অশ্বত্থের ছায়ায় শতবর্ষী বিল্বগ্রাম হাট: গ্রামবাংলার চিরায়ত রূপ

বরিশালের গৌরনদী উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামে অশ্বত্থগাছের ছায়ায় শতবর্ষী বিল্বগ্রাম হাটে নানা পণ্যের পসরা নিয়ে বসেছেন ভাসমান দোকানিরা। সম্প্রতি তোলাছবি: প্রথম আলো

শতবর্ষী অশ্বত্থগাছের ডালগুলো মাথা উঁচু করে আলোর দিকে তাকিয়ে আছে। নিচে তারই ছায়ায় টাটকা শাকসবজি, ফলমূলসহ নানা পণ্যের পসরা নিয়ে বসেছেন ভাসমান ব্যবসায়ীরা। কাপড়ের শামিয়ানা আর পলিথিনের ছাউনির নিচে গড়ে ওঠা এসব অস্থায়ী দোকানে ক্রেতাদের ভিড়। শত বছরের ঐতিহ্যবাহী এই হাট আজও গ্রামীণ হাটের চিরায়ত রূপ ধারণ করে আছে।

বরিশালের গৌরনদী উপজেলার অশোককাঠি থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার সরু পিচঢালা সড়ক ধরে গেলেই বিল্বগ্রাম বাজার। চারপাশে খাল-বিল আর সবুজ ধানখেত পেরিয়ে হঠাৎই চোখে পড়ে জনবহুল হাট। এটি শুধু গ্রামীণ ঐতিহ্যের স্মারক নয়; এখানে ধর্মীয় সম্প্রীতির ছবিটাও স্পষ্ট। বাজারের পশ্চিম পাশে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে দুই ধর্মের উপাসনালয়—একটি মসজিদ ও একটি কালীমন্দির। আজানের ধ্বনি আর মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি মিলেমিশে এক নীরব সহাবস্থানের বার্তা দেয়।

শুধু ধর্মীয় সম্প্রীতিই নয়, বিল্বগ্রাম হাটে নারীদের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণও চোখে পড়ার মতো। বাজারে নারীদের জন্য একটি আলাদা একতলা মার্কেট আছে। এখানে চারজন নারী কসমেটিকস, তৈরি পোশাক, হোমিও চিকিৎসকের চেম্বার ও বিউটি পারলার দিয়ে ব্যবসা করছেন। ২০১৭ সালে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) অর্থায়নে নারীদের স্বাবলম্বী করতে মার্কেটটি নির্মাণ করা হয়। গ্রামীণ হাটের ভেতর এমন উদ্যোগ খুব একটা দেখা যায় না।

বিল্বগ্রাম হাটে নারীদের জন্য আলাদা একটি মার্কেট নির্মাণ করে দিয়েছে সরকার। সম্প্রতি তোলা
ছবি: প্রথম আলো

বিল্বগ্রামের বাসিন্দা মো. শাহজাহান মিয়া (৭৬) প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার জন্মের পর থেকে এই বাজার দেখছি। আমার বাবা–দাদার মুখেও বাজারের বর্ণনা শুনেছি। গৌরনদী এলাকার সবচেয়ে পুরোনো বাজারের একটি এটি।’ তিনি বলেন, বাজারটি যুগ যুগ ধরে গ্রামীণ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে এখানকার চাষের মাছ ও পান বিখ্যাত। এগুলোর চালান ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যায়।

বাজারে ঢুকতেই দেখা গেল দুই গলির মাঝখানে একটি বড় খোলা মাঠ। এখানে বিভিন্ন সভা-সমাবেশ, সামাজিক অনুষ্ঠান, এমনকি রাজনৈতিক সভাও হয়। প্রথম গলি ধরে এগোতেই চোখে পড়ে নারীদের মার্কেটটি। হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক হিসেবে রোগীদের সেবা দিচ্ছেন রেখা রানী দাস। পাশের আরেকটি কক্ষে মিনু বেগম নামের আরেক নারী প্রসাধনীর দোকান করেছেন।

রেখা রানী দাস প্রথম আলোকে বলেন, ‘২০১৭ সারে সরকার আমাদের এই মার্কেট করে একটি কক্ষ বরাদ্দ দিয়েছে। ওই সময় আমাদের কিছু পুঁজিও দেওয়া হয়েছিল। এখন মাসে ৫০ টাকা ভাড়া দিয়ে আমরা মার্কেটে ব্যবসা করে পরিবার নিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে আছি।’

মার্কেটের দক্ষিণ পাশে সামুদ্রিক ও স্থানীয় বিল-ঘেরে চাষ করা মাছ বিক্রির দুটি বড় শেড আছে। সেখানে তাজা মাছ নিয়ে বসে আছেন বিক্রেতারা। রুই, কাতল, মৃগেল, সিলভার কার্প, পাঙাশ, তেলাপিয়া, শোল, কই, শিং, মাগুরসহ—হরেক রকম মাছের পসরায় মুখর পুরো এলাকা। কেউ মাছ বেছে নিচ্ছেন, কেউ আবার হাতে তুলে ওজন যাচাই করছেন।

বিল্বগ্রাম হাটে তাজা মাছ নিয়ে বসে আছেন বিক্রেতারা। সম্প্রতি তোলা
ছবি: প্রথম আলো

একটু সামনে এগোলেই চোখে পড়ে বিশাল অশ্বত্থগাছটি। ডালপালা ছড়িয়ে আকাশের দিকে উঠে যেন সবকিছুর ওপর নীরব অভিভাবকের মতো দাঁড়িয়ে আছে। তার নিচে খোলা মাঠজুড়ে শাকসবজি আর ফলের পসরা নিয়ে বসেছেন অস্থায়ী ব্যবসায়ীরা। লাউ, কুমড়া, শিম, বেগুন, মরিচ, শাকের আঁটি—সবই স্থানীয় খেত আর বাড়ির আঙিনার ফসল। বেশির ভাগ বিক্রেতাই নিজের উৎপাদিত পণ্য এনে বিক্রি করেন।

বেলাল হোসেন নামের এক ভাসমান সবজি ব্যবসায়ী বলেন, ‘শনি ও মঙ্গলবার আমাদের ভাসমান হাট বসে। আমরা এখানে স্থানীয় শাকসবজি বিক্রি করি। এটা এই অঞ্চলের পুরোনো বড় বাজার। বেচাবিক্রিও খুব ভালো। তাই অনেক ব্যবসায়ী এখানে আসেন নিয়মিত। ক্রেতাদেরও ভিড় থাকে প্রচুর।’

চিরচেনা গ্রামীণ হাটের বৈশিষ্ট্য অনিবার্যভাবে পুরোনো দিনের স্মৃতিতে টেনে নিয়ে যায়। এই জনপদের পান, বিলের জিয়ল ও ঘেরের মাছ বিশেষভাবে পরিচিত। হাটের এক প্রান্তে পানপাতার গাঢ় সবুজ স্তূপ, অন্য প্রান্তে রুপালি আঁশের ঝিলমিল করা তাজা মাছের সারি—এই দুই বিপরীত অথচ পরিপূরক দৃশ্য মিলেই যেন বিল্বগ্রাম হাটের আসল রূপ। আধুনিকতার কোলাহলের মধ্যেও এই হাট তাই শুধু কেনাবেচার জায়গা নয়, এটি গ্রামবাংলার জীবনের ছন্দ, স্মৃতি আর জীবিকাকে একসুতায় গেঁথে রাখা এক জীবন্ত দৃশ্যপট।