হামলা-মামলার ভয়ে প্রায় পুরুষশূন্য গ্রাম, গবাদিপশু নেওয়া হচ্ছে আত্মীয়ের বাড়ি
ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলায় দুই দল গ্রামবাসীর সংঘর্ষে একজন নিহত হওয়ার পর মাধবপুর গ্রামে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। হামলা-মামলার ভয়ে গ্রামটি প্রায় পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে। লুটপাট ও বাড়িঘর ভাঙচুরের আশঙ্কায় গবাদিপশু রক্ষায় সেগুলো আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে সরিয়ে নিচ্ছেন বাসিন্দারা।
গত বৃহস্পতিবার সকালে উপজেলার মনোহরপুর ইউনিয়নের মাধবপুর গ্রামে দুই পক্ষের সংঘর্ষে মোহন শেখ (৭০) নিহত হন। সংঘর্ষে জড়িত এক পক্ষ উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবুল হোসেন এবং অপর পক্ষ জেলা যুবদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবু জাহিদ চৌধুরীর সমর্থক বলে জানা গেছে। নিহত মোহন শেখ ছিলেন আবু জাহিদ চৌধুরীর সমর্থক। এ ঘটনায় মোহন শেখের ছেলে আবদুর রশিদ শেখ ৪২ জনের নাম উল্লেখ করে এবং আরও ২৫-২৬ জনকে অজ্ঞাতপরিচয় আসামি করে থানায় হত্যা মামলা করেছেন।
স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য, ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আবুল হোসেন ও আবু জাহিদ চৌধুরীর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। এর জেরে গত বুধবার জাহিদ চৌধুরীর এক সমর্থককে মারধর করা হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় বৃহস্পতিবার সকালে তাঁর সমর্থকেরা প্রতিপক্ষের ওপর হামলা চালান। ওই সংঘর্ষে মোহন শেখ নিহত হন।
আবুল হোসেনের কয়েকজন অনুসারীর অভিযোগ, হত্যাকাণ্ডের পর আবু জাহিদ চৌধুরীর সমর্থকেরা তাঁদের বাড়িঘরে লুটপাট ও ভাঙচুর চালান। দুই দিনে প্রায় ৪০টি বাড়ি ও দোকান ভাঙচুর করা হয়েছে এবং অন্তত ৬৫টি গরু-ছাগল লুট করা হয়েছে। এর মধ্যে কিছু গবাদিপশু উদ্ধার করেছে পুলিশ। মামলার ভয়ে আবুল হোসেনপন্থী পুরুষ সদস্যরা বাড়িছাড়া হওয়ায় গ্রামটি প্রায় পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে।
গতকাল রোববার দুপুর ১২টার দিকে গ্রামের অন্তত ১৫টি পরিবার গাড়িতে করে নিজেদের গরু-ছাগল পার্শ্ববর্তী ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে পাঠায়। পুলিশের উপস্থিতিতে প্রায় ২৫টি গরু ও ১১টি ছাগল সরিয়ে নেওয়া হয়। রোববার দুপুরে কথা হয় মাধবপুর গ্রামের সুফিয়া খাতুনের সঙ্গে। তিনি পুলিশের উপস্থিতিতে রাজধরপুর গ্রামে আত্মীয়ের বাড়িতে দুটি গরু রাখতে এসেছিলেন। তিনি বলেন, তাঁরা হত্যাকারীদের বিচার চান। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে গ্রামের যাঁরা আবুলের হোসেনের সমর্থক, কিন্তু ভালো মানুষ, তাঁদের নামেও মামলা দিয়েছে। এ কারণে প্রায় বাড়িতেই পুরুষ মানুষ নেই। একই গ্রামের মনিরা খাতুন বলেন, বৃদ্ধ ও শিশু ছাড়া বাড়িতে কোনো পুরুষ নেই। কোরবানির ঈদের জন্য একটি গরু লালন করছিলেন। বাজারে তুললে দুই লাখ টাকার বেশি দাম পাওয়া যেত। লুটের ভয়ে সেটিও আত্মীয়ের বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছেন।
আবুল হোসেনের ছেলে ও উপজেলা যুবদলের সদস্যসচিব আবুল বাশার তরিকুল সাদাত বলেন, হত্যার দিন থেকে তাঁদের পক্ষের অন্তত ৪০টি বাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছে এবং প্রায় ৭০টি গরু লুট করা হয়েছে। পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে ১৫-২০টি গরু উদ্ধার করে মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে তাঁদের সমর্থকদের বিরুদ্ধে ‘মিথ্যা মামলা’ দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। মামলার কারণে মাধবপুর গ্রাম পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে। মানুষের বাড়িঘরের কোনো নিরাপত্তা নেই।
ওই হত্যার ঘটনার পর এলাকায় শান্তি বজায় রাখার চেষ্টা করছেন বলে দাবি করেন আবু জাহিদ চৌধুরী। তিনি প্রতিপক্ষের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। সংঘর্ষের সময় প্রতিপক্ষই অন্তত ১৫টি বাড়িঘর ভাঙচুর করেছে। গরু লুটের অভিযোগও ভিত্তিহীন। হত্যার দিন থেকেই গ্রামে পুলিশ আছে। আমিসহ বেশ কিছু নেতা-কর্মী সর্বদা দৃষ্টি রাখছি, যেন নতুন করে কিছু না ঘটে।’
নিহত হওয়ার ঘটনায় করা মামলার প্রধান আসামিকে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানান মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শৈলকুপা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আবুল কাশেম। তিনি বলেন, সংঘর্ষের পর থেকেই এলাকায় পুলিশ মোতায়েন আছে। অভিযোগের ভিত্তিতে কয়েকটি গরু উদ্ধার করে মালিকদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। মামলার আসামিরা পলাতক থাকায় তাঁদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত আছে।