আমাদের বিচারব্যবস্থা এখনো পুরোপুরি প্রধানমন্ত্রীনির্ভর: রফিউর রাব্বি

ত্বকী হত্যার ১৫৯ মাস উপলক্ষে মোমশিখা প্রজ্বালন কর্মসূচি পালন করে নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোট। গতকাল সন্ধ্যায় নগরের আলী আহাম্মদ চুনকা নগর মিলনায়তন প্রাঙ্গণেছবি: প্রথম আলো

স্বাধীনতার এত বছরেও দেশের বিচারব্যবস্থা স্বাধীন হতে পারেনি; বরং পুরোপুরি প্রধানমন্ত্রীনির্ভর বলে মন্তব্য করেছেন সন্ত্রাসীদের হাতে নিহত নারায়ণগঞ্জের মেধাবী শিক্ষার্থী তানভীর মুহাম্মদ ত্বকীর বাবা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বি। ত্বকী হত্যা ও বিচারহীনতার ১৫৯ মাস উপলক্ষে আয়োজিত মোমশিখা প্রজ্বালন কর্মসূচিতে তিনি এ মন্তব্য করেন।

গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় নগরের আলী আহাম্মদ চুনকা নগর মিলনায়তন প্রাঙ্গণে নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোট আলোক প্রজ্বালন কর্মসূচির আয়োজন করে। এ সময় দ্রুত ত্বকী হত্যা মামলার অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করতে তদন্তকারী সংস্থার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন রফিউর রাব্বি। তিনি বলেন, অভিযোগপত্রে হত্যার নির্দেশদাতা শামীম ওসমান, তাঁর ছেলে অয়ন ওসমান, ভাতিজা আজমেরী ওসমান ও ক্যাডার শাহ নিজামসহ হত্যায় জড়িত সবার নাম থাকতে হবে।

সংগঠনের সভাপতি মনি সুপান্থর সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক দীনা তাজরিনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন শিশু সংগঠক রথীন চক্রবর্তী, নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের উপদেষ্টা প্রদীপ ঘোষ (বাবু), নারায়ণগঞ্জ নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল হক (দীপু), সিপিবির জেলা সভাপতি শিবনাথ চক্রবর্তী, বাসদ জেলা সদস্য সচিদ আবুনাইম খান (বিপ্লব), গণসংহতি আন্দোলন জেলার নির্বাহী সমন্বয়ক অঞ্জন দাস, ওয়ার্কার্স পার্টির জেলা সভাপতি হাফিজুর রহমান, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির জেলা সভাপতি মাহমুদ হোসেন, সামাজিক সংগঠন সমমনার সাবেক সভাপতি দুলাল সাহা ও কবি কাজল (কানন)।

রফিউর রাব্বি বলেন, দেশের বিচারব্যবস্থা এখনো পুরোপুরি প্রধানমন্ত্রীনির্ভর। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চেয়েছেন, তাই ত্বকী হত্যার বিচার সাড়ে ১১ বছর বন্ধ ছিল, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চেয়েছেন বলে পল্লবীর শিশু ধর্ষণের পর হত্যার বিচার ১৯ দিনে সম্পন্ন হয়েছে। এটি কোনো স্বাধীন বিচারব্যবস্থা নয়, সরকারনিয়ন্ত্রিত বিচারব্যবস্থা।

ত্বকীর বাবা বলেন, ‘স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও আমরা দেশে একটি বিচারব্যবস্থা তৈরি করতে পারি নাই। এত বছরে দেশে কোনো সরকারই তা চায় নাই। সরকারগুলো চেয়েছে বিচারব্যবস্থাকে কেবল ক্ষমতায় টিকে থাকার হাতিয়ার বানাতে। নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে আলাদা করা না গেলে এই বিচারব্যবস্থায় জনগণের লাভ হবে না।’

রফিউর রাব্বি জানান, এ পর্যন্ত ১০৪ বার ধার্য তারিখ অতিবাহিত হলেও ত্বকী হত্যা মামলার অভিযোগপত্র আদালতে জমা পড়েনি। শেখ হাসিনার শাসনামলে ত্বকীর ঘাতকেরা বীরদর্পে সারা শহর দাপিয়ে বেরিয়েছে। এখন ঘাতকেরা পালিয়ে গেলেও সে ঘাতকের ছবি নিয়ে দুর্বৃত্তরা এখনো মিছিল করে। প্রশাসন তখনো ঘাতকদের বিরুদ্ধে ছিল না, এখনো প্রশাসন তাঁদের বিষয়ে নীরব। দুর্বৃত্ত লালনের পথ থেকে কোনো সরকারই বেরিয়ে আসতে পারছে না। ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পরিবর্তন না হলে কোনো পরিবর্তনই জনগণের কল্যাণে আসবে না, টেকসইও হবে না। তিনি বলেন, অভিযোগপত্রে হত্যার নির্দেশদাতা শামীম ওসমান, তাঁর ছেলে অয়ন ওসমান, ভাতিজা আজমেরী ওসমান এবং ক্যাডার শাহ নিজামসহ হত্যায় জড়িত সবাইকে নাম থাকতে হবে। দ্রুত অভিযোগপত্র জমা দিতে হবে।

সমাবেশে বক্তারা দ্রুত ত্বকী হত্যার বিচার দাবি করেন। পাশাপাশি ১৪ বছর আগে সংঘটিত সাগর-রুনি হত্যা ও ১০ বছর আগে সংঘটিত তনু হত্যাসহ নারায়ণগঞ্জে ওসমান পরিবার দ্বারা সব হত্যার বিচার দাবি করা হয়।

২০১৩ সালের ৬ মার্চ নগরের শায়েস্তা খাঁ রোডের বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী। দুই দিন পর ৮ মার্চ শীতলক্ষ্যা নদীর কুমুদিনী খাল থেকে ত্বকীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ওই বছরের ১২ নভেম্বর আজমেরী ওসমানের সহযোগী সুলতান শওকত (ভ্রমর) এবং ২৪ নভেম্বর ২০২৪ কাজল হাওলাদার আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে জানান, আজমেরী ওসমানের নেতৃত্বে ত্বকীকে অপহরণের পর হত্যা করা হয়।

২০১৪ সালের ৫ মার্চ তদন্তকারী সংস্থা র‌্যাব সংবাদ সম্মেলন করে জানায়, নারায়ণগঞ্জের ওসমান পরিবারের নির্দেশে তাদেরই টর্চার সেলে ১১ জন মিলে ত্বকীকে হত্যা করেছে। অচিরেই তারা অভিযোগপত্র আদালতে পেশ করবে; কিন্তু সে অভিযোগপত্র আজও পেশ করা হয়নি।

ত্বকী হত্যার পর থেকে বিচার শুরু ও চিহ্নিত আসামিদের গ্রেপ্তারের দাবিতে প্রতি মাসের ৮ তারিখ আলোক প্রজ্বালনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছে নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোট।