পয়লা মাঘের সকালে মনোহর বাজারে বসেছে জোড়া ইলিশের মেলা

জোড়া ইলিশ কিনতে মেলায় এসেছে এলাকার মানুষ। আজ বৃহস্পতিবারছবি: প্রথম আলো

পয়লা মাঘে শীতের সকালে বাজার থেকে জোড়া ইলিশ মাছ কিনে নিয়ে রান্নার প্রথা আছে হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে। শরীয়তপুর সদর উপজেলার মনোহর বাজারে পয়লা মাঘে ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত জোড়া ইলিশ মাছের মেলা বসে। মেলায় মাছের পাশাপাশি গ্রামীণ খাবার ও খেলনা বিক্রিও চলে।

পরিবারের পুরুষ সদস্যরা বাজার থেকে মাছ কিনে নেন। গৃহিণীরা ধান-দূর্বা ও সিঁদুর মেখে তা ঘরে তুলে নেন এবং বিভিন্ন সবজি দিয়ে রান্না করে স্বজনদের পাতে দেন। হিন্দু সম্প্রদায় বহু বছর ধরে এই প্রথা পালন করছে।

আজ বৃহস্পতিবার ভোর থেকে শুরু হওয়া মেলায় কয়েক শ ক্রেতা-বিক্রেতা উপস্থিত থাকায় এলাকা মুখর হয়ে ওঠে। মাছ ব্যবসায়ী ও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দুর্গাপূজার পর হিন্দুরা প্রায় তিন মাস ইলিশ মাছ খাওয়া বন্ধ রাখেন। পয়লা মাঘে আবার দুটি ইলিশ ক্রয় করে ধর্মীয় বিধি অনুযায়ী ঘরে তুলে রান্না করেন। এরপর বেগুন, লাউ ও লাউশাক দিয়ে মাছ রান্না করা হয়।

শরীয়তপুরের হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ জোড়া ইলিশ ঘরে নেওয়ার এই রেওয়াজকে উৎসব হিসেবে উদ্‌যাপন করেন। মনোহর বাজার, মধ্যপাড়া, রুদ্রকর, কাশাভোগ, আংগারিয়া ও ধানুকা হিন্দু–অধ্যুষিত এলাকা। এসব এলাকার মানুষের চাহিদা ও উৎসবের কথা বিবেচনা করে প্রায় ৮১ বছর আগে পয়লা মাঘে মনোহর বাজারে ইলিশ মাছের মেলা শুরু হয়। যেহেতু দুটি ইলিশ মাছ ক্রয় করে উৎসব উদ্‌যাপন করা হয়, তাই এটি ‘জোড়া ইলিশের মেলা’ নামে পরিচিত।

ইলিশ ছাড়াও কই, শিং, মাগুর, শোল, রুই, কাতলা ও চিংড়ি বিক্রি হচ্ছে। আজ বৃহস্পতিবার
ছবি: প্রথম আলো

বৃহস্পতিবার সকালে দেখা যায়, ব্যবসায়ীরা ইলিশ মাছের পসরা সাজিয়ে স্মৃতিস্তম্ভের মাঠে বসেছেন। পাশে গরুর হাট মাঠে অন্যান্য খাবার ও খেলনার দোকান বসেছে।

মধ্যপাড়া এলাকার খুকুমনি দাস নাতিকে নিয়ে মাছ কিনতে মেলায় এসেছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আগে স্বামীর সঙ্গে প্রতিবছর এ দিনটিতে সন্তানদের নিয়ে আসতাম। সন্তানদের এখন বিয়েশাদি হয়ে গেছে, স্বামীও এ বছর একটু ব্যস্ত। তাই ছোট নাতিকে নিয়ে নিজেই এসেছি। মেলায় এসে অনেক অতীত স্মৃতি মনে পড়ে যায়, আনন্দ লাগে। সবচেয়ে তৃপ্তি লাগে এই মাছ রান্নার পর যখন প্রিয়জনের পাতে তুলে দেই।’

ভেদরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা সুমন কুমার পোদ্দারও মেলায় এসেছেন। তিনি বলেন, ‘শিশু বয়সে বাবা ও দাদাদের সঙ্গে আসতাম। এখন পরিবারের সদস্যরা ব্যস্ত। আগের মতো আনন্দ পাই না। আজ মেলায় এসে ছোটবেলার স্মৃতি ভেসে উঠল।’

মাছ বিক্রেতা মনীশ দাস ৩০ বছর ধরে মেলায় জোড়া ইলিশ বিক্রি করছেন। তিনি বলেন, ‘আমার বয়স যখন পাঁচ-ছয় বছর, তখন বাবার সঙ্গে মেলায় আসতাম। এখন নিজেই ৩০ বছর ধরে মাছ বিক্রি করছি। এ বছর মাছের আমদানি একটু কম। ক্রেতার উপস্থিতি বেশি থাকায় দামও একটু বেশি।’

মেলায় ৩০০-৫০০ গ্রাম ওজনের মাছ বিক্রি হয়েছে প্রতি কেজি ৮০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায়। ১ কেজি ইলিশের দাম ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা। ইলিশ ছাড়াও কই, শিং, মাগুর, শোল, রুই, কাতলা ও চিংড়ি বিক্রি হচ্ছে।