‘শুধু ভোটের দিনই নিজেরে দেশের মালিক মনে হয়’

খুলনার কয়রা উপজেলার শাকবাড়িয়া নদীতীরবর্তী বেড়িবাঁধের ওপর দাঁড়িয়ে নির্বাচন নিয়ে কথা বলেন কয়েকজন ভোটার। আজ সকালে গুড়িয়াবাড়ী গ্রামেছবি: প্রথম আলো

খুলনার কয়রা উপজেলার শাকবাড়িয়া নদীর পাড়ঘেঁষা গুড়িয়াবাড়ী গ্রাম। নদীর ওপারেই সুন্দরবন। গ্রামটির অধিকাংশ মানুষ সনাতন ধর্মাবলম্বী। জীবিকার জন্য কেউ মাছ ধরেন, কেউ কাঁকড়া শিকার করেন, কেউ মধু বা গোলপাতা সংগ্রহ করেন। সুন্দরবনই তাঁদের জীবন ও জীবিকার প্রধান অবলম্বন।

আজ বুধবার সকালে নদীতীরবর্তী বেড়িবাঁধের মাটির রাস্তায় দাঁড়িয়ে কথা হয় গুনধর গাইন, সমরেশ রায়, সুবাশ কয়াল ও পরিতোষ রায়ের সঙ্গে। নির্বাচন এলেই এই বেড়িবাঁধ এলাকায় ভোট, নিরাপত্তা আর ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।

৬৭ বছর বয়সী গুনধর গাইন বলেন, ‘এবার সবাই বলতিছে—এই আসনে হিন্দু ভোট খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিন ভাগের এক ভাগ ভোট আমাগের; যেদিকে যাবে, সেদিকেই পাল্লা ভারী হবে। তাই প্রার্থীরাও খুব আসা-যাওয়া করিছে। এখন আমাগের খুব দাম, কিন্তু ভোট নেওয়ার পর আর খবর থাকে না। শুধু ভোটের দিনই নিজেরে দেশের মালিক মনে হয়।’

স্বাধীনতার পর প্রায় সব নির্বাচনেই ভোট দিয়েছেন গুনধর গাইন। তাঁর ভাষ্য, আগে নির্বাচনী প্রচারণা এত জোরালো ছিল না। হাটের দিনে লিফলেট বিলি হলেই প্রচারণা শেষ হয়ে যেত। এখন গ্রামে গ্রামে প্রার্থীদের যাতায়াত বাড়লেও মানুষের বাস্তব জীবনে খুব একটা পরিবর্তন আসে না।

পাশেই ছিলেন সমরেশ রায়। কথা কেড়ে নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের এলাকায় ভোটের দিন কখনো বড় মারামারি হয়নি। কিন্তু এবার একটু ভয় তো আছেই। ভোটের পর যে হারবে, তারা যদি এসে বলে—তোমরা ওমাগেরে ভোট দেওনি।’

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থীদের কাছে নিজেদের প্রত্যাশার কথা তুলে ধরে সুবাশ কয়াল বলেন, ‘এখন বনে ঢুকলি আগে বনদস্যুদের চান্দা দিতে হয়। না দিলি মারধর করে, নৌকা-জাল নিয়ে নেয়। ভোট চাইতে যারা আইছিল, সবাইরে বলিছি—যেভাবেই হোক বনদস্যু নির্মূল করতি হবে।’

সুন্দরবনসংলগ্ন কয়রা ও পাইকগাছা উপজেলা নিয়ে গঠিত খুলনা-৬ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ২৩ হাজার ৩৩১ জন। এর মধ্যে প্রায় এক লাখ সনাতন ধর্মাবলম্বী ভোটার আছেন। অতীত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ এখানে সবচেয়ে বেশি জয়ী হয়েছে। এবার দলটি সরাসরি মাঠে না থাকলেও তাদের ভোটব্যাংক গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

কয়রা উপজেলায় ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী মুন্ডার প্রায় ১ হাজার ৩০০ জন বসবাস করেন। তাঁদের কয়েকজন তরুণ ভোটার বলেন, এখন আর কেউ চাপের মুখে ভোট দেন না। সমাজ ও সম্প্রদায়ের উন্নয়নে যিনি কাজ করবেন, তাঁকেই তাঁরা বেছে নেবেন।

হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান যুব ঐক্য পরিষদের কয়রা উপজেলা সভাপতি অরবিন্দ কুমার মণ্ডল বলেন, ‘আমরা কোনো দলের নই। আমাদের চাওয়া নিরাপত্তা, সম্মান আর নিশ্চিন্তে বাঁচার অধিকার। যে প্রার্থী সেটা নিশ্চিত করবেন বলে মনে হবে ১২ তারিখ সংখ্যালঘুরা তাঁকেই ভোট দেবে।’

এবারের সংসদ নির্বাচনে এ আসনে পাঁচজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ভোটারদের ধারণা, মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে। স্থানীয়দের মতে, সংখ্যালঘু ও আওয়ামী লীগ-সমর্থিত ভোটের গতিপথই এই আসনের ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।