রাঙামাটি আসন: সংঘাত–সহিংসতা নয়, শান্তির আকুতি

রাঙামাটির রিজার্ভ বাজার এলাকার মং সাই- এর মতো অধিকাংশ মানুষ শান্তিতে বসবাসের নিশ্চয়তা চানছবি: প্রথম আলো

দেশের সবচেয়ে বড় হ্রদ, সবুজ পাহাড় ও নদী—দৃষ্টিনন্দন সৌন্দর্যে ভরপুর রাঙামাটি। তবে এর আড়ালে রয়েছে নানা সমস্যা–সংকট। শিক্ষা, স্বাস্থ্য খাতে সমস্যা আর সমস্যা। রয়েছে কর্মসংস্থানের অভাব। এসব ছাপিয়ে পাহাড়ের বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা। কখনো আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোর সংঘাত, কখনো স্থানীয় বাসিন্দাদের দুই পক্ষের হানাহানি–সংঘাতে অস্থির ও রক্তাক্ত হয়ে ওঠে সবুজ পাহাড়।

এখন সারা দেশের মতো পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি জেলায়ও চলছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচার–প্রচারণা। ভোটারদের দুয়ারে দুয়ারে যাচ্ছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা। এলাকার উন্নয়নে দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতি। কিন্তু ভোটারদের মনে উন্নয়নের চেয়ে বেশি চিন্তা এ অঞ্চলের স্থিতিশীলতা নিয়ে। তাঁদের প্রত্যাশা, আগামী সরকার হানাহানি–সংঘাত বন্ধ করে যেন তাঁদের শান্তিতে, স্বস্তিতে বসবাস করার নিশ্চয়তা দেয়।

রাঙামাটি পৌরসভার কাঁঠালতলী এলাকার দোকানি আইয়ুব আলী বলেন, ‘এখন পর্যন্ত নির্বাচন নিয়ে তেমন কোনো ঝুটঝামেলা হয়নি। তবে পাহাড়ের পরিবেশ কেমন যেন থম মেরে আছে। ভোট নিয়ে আলাপ–আলোচনা কম। সবাই মনের কথা মনে মধ্যে রেখে দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি ঠিক থাকলে ভোট দিতে কেন্দ্রে যাব। খারাপ হলে অন্য চিন্তা।’

আসন্ন নির্বাচন নিয়ে রাঙামাটি সদর ও আশপাশের উপজেলার বিভিন্ন শ্রেণি, পেশা, বয়সের ২০ জনের সঙ্গে আমরা কথা বলি। তাঁরা বলেছেন, এখানে ভোটের লড়াইয় একজন ছাড়া তেমন কোনো শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় নির্বাচনী আমেজ কম। প্রচারে ঢিলেঢালা ভাব। তবে ভোটের দিন কেন্দ্রে যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করে প্রায় সবাই।

এখন পর্যন্ত নির্বাচন নিয়ে তেমন কোনো ঝুটঝামেলা হয়নি। তবে পাহাড়ের পরিবেশ কেমন যেন থম মেরে আছে। ভোট নিয়ে আলাপ–আলোচনা কম। সবাই মনের কথা মনে মধ্যে রেখে দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি ঠিক থাকলে ভোট দিতে কেন্দ্রে যাব। খারাপ হলে অন্য চিন্তা।
দোকানি আইয়ুব আলী

এবার রাঙামাটিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন সাত প্রার্থী। তাঁরা হলেন বিএনপির দীপেন দেওয়ান, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির জুঁই চাকমা, জাতীয় পার্টির অশোক তালুকদার, স্বতন্ত্র প্রার্থী পহেল চাকমা, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মুহাম্মদ আবু বকর সিদ্দিক, গণ অধিকার পরিষদের মো. আবুল বাশার, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. জসিম উদ্দীন। জামায়াতে ইসলামী ও আঞ্চলিক দল জেএসএস, ইউপিডিএফ প্রার্থী দেয়নি। জামায়াতে ইসলামী ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের ব্যানারে খেলাফত মজলিসের প্রার্থীকে সমর্থন দিয়েছে।

