খতনা করাতে হাসিমুখে হাসপাতালে ঢুকেছিল শিশুটি, ফিরেছে লাশ হয়ে
চট্টগ্রাম নগরে খতনা করাতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছে সাত বছরের শিশু মোহাম্মদ মোস্তফা। গত শনিবার সকাল সাড়ে ১০টায় একটি বেসরকারি হাসপাতালে সার্জারির জন্য তাকে ভর্তি করা হয়। সঙ্গে ছিলেন মা–বাবা। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে হাসিমুখে ছবিও তুলেছিল শিশুটি। সেই ছবিই এখন পরিবারের কাছে আজীবনের শেষ স্মৃতি। আজ মঙ্গলবার বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে।
মোস্তফা বাড়ি ফিরেছে ঠিকই, তবে জীবিত নয়, লাশ হয়ে। মোস্তফার বাবা আবু মুসা প্রথম আলোকে বলেন, ‘শনিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে শীতের মধ্যে ছেলেকে নিয়ে হাসপাতালে যাই। বাচ্চাকে হালকা নাশতা করিয়েছিলাম। আমার স্ত্রীও সঙ্গে ছিলেন। হাসপাতালে পৌঁছে চিকিৎসকের কাছে ফাইল জমা দিই। এরপর হাসপাতালের লোকজন ছেলের হাতে স্যালাইন লাগিয়ে দেয়। এভাবেই কয়েক ঘণ্টা কেটে যায়।’ তিনি বলেন, ‘বিছানায় শুয়ে আমার ছেলেটা হাসিখুশিই ছিল। একসময় বলল, “আব্বু, আমার খুব খিদা লেগেছে।” কিন্তু চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তাকে কিছু খাওয়াইনি।’
বেলা সাড়ে তিনটার দিকে শিশু মোস্তফাকে সার্জারি কক্ষে নেওয়া হয়। এরপর কী ঘটেছিল, তা এখনো অস্পষ্ট। আবু মুসা বলেন, ‘সন্ধ্যা ছয়টার দিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও চিকিৎসকেরা তাঁকে জানান, শিশুটিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিতে হবে। এরপর তাঁরা নিজেরাই দ্রুত একটি অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করেন। আমি তখন কোনো প্রশ্ন করার মতো অবস্থায় ছিলাম না।’
অ্যাম্বুলেন্সে ছেলের শরীরে হাত রেখে আবু মুসা বুঝতে পারেন পরিস্থিতি ভয়াবহ। তাঁর ভাষায়, ‘আমার ছেলের শরীর বরফের মতো ঠান্ডা ছিল। পা দুটো বেঁকে গিয়েছিল। কোনো নড়াচড়া ছিল না।’
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর মোস্তফাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি করা হয়। রাত ১০টা ১০ মিনিটে চিকিৎসকেরা জানান, শিশুটির মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুসনদে কারণ হিসেবে লেখা হয়েছে, হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়া (হার্ট অ্যাটাক)।
তবে আবু মুসার অভিযোগ, ‘অ্যানেসথেসিয়ার অপব্যবহারের কারণেই আমার ছেলের মৃত্যু হয়েছে।’ আবু মুসা জানান, ছেলেকে ভর্তি করিয়েছিলেন চট্টগ্রাম নগরের বহদ্দারহাট ১ কিলোমিটার এলাকার সেইফ হেলথ কেয়ার হাসপাতালে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের শিশু সার্জারি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ জুনাইদ চৌধুরীর তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা চলছিল।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ফোন রিসিভ করেনি।
তবে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন বলেন, সাধারণত খতনার সময় স্পাইনাল অ্যানেসথেসিয়া দেওয়া হয়। এতে খুব কম ক্ষেত্রেই বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। তবে এই শিশুর ক্ষেত্রে ঠিক কী ঘটেছে, তা বিস্তারিত না দেখে বলা সম্ভব নয়।
এর আগে গত বছরের ১৬ ডিসেম্বর মোস্তফাকে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের কাছে নেওয়া হয়েছিল। ব্যবস্থাপত্রে উল্লেখ ছিল, তার প্রস্রাবের রাস্তায় জন্মগত ত্রুটি রয়েছে, যা ‘গ্ল্যানুলার হাইপোস্প্যাডিয়াস’ হিসেবে চিহ্নিত। ওই ব্যবস্থাপত্রে খতনা ও ছোট ধরনের একটি সার্জারির কথা বলা হয়। সেখানে জেনারেল অ্যানেসথেসিয়া ব্যবহারের কথাও উল্লেখ ছিল।
মোস্তফার বাড়ি চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার পূর্ব গোমদণ্ডি গ্রামে। সে ছিল পরিবারের বড় সন্তান। তার আরও একটি দুই বছর বয়সী ভাই রয়েছে। বাবা আবু মুসা স্থানীয় একটি ডিশ কেব্ল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন।