ময়মনসিংহে হাম-রুবেলা টিকাদান
শিশুদের নিয়ে টিকাকেন্দ্রে অভিভাবকদের ভিড়, উদ্বোধন করতে এমপি এলেন ১ ঘণ্টা পর
হামে আক্রান্ত হয়ে শিশুমৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়েছে গ্রামেও। চরম উৎকণ্ঠা নিয়ে সন্তান কোলে টিকাকেন্দ্রে ছুটছেন অভিভাবকেরা। ‘মরণব্যাধি’ রূপ নেওয়া হাম যেন সন্তানকে স্পর্শ করতে না পারে—এই আশায় তাঁরা টিকা দিতে আসছেন। হাম সংক্রমণে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত ময়মনসিংহ সদর উপজেলার চুরখাই ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসা টিকাদান কেন্দ্রে আজ সকাল পৌনে ৯টা থেকে পৌনে ১১টা পর্যন্ত অবস্থান করে এমন চিত্র দেখা যায়।
দেশের ১৮টি জেলার ৩০টি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে আজ রোববার ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের হাম-রুবেলা টিকা প্রদান শুরু হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় থাকা ময়মনসিংহ সদর, ত্রিশাল ও ফুলপুর উপজেলায় এই টিকাদান কার্যক্রম আজ সকাল থেকে শুরু হয়। ময়মনসিংহ সদরের চুরখাই ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসায় হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচির উদ্বোধন করেন স্থানীয় সংসদ সদস্য আবু ওয়াহাব আকন্দ ওয়াহিদ।
সকাল ৯টায় টিকাদান কার্যক্রম উদ্বোধনের কথা থাকলেও সংসদ সদস্য আসেন সকাল ১০টা ১০ মিনিটে। এ সময়ে শিশুদের নিয়ে তীব্র গরমে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েন টিকা দিতে আসা মায়েরা। বিলম্ব হওয়ায় অভিভাবকদের কাছে ক্ষমা চেয়ে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দিয়ে কর্মসূচির উদ্বোধন করেন সংসদ সদস্য।
সংসদ সদস্য আবু ওয়াহাব আকন্দ ওয়াহিদ বলেন, ‘আমার আসতে এখানে দেরি হয়েছে। মা-বোনেরা বাচ্চাদের নিয়ে এসেছেন, আপনাদের কষ্ট হচ্ছে এ জন্য আপনাদের কাছে আমি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। সাংবাদিকসহ সবার কাছে আমার সবিনয় আবেদন বিষয়টি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।’
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় ও ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, এ পর্যন্ত পরীক্ষায় ৫৯ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। ফেব্রুয়ারি থেকে হামের কিছু রোগী পাওয়া গেলেও মার্চের মাঝামাঝি সময় থেকে রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। এ পরিস্থিতিতে সদর, ফুলপুর ও ত্রিশাল উপজেলায় ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী ১ লাখ ৬০ হাজার ৪১৩ জন শিশুকে প্রাথমিক পর্যায়ে টিকা দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
দুই বছর বয়সী আদিয়াকে কোলে নিয়ে টিকা দিতে আসেন মা নিলুফা আক্তার। তিনি বলেন, ‘শুনেছি বাচ্চারা হামে আক্রান্ত হচ্ছে, মারা যাচ্ছে। এই কারণে টিকার খবর শুনে টিকা দিতে এসেছি। মুঠোফোনে ও টিভিতে দেখেছি হামে বাচ্চারা মারা যাচ্ছে। আমার বাচ্চাকে আগে টিকা দিলেও সরকার যেহেতু নতুন করে টিকা দিচ্ছে, তাই টিকা দিতে নিয়ে এসেছি, যেন এই রোগটা আর না হয়।’
টিকাদান কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল শাখার উপপরিচালক সৈয়দ আবু আহাম্মেদ শাফী বলেন, ‘দেশে সম্প্রতি হাম ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলেও সমভাবে সারা দেশে ছড়ায়নি। আমাদের বিভিন্ন উপজেলার ৩০টি এলাকাকে আমরা রেড জোন হিসেবে চিহ্নিত করেছি। এই টিকা সারা দেশেই দেওয়া হবে। রেড জোন হিসেবে আজ থেকে প্রায়োরিটি বেজড দেওয়া হচ্ছে। ময়মনসিংহের তিনটি উপজেলাকে আমরা রেড জোন হিসেবে নিয়েছি। তিনটি উপজেলায় প্রায় ১ লাখ ৬৪ হাজার শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। ১ লাখ ৭৫ হাজার টিকা সরবরাহ করা হয়েছে। টিকার কোনো ঘাটতি নেই।’
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জান্নাতুল ফেরদৌস, জেলা সিভিল সার্জন (ভারপ্রাপ্ত) ফয়সল আহমেদ, ইউনিসেফের আঞ্চলিক প্রধান ডা. আলমগীর হোসেন, সার্ভেইলেন্স অফিসার তারিক তপু প্রমুখ।
হামের লক্ষণ নিয়ে ভর্তি আরও ১৯ শিশু
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে গত ২৪ ঘণ্টায় হামের লক্ষণ নিয়ে নতুন করে আরও ১৯ শিশু ভর্তি হয়েছে। বর্তমানে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রয়েছে ৬৩টি শিশু।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গতকাল শনিবার সকাল ৯টা থেকে আজ রোববার সকাল ৯টা পর্যন্ত সময়ের মধ্যে উল্লিখিত লক্ষণ নিয়ে নতুন করে ১৯ শিশু ভর্তি হয়েছে। ১৭ মার্চ থেকে আজ সকাল পর্যন্ত মোট ২২৪টি শিশু হামের লক্ষণ নিয়ে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে ১৫৫টি শিশু হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছে এবং ৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছে ৬৩টি শিশু। গত ২৪ ঘণ্টায় সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছে আরও ২৪টি শিশু।
সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে জানা গেছে, চিকিৎসাধীন শিশুদের নমুনা পরীক্ষায় আজ সকাল পর্যন্ত ৫৯ জন শিশুর শরীরে হাম পজিটিভ শনাক্ত হয়েছে।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান বলেছেন, ‘গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১৯ শিশু ভর্তি হয়েছে। এ সময়ে কোনো মৃত্যু হয়নি, হামের লক্ষণ নিয়ে রোগী আসছে। আমরা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছি।’