছাড়াই মাছ চাষ করে থাকেন। পাশাপাশি ট্যাংরা, পুঁটি, শিং, কই, পাবদা, খলশে, বাটাসহ নানা প্রজাতির দেশীয় মাছ বাঁওড়ে লালন করে বিক্রি করেন। বাঁওড়ের পানিতে থাকা জীববৈচিত্র্য অক্ষুণ্ন রেখে তাঁরা মাছের চাষ করেন। কিন্তু ইজারা দিলে কৃত্রিম চাষ শুরু হবে, হারিয়ে যাবে জীববৈচিত্র্য ও দেশীয় মাছ।

প্রকল্প পরিচালক মো. আলফাজ উদ্দিন শেখ বলেন, মৎস্য বিভাগ চেষ্টা করছে বর্তমান প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি করে চলমান নিয়মে মাছের চাষ করা। কিন্তু ভূমি মন্ত্রণালয় এগুলো ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটা হলে অনেকে পথে বসবেন। মৎস্য বিভাগের অনেকে বেকার হয়ে যাবেন।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসক মনিরা বেগম বলেন, বাঁওড়পাড়ের মানুষগুলোর কথা চিন্তা করে ভূমি মন্ত্রণালয় মৎস্য অধিদপ্তরের এক প্রকল্পের মাধ্যমে মাছ চাষের জন্য দিয়েছিল। কিন্তু তাঁরা সাফল্য দেখাতে পারেননি। যে কারণে মন্ত্রণালয় ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাঁরা স্থানীয়ভাবে দাপ্তরিক কাজ করছেন মাত্র। তিনি আরও বলেন, বাঁওড়পাড়ের হালদারদের (জেলেদের) বিষয়টি তিনি গুরুত্ব সহকারে দেখছেন। সরকারের উচ্চপর্যায়ে এ বিষয়ে তিনি কথা বলবেন বলে জানান।