৩ প্রকল্পে ভবদহের জলাবদ্ধতা নিরসনের আশা পাউবোর, সুফল নিয়ে সংশয় ভুক্তভোগীদের
যশোরের ভবদহ অঞ্চলের দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা নিরসনে তিনটি প্রকল্প নিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। ইতিমধ্যে প্রায় ২৬৮ কোটি টাকার দুটি প্রকল্পের নদী ও খাল পুনঃখননের কাজ শুরু হয়েছে। এ ছাড়া নদী দিয়ে জোয়ারের সঙ্গে সাগর থেকে আসা পলি ব্যবস্থাপনার জন্য আরও ২৮০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। পাউবো কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে ভবদহ এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসন হবে।
তবে ভবদহের জলাবদ্ধতায় ভুক্তভোগী মানুষ ও আন্দোলনরত সংগঠনের নেতারা বলছেন, ভবদহ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা নিরসন করতে হলে নদী খননের সঙ্গে সঙ্গে নদীগুলো দিয়ে পরিকল্পিত উপায়ে জোয়ার–ভাটা টিআরএম (টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট বা জোয়ারাধার) চালু করতে হবে। এ ছাড়া স্থায়ী সমাধানের জন্য চুয়াডাঙ্গার দর্শনায় নদীর উজানে মাথাভাঙ্গা নদীর সঙ্গে ভৈরব নদের পুনঃসংযোগ দিতে হবে। এতে নদী দিয়ে আসা পলি ব্যবস্থাপনা হবে। এলাকার নদীগুলো সচল হলে জলাবদ্ধতার নিরসন হবে।
ভবদহে তিন নতুন প্রকল্প
পাউবো যশোর কার্যালয় সূত্র জানায়, কপোতাক্ষ নদের জলাবদ্ধতা দূরীকরণ প্রকল্পের (২য় পর্যায়) আওতায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ছয়টি নদী পুনঃখননের কাজ করছে। এই প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৩৯ কোটি ৯৮ লাখ ১৯ হাজার টাকা।
প্রকল্পের আওতায় অভয়নগরের ভবদহ ২১-ভেন্ট স্লুইসগেট থেকে খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার কাশিমপুর পর্যন্ত হরি নদীর ১৫ কিলোমিটার, উপজেলার কাশিমপুর থেকে কুলবাড়িয়া পর্যন্ত তেলিগাতী নদী ৫ কিলোমিটার, মনিরামপুর উপজেলার বাকোশপোল থেকে কেশবপুর উপজেলার বরেঙ্গা পর্যন্ত হরিহর নদ ৩৫ কিলোমিটার, কেশবপুর উপজেলার বরেঙ্গা থেকে কাশিমপুর পর্যন্ত আপার ভদ্রা নদী ১৮ দশমিক ৫০ কিলোমিটার, অভয়নগর উপজেলার গোঘাটা থেকে ভবদহ ২১-ভেন্ট স্লুইসগেট পর্যন্ত টেকা নদী ৭ কিলোমিটার এবং মনিরামপুর উপজেলার লেহালপুর বাজার এলাকায় ১ কিলোমিটার শ্রী নদী পুনঃখনন করা হচ্ছে।
টেকা নদী প্রায় ৯৮ থেকে ১১২ ফুট, হরি নদী ১০৫ থেকে ১১৮ ফুট, তেলিগাতী নদী ১৩৮ ফুট, আপার ভদ্রা নদী ৬৬ থেকে ৭২ ফুট, শ্রী নদী ৫৬ থেকে ৫৯ ফুট এবং হরিহর নদ ৫৬ থেকে ৬২ ফুট প্রস্থে খনন করা হচ্ছে। তবে নদীর গভীরতা কত ফুট হবে, তা জানাতে পারেনি পাউবো।
একই প্রকল্পের আওতায় ৩৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নদীর সঙ্গে যুক্ত ২৪টি খালের ৭৮ দশমিক ২৩০ কিলোমিটার পুনঃখনন করা হচ্ছে। আগামী জুন মাসে প্রকল্পের কাজ শেষ হবে।
বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ক্লাইমেট স্মার্ট অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট প্রকল্পের আওতায় ৪৯ কোটি ৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ২ দশমিক ৭০ কিলোমিটার দীর্ঘ অভয়নগর উপজেলার আমডাঙ্গা খাল সংস্কার করা হবে। এর মধ্যে বিল ঝিকরা থেকে ৬-ভেন্ট স্লুইসগেট পর্যন্ত ২ দশমিক ২৫ কিলোমিটার খাল প্রশস্ত ও গভীর করে পুনঃখনন এবং স্লুইসগেট থেকে ভৈরব নদে পতিত মুখ পর্যন্ত ৪০০ মিটার খালের আরসিসি ইউড্রেন নির্মাণ করা হবে। ২০২৭ সালের জুন মাসে প্রকল্পের কাজ শেষ হবে।
