আজ শুক্রবার সকালে আশ্রয়ণ প্রকল্পে পাওয়া রঙিন পাকা ঘরের সামনে চুলায় রান্না বসিয়েছেন জোহরা। পাকা ঘর দেখিয়ে তিনি বলেন, ‘অ্যালা মোর থাকিবার কষ্ট নাই। ইউএনও স্যার ডাকে আনি পাকা ঘর দিছে। সারা দিন গ্রাম ঘুরে রাইতো ওই ঘরোত শান্তিতে ঘুমাও। আগের থাকি ভালোয় আছুন। এটে কারেন্টে সংযোগ না থাকায় গরমোত সমস্যায় পড়ছুন।’

ওই আশ্রয়ণ প্রকল্পে ঘর পাওয়া কুদ্দুস আলী ও আবেদা বেগম দম্পতির কোনো জায়গা–জমি নেই। ভিক্ষা করে তাঁদের সংসার চলে। আলমপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) পাশে খুপড়িতে তাঁরা থাকতেন। সামান্য বৃষ্টি হলে বেড়ার ফাঁক দিয়ে পানি ঢুকত। তাঁদের জমিসহ শ্যামগঞ্জ আশ্রয়ণ প্রকল্পে পাকা ঘর দেওয়া হয়েছে।

কুদ্দুস আলী বলেন, ‘ঘর দিবার জন্যে উপজেলা থাকি মাইকিং করছে। মুই সেই মাইকিং শুনি পরিষদোত যায়া আবেদন করছু। সরকারি লোক হামার থাকার জায়গা দেখছে, খোঁজ নিছে। তারপর ডাকে নিগি পাকা ঘরের চাবি আর জমির কাগজ দিছে। মুই খুব খুশি। বাকি জীবন আবেদাক নিয়া পাকা ঘরোত সুখে কাটাইম।’

জোহরা আর কুদ্দুস আলীর মতো ভূমিহীন ও গৃহহীন ২৭টি পরিবারের ঠাঁই হয়েছে শ্যামগঞ্জ আশ্রয়ণ প্রকল্পে। এ ছাড়া ভীমপুর আশ্রয়ণ প্রকল্পে ৯টি, হাতীবান্ধা আশ্রয়ণ প্রকল্পে ১৬টি, উজিয়াল আশ্রয়ণ প্রকল্পে ২২টি ও চিলাপাক আশ্রয়ণ প্রকল্পে ২৬টি ভূমিহীন অসহায় পরিবারকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে আশ্রয়ণ প্রকল্প-২–এর আওতায় জমিসহ পাকা ঘর দেওয়া হয়েছে।

আজ দুপুর ১২টায় হাতিবান্ধা আশ্রয়ণ প্রকল্পে গিয়ে দেখা যায়, গোলাপি টিনের পাকা রঙিন ঘর। প্রতিটি ঘরের পেছনে নির্মাণ করা হয়েছে শৌচাগার। দেখে মনে হয়, পরিপাটি সাজানো ছবির মতো একটি গ্রাম।

এই প্রতিবেদককে দেখে ছুটে আসেন হাতিবান্ধা গ্রামের বিউটি বেগম। তাঁর চোখেমুখে হাসির ঝিলিক। সেখানে কথা হয়, হাতিবান্ধা গ্রামের ভূমিহীন বিউটি বেগমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘তিনটা ছাওয়া থুইয়া সাত বছর আগোত স্বামী হারাইছে। ভাঙা চালাত আকাশ দ্যাখা গেছলো। ঝুরির দিন ঘুমবার পাই নাই। আল্লাহ সেই কান্দন শোনছে। মুই রঙিন পাকা ঘর পাছুন। ছাওয়ার ঘরোক ধরি গোলাপি ঘরে অ্যালা শান্তিতে ঘুমাওং।’

বিউটির পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বৃদ্ধ যুগল মোস্তফা ও আমেনা বেগম ঘর পেয়েছেন কি না, জিজ্ঞেস করতেই হাস্যোজ্জ্বল মুখে চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ে পানি। মোস্তফার বয়স ৫০ পেরিয়েছে। কোনো সহায়–সম্বল নেই। পুত্রসন্তানও নেই। চার মেয়ের বিয়ে দিতে বসতভিটার দুই শতক জমি বিক্রি করেছেন। কাজ পেলে খাবার জোটে, না হলে অনাহারে কাটে। হাতিবান্ধা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে অন্যের জমিতে খুপরিতে কষ্টে জীবন যাপন করতেন। তাঁদেরও হাতিবান্ধা আশ্রয়ণ প্রকল্পে জমিসহ ঘর দেওয়া হয়েছে।

মোস্তফা হোসেন বলেন, ‘এদ্দিন হামার থাকার কষ্ট আছলো। ইউএনও স্যার মোর নামে জমি দিছে। পাকা ঘর দিছে। মুই স্বপ্নেও ভাবো নাই, পাকা ঘরের মালিক হইম। শেষ জীবন মোর পাকা ঘরোত কাটবে।’

জানতে চাইলে ইউএনও রাসেল মিয়া বলেন, ‘প্রতিটি ঘর নির্মাণের জন্য ২ লাখ ৫৯ হাজার ৫০০ টাকা ব্যয় হয়েছে। এই কাজ করতে জেলা প্রশাসক আসিব আহসান স্যার আমাকে সাহস জুগিয়েছেন। যাঁরা ঘর পেয়েছেন, তাঁদের মুখের হাসি আমাকে মুগ্ধ করেছে, অনুপ্রাণিত করেছে। আরও ভূমিহীন ও গৃহহীনদের ঘর দেওয়া হবে।’

উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আনিছুর রহমান বলেন, ‘তারাগঞ্জের আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় ৪০০জন গৃহহীন মানুষের ঠাঁই হয়েছে। ভবিষ্যতে প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় ভূমিহীন ও গৃহহীনদের আরও ঘর দেওয়া হবে। প্রধানমন্ত্রীর এ উদ্যোগ পৃথিবীতে উদাহরণ হয়ে থাকবে।’

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন