আয় ১৭ গুণ, সম্পদ ৮৮ গুণ বাড়লেও হাতে কোনো টাকা নেই শাহজাহান ভূঁইয়ার

মো. শাহজাহান ভূঁইয়া
ছবি: সংগৃহীত

২০১৪ সালে মো. শাহজাহান ভূঁইয়ার বার্ষিক আয় ছিল ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা। ব্যবসার মুনাফা, বাড়ি, দোকানভাড়া, সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য খাত থেকে এখন তিনি বছরে আয় করছেন সাড়ে ৮১ লাখ টাকা, যা ২০১৪ সালের তুলনায় প্রায় ১৭ গুণ বেশি। তবে তাঁর হাতে এখন নগদ এক টাকাও নেই। ব্যাংকেও কোনো টাকা নেই তাঁর।

শাহজাহান ভূঁইয়া এবার নারায়ণগঞ্জ-১ (রূপগঞ্জ) আসনে সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন। তিনি রূপগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। জাতীয় সংসদ নির্বাচন করতে তিনি উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের পদ ছেড়েছেন। তবে দল থেকে মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন। ২০১৪ ও ২০১৯ সালের উপজেলা পরিষদ নির্বাচন ও এবারের সংসদ নির্বাচনে দেওয়া হলফনামা বিশ্লেষণ করে তাঁর আয় ও সম্পদ বৃদ্ধির তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁর বিরুদ্ধে হলফনামায় তথ্য গোপনের অভিযোগ করেছেন প্রতিদ্বন্দ্বী এক প্রার্থী।

হলফনামার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০১৪ সালের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের সময় তাঁর নামে ২ লাখ ৫৫ হাজার টাকা মূল্যের ৩ বিঘা জমি ও যৌথ মালিকানায় ১২ বিঘা জমি ছিল। বর্তমানে তাঁর ১ কোটি ৯৬ লাখ টাকার ভবন ও ২৮ লাখ ৬০ হাজার টাকা মূল্যের বাড়ি আছে। স্থাবর সম্পদ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ২৪ লাখ ৭৭ হাজার ৬৩০ টাকা। এই হিসাবে গত ৯ বছরে তাঁর স্থাবর সম্পদের পরিমাণ বেড়েছে ৮৮ গুণ। যদিও এবার আর কোনো জমি থাকার কথা উল্লেখ করেননি তিনি।

আরও পড়ুন

হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে শাহজাহান ভূঁইয়ার কাছে ২৮ লাখ ২৪ হাজার টাকা নগদ এবং ২৮ লাখ ২৪ হাজার টাকা ব্যাংকে জমা ছিল। ২০১৯ সালে নগদ ১০ লাখ টাকা এবং ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ৪০ লাখ ৫ হাজার টাকা ছিল। তবে এবারের হলফনামা অনুযায়ী, শাহজাহান ভূঁইয়ার বর্তমানে কোনো নগদ টাকা নেই। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানেও কোনো টাকা নেই।

৯ বছর আগে তাঁর স্ত্রীর নামে ৪৫ ভরি সোনা ছিল। ২০১৯ সালেও সেই সোনার কথা হলফনামায় উল্লেখ করলেও এবার তিনি তা উল্লেখ করেননি। ২০১৯ সালে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের সময় তাঁর দুই লাখ টাকা মূল্যের আসবাব ছিল। চার বছর পর এসে মাত্র ৩৫ হাজার টাকার আসবাব আছে তাঁর ঘরে। চার বছর আগে ব্যবহার করা দেড় লাখ টাকার ইলেকট্রনিকস সামগ্রীর জায়গায় এখন ব্যবহার করেন ৩০ হাজার টাকার সামগ্রী। হলফনামা অনুযায়ী এসএসসি পাস শাহজাহান ভূঁইয়া তিনটি হত্যা ও একটি চুরির মামলার আসামি ছিলেন। সবগুলো মামলা থেকেই তিনি অব্যাহতি পেয়েছেন। তাঁর নামে বর্তমানে ব্যাংকঋণ আছে সাত লাখ টাকা।

তথ্য গোপনের অভিযোগ

আওয়ামী লীগের নেতা শাহজাহান ভূঁইয়া হলফনামায় তথ্য গোপন করেছেন বলে অভিযোগ করেছেন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা। গতকাল সোমবার সকালে জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা শাহজাহান ভূঁইয়ার মনোনয়ন বৈধ বলে ঘোষণা করেন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী হাবিবুর রহমান গতকাল রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের অভিযোগ করেন, শাহজাহান ভূঁইয়া হলফনামায় তথ্য গোপন করেছেন। তিনি শাহজাহান ভূঁইয়ার নামে থাকা কয়েকটি ব্যাংক স্টেটমেন্টের কাগজ দেখান।

হাবিবুর রহমান দাবি করেন, তাঁর জানামতে একটি বেসরকারি ব্যাংকে শাহজাহান ও তাঁর ছেলে সাইফুল ইসলামের বর্তমানে অন্তত ৭৪ লাখ টাকা ঋণ আছে, যা তাঁর হলফনামায় উল্লেখ করা হয়নি। একটি সরকারি ব্যাংক হিসাবেই তাঁর নামে সাড়ে ১৫ লাখ টাকা আছে। শাহজাহানের স্ত্রীর নামে ৪৫ ভরি গয়না আছে। উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যকরী সদস্য হাবিবুর তথ্য গোপনের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ করবেন বলে জানিয়েছেন।

আরও পড়ুন

অভিযোগের বিষয়ে গতকাল রাতে শাহজাহান ভূঁইয়ার সঙ্গে কথা হয়। তাঁর কাছে কোনো টাকাপয়সা আছে কি না জানতে চাইলে শাহজাহান বলেন, তাঁর কাছে কোনো টাকা নেই। টাকা ছাড়া কীভাবে নির্বাচন করবেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তাঁর কাছে নগদ ১৩ লাখ ও ব্যাংকে ৪০ লাখ টাকা জমা আছে। তাঁর স্ত্রীর সোনার কী হয়েছে জানতে চাইলে বলেন, ‘আছে আছে, সবই আছে।’ আলাপের একপর্যায়ে তিনি স্বীকার করেন তাঁর নামে সাত লাখ নয়; বরং অন্তত ৭০ লাখ টাকা ব্যাংকঋণ আছে। এসব তথ্য হলফনামায় গোপন করার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কোনো কিছু গোপন করা হয়নি। সবই দেওয়া হয়েছে।’

আরও পড়ুন

মনোনয়ন যাচাই–বাছাইয়ের সময় তথ্য গোপনের বিষয়টি দেখা হয়েছে কি না জানতে চাইলে জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা মাহমুদুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রার্থীর কোনো খেলাপি ঋণ আছে কি না, তা যাচাই হয়েছে। তাঁর ব্যাংক হিসাবে কত টাকা আছে বা কত টাকা ঋণ আছে, তা যাচাই হয়নি। আমাদের কাছে কেউ এ বিষয়ে অভিযোগও করেননি। এ বিষয়ে কেউ আপিল করলে যাচাই–বাছাই করে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।’

এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আশিকুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২–এর ১২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রার্থীর স্থাবর–অস্থাবর সম্পত্তি, দায়সহ অন্যান্য হিসাব বাধ্যতামূলকভাবে হলফনামায় দিতে হবে। স্ট্যাম্প পেপারে সই করে হলফনামায় তথ্য গোপন ও মিথ্যা তথ্য দেওয়া গুরুতর অপরাধ। এর ফলে প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিলসহ ফৌজদারি আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আছে।