একই প্রকল্পের আওতায় ৪৫ কোটি ৪১ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘ভবদহ ও তৎসংলগ্ন বিল এলাকার জলাবদ্ধতা দ্রুত নিরসনের মাধ্যমে সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ প্রকল্প’ শুরু হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় সেচ পাম্প স্থাপনের কাজ চলছে। ২০২৭ সালের জুন মাসে প্রকল্পের কাজ শেষ হবে।
পাউবো সূত্র জানায়, পলি ব্যবস্থাপনার জন্য ২৮০ কোটি টাকা ব্যয়ে আরও একটি প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) মন্ত্রণালয়ে রয়েছে। মন্ত্রণালয়ে পাসের পর তা পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হবে। পরিকল্পনা কমিশনে ওই ডিপিপির বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) ডিপিপি অনুমোদনের পর এর বাস্তবায়ন শুরু হবে।
সমস্যা যেভাবে শুরু
যশোরের অভয়নগর, মনিরামপুর ও কেশবপুর উপজেলা এবং খুলনার ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলার অংশবিশেষ ভবদহ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। মুক্তেশ্বরী, টেকা, শ্রী ও হরি নদ-নদীর জোয়ার–ভাটার সঙ্গে এসব বিলের পানি ওঠানামা করে। তবে পলি পড়ে নদীগুলো নাব্যতা হারানোয় পানি নিষ্কাশনে সমস্যা হচ্ছে।
গত শতাব্দীর ষাটের দশকে বাঁধ নির্মাণ করে জোয়ারের লোনাপানি বিলে ঢোকা বন্ধ করা হয়। বিলের ভেতরে খালের মুখে স্লুইসগেট নির্মাণ করে ভেতরের পানি নিষ্কাশন করা হয়। একে পোল্ডার বলে। ১৯৬২ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত ১ হাজার ৫০০ কিলোমিটার বাঁধ, ২৮২টি স্লুইসগেট ও ৩৭টি পোল্ডার বানানো হয়। এতে বিলে পলি আসা কমে যায় এবং থেমে যায় প্রাকৃতিক ভূমি গঠনের প্রক্রিয়া। নাব্যতা হারায় মুক্তেশ্বরী, টেকা, শ্রী ও হরি নদী। বৃষ্টির পানি আটকা পড়ে সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। ১৯৮৪ সাল থেকে এই জলাবদ্ধতা প্রকট আকার ধারণ করে। পানি সরানোর দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন ভুক্তভোগী মানুষেরা।
সর্বশেষ গত বছরেও জুলাই ও আগস্টের অতিবর্ষণে অভয়নগর, মনিরামপুর ও কেশবপুর উপজেলার দেড় শতাধিক গ্রামের বেশির ভাগ ঘরবাড়ি, ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাস্তাঘাট ও মাছের ঘের পানিতে প্লাবিত হয়। পান্দিবন্দী হয়ে পড়েন দুই লাখের বেশি মানুষ। এরপর ভবদহে শ্রী ও হরি নদীতে মাটি কাটার যন্ত্র দিয়ে পাইলট (পরীক্ষামূলক) চ্যানেল কাটার কাজ শুরু করে পাউবো। একপর্যায়ে বাড়িঘর থেকে পানি নেমে যায়।
জোয়ারাধার কী
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষকদের শত বছরের পুরোনো নিজস্ব উদ্ভাবিত পদ্ধতির নাম জোয়ারাধার বা টিআরএম (টাইডল রিভার ম্যানেজমেন্ট। মূল নদীসংলগ্ন যেকোনো একটি নির্বাচিত বিলের তিন দিকে বাঁধ দিয়ে অবশিষ্ট দিকের বেড়িবাঁধের একটি অংশ উন্মুক্ত করে বিলে জোয়ার–ভাটার পানি ঢোকানো হতো। কৃষকেরা আষাঢ়ী পূর্ণিমায় আট মাসের জন্য নদ–নদীর মুখে অস্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করতেন, যাতে জোয়ারের লোনাপানি জমিতে ঢুকতে না পারে। আবার মাঘী পূর্ণিমায় বাঁধ সরিয়ে ফেলতেন। এটাই ‘অষ্টমাসী বাঁধ’। মাঝের চার মাসে সাগর থেকে জোয়ারের সঙ্গে আসা পলি পর্যায়ক্রমে এলাকার একটি করে বিলে ফেলে বিল উঁচু করা হতো। আর ভাটার সময় স্বচ্ছ পানি সাগরে ফিরে যাওয়ার সময় স্রোতের টানে নদী নাব্য থাকত। জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হতো না।
টিআরএম ছাড়া নদী কাটা ‘বৃথা হবে’
