বালু তোলার কারণে নদীভাঙনের শিকার একটি স্কুল ভবন। গত সোমবার মানিকগঞ্জের হরিরামপুরে
ছবি: প্রথম আলো

মানিকগঞ্জে পদ্মা থেকে অবৈধভাবে বালু তুলছেন আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা। অবাধে বালু তোলায় নদীপাড়ের ১০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ভাঙন দেখা দিয়েছে। আওয়ামী লীগের নেতারা অবৈধভাবে বালু তোলার জন্য একে অপরকে দোষারোপ করছেন।

এলাকার লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হরিরামপুর উপজেলার লেছড়াগঞ্জ ও বয়ড়া পদ্মা নদী থেকে অবৈধভাবে বালু তুলছেন ঢাকার দোহার, মানিকগঞ্জের হরিরামপুর ও ফরিদপুরের ক্ষমতাসীন দলের জনপ্রতিনিধি ও নেতা-কর্মীরা। দোহার থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন নয়াবাড়ি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম ও আওয়ামী লীগের নেতা মোক্তার হোসেন।

মানিকগঞ্জ জেলা থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন হরিরামপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান দেওয়ান সাইদুর রহমান। তিনি ইজারা নিয়ে বালু তুললেও নির্ধারিত এলাকার বাইরে থেকে বালু তুলছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ফরিদপুর থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন চরভদ্রাসনের ঝাউকান্দা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান বদরউদ্দিন মৃধা।

বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে গিয়ে গত ২৯ আগস্ট তোপের মুখে পড়েন হরিরামপুরের সহকারী কমিশনার (ভূমি) তাপসী রাবেয়া ও তাঁর দলের সদস্যরা। বালু ব্যবসায়ীদের লোকজন তাঁদের স্পিডবোট একপ্রকার জিম্মি করে আজিমনগর ইউনিয়নে পদ্মা নদী থেকে মৈনট ঘাটে নিয়ে যান। পরে দোহারের সহকারী কমিশনার এস এম মোস্তাফিজুর রহমান সেখান থেকে তাঁদের উদ্ধার করেন। শহিদুল ইসলামের লোকজনের বিরুদ্ধে এই কাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।

গত শুক্রবার সকালে সরেজমিনে দেখা যায়, দোহারের বাহ্রা ও মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার ধূলশুড়া, খাসপাড়া এলাকা তীব্র ভাঙনের মুখে পড়েছে। প্রতিনিয়ত এসব এলাকায় ভাঙনে বেশ কিছু ঘরবাড়ি বিলীন হয়ে যাচ্ছে। ভাঙনের কবলে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও। ভাঙন ঠেকাতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) পক্ষ থেকে জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে। দোহারের বাহ্রাঘাট এলাকায় নদীর তীরে চারটি ড্রেজার ও পাঁচটি বালুবাহী বাল্কহেড নোঙর করে রাখা হয়েছে।

দোহারের নয়াবাড়ি ইউনিয়নের একাধিক বাসিন্দা বলেন, দিনের বেলা ড্রেজার যন্ত্র ও বালুবাহী বাল্কহেড নদীর তীরে ভিড়িয়ে রাখা হয়। রাতের আঁধারে নদী থেকে ড্রেজার দিয়ে বালু তুলে বাল্কহেডে ভর্তি করে তীরে আনা হয়। এরপর সেগুলো ট্রাক ও মাহিন্দ্রায় তোলা হয়। ৪০ থেকে ৫০ জনের একটি দল দেশীয় অস্ত্র ও লাঠিসোঁটা নিয়ে পাহারায় থাকে।

নবাবগঞ্জের জয়কৃষ্ণপুর আওয়ামী লীগের সহসাধারণ সম্পাদক মামুন মোল্লা বলেন, দোহারের আওয়ামী লীগ নেতা শহিদ (শহিদুল ইসলাম) চার বছর ধরে অবৈধভাবে বালু তুলছেন। এতে তাঁর বাপ-দাদার সম্পত্তি ভাঙনের কবলে পড়েছে।

হরিরামপুরের আজমনগর ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান আলী আকবর খান বলেন, ‘উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সাইদুর রহমানের লোকজন পদ্মা থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণে আমাদের বসতভিটার বেশ কয়েকটি ঘর নদীতে তলিয়ে গেছে।’

হরিরামপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) তাপসী রাবেয়া বলেন, নদীভাঙনে ঘরবাড়ি ও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়ে কেউ অভিযোগ দেননি। অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ২৯ আগস্ট ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করা হয়েছে। এ বিষয়ে তাঁরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।

অভিযুক্তদের পাল্টাপাল্টি দোষারোপ

ফরিদপুর সদরপুরের নারিকেলবাড়িয়া ইউপির চেয়ারম্যান নাসিরউদ্দিন বলেন, চরভদ্রাসন এলাকায় নদীর তীর রক্ষায় বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পে তিনি বালু সরবরাহ করছেন। অন্যত্র থেকে বালু আনতে বেশি টাকা খরচ হয়। তাই মৈনট ঘাট এলাকার মাঝামাঝি অংশ থেকে বালু তুলে প্রকল্পের কাজে সরবরাহ করছেন। নাসিরউদ্দিন বলেন, ‘আমার জানামতে, নদী থেকে বালু তুলছে দুই পক্ষ। এর মধ্যে এক পক্ষ হলেন হরিরামপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান এবং অপর পক্ষ হলেন দোহারের আওয়ামী লীগ নেতা শহিদ। বালু তোলাকে কেন্দ্র করে তাঁদের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছে।’

অভিযোগের ব্যাপারে নয়াবাড়ি ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ নেতা মোক্তার হোসেন বলেন, ‘পদ্মায় আমার দুটি ড্রেজার রয়েছে। বৈধভাবে বালু তোলা হচ্ছে।’ মোক্তার বলেন, ‘আমি হরিরামপুরে ড্রেজার চালাচ্ছি না। সাইদুর চেয়ারম্যানের মানিকগঞ্জের লেছরাগঞ্জ মৌজার ৩০০১ দাগের ৩২ একর জায়গা ড্রেজিংয়ের অনুমতি আছে। কিন্তু তিনি সেটি না মেনে অতিক্রম করে বয়ড়া এলাকায় ড্রেজিং করছেন।’

নয়াবাড়ি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘হরিরামপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে আমার লোকজনকে প্রশাসন দিয়ে আটক করিয়েছেন। অথচ সাইদুর রহমানের লোকজন বেশ কিছু এলাকায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছেন। তাঁর তিন থেকে চারটি ড্রেজার চলমান রয়েছে।’

হরিরামপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান দেওয়ান সাইদুর রহমান বলেন, তিনি ২০-২২ দিন আগে অবৈধভাবে বালু তোলা বন্ধের আবেদন জানিয়ে ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার বরবার একটি চিঠি দেন। ২৯ আগস্ট ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে আটকের বিষয়ে শহিদুল ইসলাম তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ দিচ্ছেন।