শান্তিতে থাকার আকুতি

তিন পার্বত্য জেলার মধ্যে রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি রাজনৈতিক কারণে দীর্ঘদিন ধরে অস্থিতিশীল। আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ সংঘাত এ অঞ্চলের পুরোনো সমস্যা। ভ্রাতৃত্বঘাতী সহিংসতায় খুনোখুনির ঘটনা নিয়মিত। তবে সাম্প্রতিক সময়ে মাথাব্যথা হয়ে দাঁড়িয়েছে পাহাড়ি–বাঙালির দ্বন্দ্ব–সংঘাত। ২০২৪ সালের আগস্টে দুই পক্ষের সংঘর্ষে এক পাহাড়ি তরুণের মৃত্যু হয়। সময়ে সময়ে এ ধরনের দ্বন্দ্ব–সংঘাত চলতে থাকে।

সরকার, প্রশাসন, রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে আমরা তেমন কিছু আশা করি না। একটাই অনুরোধ, তারা যেন সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি বন্ধ করে। আমরা যেন শান্তিতে বসবাস করতে পারি, যাতে নিজেদের ব্যবসা–বাণিজ্য স্বস্তিতে পরিচালনা করতে পারি।
মুদিদোকানি মং সাই

আঞ্চলিক দলগুলোর ভ্রাতৃত্বঘাতী সহিংসতা, পাহাড়ি–বাঙালির সংঘাতে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি হয় পাহাড়ে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে ব্যবসা–বাণিজ্য থেকে শুরু করে পর্যটনকেন্দ্রিক ব্যবসায়ও। এসব থেকে পরিত্রাণ চান স্থানীয় মানুষ।

রাঙামাটির রিজার্ভ বাজারের মুদিদোকানি ৭২ বছর বয়সী মং সাই বলেন, ‘সরকার, প্রশাসন, রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে আমরা তেমন কিছু আশা করি না। একটাই অনুরোধ, তারা যেন সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি বন্ধ করে। আমরা যেন শান্তিতে বসবাস করতে পারি, যাতে নিজেদের ব্যবসা–বাণিজ্য স্বস্তিতে পরিচালনা করতে পারি।’

ভূমি সমস্যার সমাধান দাবি

পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত নিরসনে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সরকারের সঙ্গে চুক্তিতে সই করে আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস)। ওই সময় সরকারে ছিল চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ। ২৮ বছর পার হলেও চুক্তির অনেক ধারা বাস্তবায়িত হয়নি।

বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এবার নির্বাচনে নেই। নেই আঞ্চলিক দল জেএসএসও। এ অবস্থায় আগামী দিনে পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের কী হবে, তা নিয়ে কিছুটা হলেও সংশয় আছে ভোটারদের মধ্যে।

রাঙামাটির বরকলের বাসিন্দা ও কলেজছাত্রী প্রিয়ন্তী চাকমা বলেন, আগামী দিনে যে সরকার হবে, তাদের কাছে প্রত্যাশা অনেক। এই সরকার যেন পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণাঙ্গ ও যথাযথ বাস্তবায়নে আন্তরিকভাবে কাজ করে। আর পাহাড় ও সমতলে পিছিয়ে পড়া আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখে।

পাহাড়ে শিক্ষা–স্বাস্থ্য সমস্যাও প্রকট। রাঙামাটির প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রায় ৫০০ শিক্ষক পদ শূন্য। মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকের ছয় শতাধিক পদ শূন্য। স্বাস্থ্য খাতের অবস্থাও ভালো না। সদর হাসপাতালে গুরুতর অসুস্থ রোগীদের জন্য নেই আইসিইউ (নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র), সিসিইউ (করোনারি কেয়ার ইউনিট) বা ডায়ালাইসিস ইউনিট। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে চিকিৎসকের সংখ্যা অপ্রতুল।

অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকরিজীবী মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন বলেন, দেশের অন্যান্য জায়গার তুলনায় পাহাড়ের রাজনীতি ভিন্ন। কখনো কখনো মনে হয়, কেউ কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করে রাখে। তবে এর সমাধানে আগামী সরকারকে দায়িত্ব নিতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি অবশ্যই পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। যদি এই চুক্তি বাস্তবায়িত না হয়, তাহলে বড় ধরনের বিপদের মুখোমুখি হবে এ অঞ্চলের মানুষ। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে ব্যবসা–বাণিজ্য থেকে শুরু করে জনজীবনেও।

কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের সময় পারিবারিক জমি তলিয়ে যায় হোমিও চিকিৎসক বুদ্ধ চন্দ্র চাকমাদের। রাঙামাটির তবলছড়িতে তাঁর চেম্বার। গতকাল দুপুরে কথা হয়। তিনি বলেন, কাপ্তাই বাঁধের কারণে তাঁদের পরিবার খাগড়াছড়ির মাটিরাঙা উপজেলায় পাঁচ একর জমি পেয়েছিল। কিন্তু একসময় তা দখল হয়ে যায়। পরে তা আর উদ্ধার করা যায়নি। এ রকম সমস্যা অনেক পরিবারে আছে। তাই পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি, ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি।

শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যাতায়াতে বিশেষ নজর চান

পাহাড়ে শিক্ষা–স্বাস্থ্য সমস্যাও প্রকট। রাঙামাটির প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রায় ৫০০ শিক্ষক পদ শূন্য। মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকের ছয় শতাধিক পদ শূন্য। স্বাস্থ্য খাতের অবস্থাও ভালো না। সদর হাসপাতালে গুরুতর অসুস্থ রোগীদের জন্য নেই আইসিইউ (নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র), সিসিইউ (করোনারি কেয়ার ইউনিট) বা ডায়ালাইসিস ইউনিট। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে চিকিৎসকের সংখ্যা অপ্রতুল।

রাঙামাটির প্রবীণ বাসিন্দা শাহাদাত হোসেন জানান, হাসপাতালে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক নেই। বড় কোনো অসুখ হলে ঢাকা–চট্টগ্রাম চলে যেতে হয়। বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক কম। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শিক্ষকদের এখানে বদলি করা হলেও তাঁরা বেশি দিন থাকেন না। শিক্ষা–স্বাস্থ্যের এমন বেহালের কারণে এ জেলার মানুষ অনেক দুর্ভোগে আছেন। স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়নে উদ্যোগ নিতে হবে।

১০টি উপজেলা নিয়ে রাঙামাটি আসন। মোট ভোটার ৫ লাখ ৯ হাজার ২৬৭। পুরুষ ২ লাখ ৬৩ হাজার ৪১০ ও নারী ২ লাখ ৪৫ হাজার ৮৫৫ জন। হিজড়া ভোটার আছেন ২ জন।

রাঙামাটি সদরের সঙ্গে জেলার ছয় উপজেলার যোগাযোগ নৌপথনির্ভর। এর মধ্যে রাঙামাটির জুরাছড়ি, বিলাইছড়ি, বরকলের যোগাযোগ পুরোপুরি নৌপথনির্ভর। লংগদু, নানিয়ারচর ও বাঘাইছড়ি উপজেলায় বিকল্প হিসেবে সড়কপথ থাকলেও তা ঘুরপথে যেতে হয়। তাতেও খরচ বেশি পড়ে। ছয় উপজেলার জনসংখ্যা প্রায় পাঁচ লাখ।

জুরাছড়ি উপজেলার বাসিন্দা পরেশ চাকমা বলেন, পানি কমলে জুরাছড়ি শলক নদে লঞ্চ, নৌকা আটকে যায়। শলক নদ খনন করা হলে বাড়িতে যাতায়াত সহজ হবে। পাশাপাশি উপজেলাগুলো থেকে কৃষিপণ্য খুব সহজে পরিবহন করা যাবে।

১০টি উপজেলা নিয়ে রাঙামাটি আসন। মোট ভোটার ৫ লাখ ৯ হাজার ২৬৭। পুরুষ ২ লাখ ৬৩ হাজার ৪১০ ও নারী ২ লাখ ৪৫ হাজার ৮৫৫ জন। হিজড়া ভোটার আছেন ২ জন।