অনেক জল্পনাকল্পনা শেষে ঝিনাইদহের চারটি সংসদীয় আসনে বিএনপির মনোনয়ন ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু ঝিনাইদহ-৪ আসনে পাশের আসনের বাসিন্দা গণ অধিকার পরিষদের সদ্য সাবেক নেতা রাশেদ খাঁনকে মনোনয়ন দেওয়ায় স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক সাইফুল ইসলাম (ফিরোজ) স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন।
অন্যদিকে আগেভাগে প্রার্থী দিয়েছে জামায়াত। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ প্রতিটি আসনে প্রার্থী ঘোষণা করলেও ঝিনাইদহ-১ (শৈলকুপা) আসনে তাদের প্রার্থী নূর আলম বিশ্বাস যাচাই-বাছাইয়ে বাদ পড়েছেন। গণ অধিকার পরিষদ ঝিনাইদহ-৩ আসনে প্রার্থী দিয়েছে। এ ছাড়া আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি, বাম জোটের পক্ষ থেকে দু-একটি আসনে প্রার্থী ঘোষণা করা হলেও তৎপরতা কম। তিনটি আসনে মনোনয়ন দিলেও জাতীয় পার্টির (জাপা) তৎপরতা নেই।
ঝিনাইদহ চারটি আসনে মোট ২৭ জন মনোনয়নপত্র জমা দেন। এর মধ্যে ঝিনাইদহ-১ আসনে সাতজন, ঝিনাইদহ-২ (সদর ও হরিণাকুণ্ডু) আসনে ছয়জন, ঝিনাইদহ-৩ (কোটচাঁদপুর ও মহেশপুর) আসনে পাঁচজন ও ঝিনাইদহ-৪ (সদরের আংশিক ও কালীগঞ্জ) আসনে ৯ জন। ঝিনাইদহ-১ আসনে ইসলামী আন্দোলনের একজন ও ঝিনাইদহ-৪ আসনে তিনজন স্বতন্ত্র প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল হয়েছে। চারটি আসনে এখন প্রার্থী থাকল ২৩ জন।
ঝিনাইদহ-১ (শৈলকুপা)
১৯৯১ সাল থেকে টানা ১০ বছর আসনটি বিএনপির দখলে ছিল। এরপর আর জিততে পারেনি দলটি। এবার মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামানকে। এ ছাড়া আগে থেকে গণসংযোগ করছিলেন খুলনা বিভাগীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক জয়ন্ত কুমার কুণ্ডু। আসাদুজ্জামান মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।
শৈলকুপা উপজেলা বিএনপির সভাপতি হুমায়ন কবির ফিরোজ বলেন, আসাদুজ্জামান দলের খারাপ সময়ে মানবাধিকারবিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। দল তাঁর কাজের মূল্যায়ন করে মনোনয়ন দিয়েছে। এলাকার মানুষ তাঁর সঙ্গে আছেন। মো. আসাদুজ্জামান বলেন, তিনি দেশের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তার পদ ছেড়ে এলাকার মানুষের সঙ্গে থাকা ও এলাকার উন্নয়নে কাজ করার ইচ্ছায় নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। শৈলকুপা বিএনপি আজ একত্র, কোনো ভেদাভেদ নেই।
শৈলকুপা উপজেলার আমির মতিউর রহমানকে প্রার্থী করেছে জামায়াত। কয়েক দিন আগে থেকে নেতা-কর্মীদের নিয়ে তিনি বাড়িতে বাড়িতে গণসংযোগ করছেন। মতিউর রহমান বলেন, দলের পক্ষ থেকে নির্বাচনী কার্যক্রম চলছে। তিনি নিজেও ভোটারদের কাছে যাচ্ছেন।
এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলনের জেলা শাখার উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য নুর আলম বিশ্বাস, এনসিপির জাতীয় আইনজীবী জোটের কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক ও শৈলকুপার প্রধান সমন্বয়ক লাবাবুল বাসার, এবি পার্টির জেলার আহ্বায়ক মতিয়ার রহমান ও বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টির সাহিদুল এনাম মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। ঋণখেলাপির অভিযোগে নুর আলম বিশ্বাসের মনোনয়নপত্র বাছাইয়ে বাতিল হয়েছে।
ঝিনাইদহ-২ (সদর ও হরিণাকুণ্ডু)
১৯৯১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত এখানে এমপি ছিলেন জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি প্রয়াত মশিউর রহমান। পরে আসনটি আওয়ামী লীগের দখলে চলে যায়। আসনটিতে এবার প্রার্থী হয়েছেন জেলা বিএনপির সভাপতি এম এ মজিদ। মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন প্রয়াত মশিউর রহমানের বড় ছেলে ইব্রাহিম রহমান। এই আসনে ৫ আগস্টের পর গণ অধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খাঁনকে রাজনৈতিক কার্যক্রমে সহযোগিতার নির্দেশ দিয়ে স্থানীয় বিএনপিকে চিঠি দেয় কেন্দ্র। এরপর রাশেদ খাঁন এলাকায় সভা-সমাবেশও করছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রাশেদ খাঁন বিএনপিতে যোগদানের পর তাঁকে দেওয়া হয়েছে পাশের ঝিনাইদহ-৪ আসন।
জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. জাহিদুজ্জামান বলেন, তাঁরা ভোটারদের বাড়ি বাড়ি যাচ্ছেন। আশা করছেন আসনটি বিএনপির দখলে থাকবে। জেলা বিএনপির সভাপতি এম এ মজিদ বলেন, আসন নিয়ে এখন আর কোনো জটিল নেই। নেতা–কর্মীরা দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন।
এ আসনে জেলা আমির অধ্যাপক আলী আযম মো. আবু বক্করকে প্রার্থী করেছে জামায়াত। এ ছাড়া বাম জোটের মো. আসাদুজ্জামান, ইসলামী আন্দোলনের মো. মোমতাজুল করীম, এবি পার্টির মো. হাদিউজ্জামান, জাতীয় পার্টি (একাংশ) ও জেপির নেতৃত্বে আত্মপ্রকাশ করা নির্বাচনী জোট জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের দীপক কুমার পালিত নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছেন। জামায়াত নেতা আলী আযম মো. আবু বক্কর বলেন, দল তাঁকে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। জয়ের ব্যাপারে তিনি শতভাগ আশাবাদী।
ঝিনাইদহ-৩ (কোটচাঁদপুর ও মহেশপুর)
১৯৯১ সাল থেকে টানা তিন মেয়াদে এ আসনে বিএনপির এমপি ছিলেন প্রয়াত শহিদুল ইসলাম। এবার তাঁর ছেলে ও মহেশপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মেহেদী হাসানকে (রনি) প্রার্থী করেছে বিএনপি। তাঁর বিপক্ষে কেন্দ্রীয় শুরা সদস্য মো. মতিয়ার রহমানকে মনোনয়ন দিয়েছে জামায়াত। এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলনের মাওলানা সরোয়ার হোসেন নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
বিএনপির প্রার্থী মেহেদী হাসান প্রথম আলোকে বলেন, তিনি দিনরাত মাঠে কাজ করছেন। তবে জামায়াত একটু আগে মাঠে নেমেছে। তারপরও তিনি জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী। তবে জামায়াতের নেতারা বলছেন, এখানে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। জেলার চারটি সংসদীয় আসনের মধ্যে এখানে গণ অধিকার পরিষদের পক্ষ থেকে প্রার্থী হয়েছেন মো. সুমন কবির।
ঝিনাইদহ-৪ (কালীগঞ্জ ও সদরের একাংশ)
বিএনপির ‘ঘাঁটি’ হিসেবে পরিচিত এ আসনে ১৯৯১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত এমপি ছিলেন প্রয়াত এম শহীদুজ্জামান। এবার মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম, কালীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক হামিদুল ইসলাম এবং প্রয়াত শহীদুজ্জামানের স্ত্রী মুর্শিদা জামান। তফসিল হয়ে গেলেও এখনো প্রার্থী ঘোষণা করা হয়নি। অবশেষে গণ অধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খাঁনকে প্রথমে জোট থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। পরে রাশেদ খাঁন বিএনপিতে যোগদান করলে তাঁকে ধানের শীষের প্রার্থী করা হয়।
মনোনয়নপ্রত্যাশী সাইফুল ইসলাম জানান, তিনি ১৭ বছর দলের জন্য কাজ করেছেন। তাঁরা তিনজন মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন, তাঁদের কাউকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। যাঁকে দেওয়া হয়েছে, তিনি এলাকার নন, সাধারণ মানুষ তাঁর সঙ্গে নেই। এ কারণে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। তিনি জয়ের ব্যাপারেও আশাবাদী।
এ আসনে কালীগঞ্জ উপজেলার নায়েবে আমির মাওলানা আবু তালেবকে মনোনয়ন দিয়েছে জামায়াত। আবু তালেব বলেন, তিনি নির্বাচিত হলে চাঁদাবাজ, সন্ত্রাস, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠায় কাজ করবেন। এখানে ইসলামী আন্দোলনের আবদুল জলিল, গণফোরামের কনিকা খানম মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।