টেকা নদীর পারে বাড়ি অভয়নগর উপজেলার বারান্দী গ্রামের মৎস্যজীবী খোকন বিশ্বাসের (৫৮)। তিনি বলেন, ‘৪০ বছর ধরে নদীতে মাছ ধরেছি। চার বছর নদীতে কোনো মাছ নেই। আগে টেকা নদীর প্রস্থ ৫০০ ফুটের বেশি ছিল। কিন্তু চ্যানেল (পানি নিষ্কাশনের সাময়িক পথ) কাটায় নদী এখন ৩০ থেকে ৩৫ ফুট হয়ে গেছে। নদী কাটার (খনন) কাজ চলছে; কিন্তু নদী কতটা চওড়া হবে, কত গভীর হবে, তা জানার কোনো উপায় নেই। নদীর কাটার সাথে টিআরএম না হলে পলিতে নদী বুজে যেতে এক বছরও লাগবে না।’
অভয়নগর উপজেলার চোমরডাঙা গ্রামের কৃষক বাসুদেব মণ্ডলও (৪২) মনে করেন, ‘যেভাবে নদী কাটার কথা শুনছি, তাতে নদী কাটার কোনো সুফল পাওয়া যাবে না।’
মনিরামপুর উপজেলার মনোহরপুর গ্রামের শেখর বিশ্বাস (৫৫) বলেন, ‘নদী কাটার কাজ চললেও কোথাও কোনো সাইনবোর্ড নেই। কীভাবে নদী কাটা হচ্ছে, তার কোনো তথ্য জানতে পারছি না। নদী কেটে ফেলে রাখলে দুই পূর্ণিমার জোয়ারের পলিতে নদী ভরাট হয়ে যাবে। এখনই টিআরএম করতে পারলে নদী সচল হতো; কিন্তু তখন টিআরএম করে কোনো কাজ হবে না। নদী কাটা বৃথা হবে।’
কপোতাক্ষ নদের জলাবদ্ধতা দূরীকরণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক এবং পানি উন্নয়ন বোর্ড যশোর পানি উন্নয়ন সার্কেল, খুলনার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বি এম আবদুল মোমিন মুঠোফোনে বলেন, ‘আমাদের কাজ হচ্ছে নদী কাটার পর সেনাবাহিনীর কাছ থেকে নকশা অনুসারে কাজ বুঝে নেওয়া। নদীর সীমানা নির্ধারণ করেছে সেনাবাহিনী। সেই অনুসারে ফ্লো লাইন ধরে নদী কাটা হচ্ছে। তবে সিএস ম্যাপ অনুসারে নদীর সীমানা নির্ধারণ করা হয়েছে কি না, জানি না।’
বি এম আবদুল মোমিন আরও বলেন, ‘নদীর গভীরতা একেক নদীতে একেক রকম। কোন নদী কত গভীরতায় কাটা হচ্ছে, ঠিক মনে করতে পারছি না। কাজের তথ্যের সাইনবোর্ড এখনো দেওয়া হয়নি। সাইনবোর্ড দিলেও মানুষ বুঝবে না। সেনাবাহিনীর সঙ্গে সাইনবোর্ড দেওয়ার ব্যাপারে কথা বলব।’
ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির প্রধান উপদেষ্টা ইকবাল কবির জাহিদ বলেন, ‘আমাদের দাবি ছিল, স্বচ্ছতার সঙ্গে নদী কাটতে হবে। নদী কাটার সঙ্গে যুগপৎ টিআরএম চালু করতে হবে। তা না হলে খুব দ্রুত পলিতে নদী ভরাট হয়ে যাবে। নদী কাটার পুরো টাকা অপচয় হবে। আর স্থায়ী সমাধানের জন্য চুয়াডাঙ্গার দর্শনায় নদীর উজানে মাথাভাঙ্গা নদীর সঙ্গে ভৈরব নদের পুনঃসংযোগ দিতে হবে। এ ছাড়া আমডাঙ্গা খাল সংস্কার করতে হবে। কিন্তু নদী কাটার কর্মকাণ্ড জনসমক্ষে প্রচার করা হচ্ছে না। এতে কাজের স্বচ্ছতা নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি ও শঙ্কা তৈরি হচ্ছে।’
পানি উন্নয়ন বোর্ড, যশোরের কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জী বলেন, ছয়টি নদীর ৮১ দশমিক ৫ কিলোমিটার পুনঃখননের কাজ চলছে। ২৪টি খালের ৭৮ দশমিক ২৩০ কিলোমিটার খাল পুনঃখননের কাজ শুরু হতে যাচ্ছে। আমডাঙ্গা খালের জমি অধিগ্রহণের কাজ বাস্তবায়নের পর্যায়ে আছে। জমি অধিগ্রহণের পর খালের সংস্কারকাজ শুরু হবে। আপৎকালীন দ্রুত পানি বের করে দেওয়ার জন্য ৩৫ কিউসেক ক্ষমতার আটটি পাম্প স্থাপনের কাজ চলছে।
পলাশ কুমার ব্যানার্জী বলেন, পলি ব্যবস্থাপনার জন্য ২৮০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি ডিপিপি মন্ত্রণালয়ে পাসের অপেক্ষায় রয়েছে। একনেকে অনুমোদনের পর প্রকল্পটি বাস্তবায়ন শুরু হবে। প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে ভবদহের জলাবদ্ধতা আর থাকবে না।