চট্টগ্রাম ওয়াসা
দিনে সাড়ে ১২ কোটি লিটার পানি কোথায় যায়
চট্টগ্রাম ওয়াসা প্রতিদিন গড়ে ৫০ কোটি লিটার পানি উৎপাদন করলেও এর ২৫ শতাংশ বা প্রায় ১২ কোটি ৫০ লাখ লিটার ‘সিস্টেম লস’-এর কারণে রাজস্বে রূপান্তরিত হচ্ছে না। এতে বছরে প্রায় ১৪৬ কোটি টাকার উৎপাদন ব্যয় অপচয় হচ্ছে। একই সঙ্গে গ্রাহকদের কাছে সংস্থাটির বকেয়া বিল দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৪১ কোটি টাকা। এই দুই বড় আর্থিক দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে না পারলেও আবাসিক ও বাণিজ্যিক গ্রাহকের পানির দাম ৫ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে ওয়াসা। ওয়াসার এই পরিকল্পনা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ।
চট্টগ্রাম ওয়াসা প্রতিদিন দিনে গড়ে ৫০ কোটি লিটার পানি উৎপাদন করে। এর মধ্যে প্রতিদিন প্রায় ১২ কোটি ৫০ লাখ লিটার পানি অপচয় হচ্ছে। বছরের পর বছর ধরে চলে আসা এই ‘সিস্টেম লস’ বা কারিগরি অপচয় এখনো ২৫ শতাংশ। বছর শেষে এটি টাকার অঙ্কে দাঁড়ায় ১৪৬ কোটি টাকা। এ ছাড়া সংস্থাটির বকেয়া বিলের পরিমাণ ২৪১ কোটি টাকা। অপচয় না কমিয়ে এবং বকেয়া বিল আদায় না করেই আবাসিক ও বাণিজ্যিক গ্রাহকের পানির দাম আরও ৫ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে সংস্থাটির রাজস্ব বিভাগ।
গত শনিবার অনুষ্ঠিত ওয়াসার বোর্ড সভায় পানির দাম বাড়ানোর প্রস্তাব ওঠে। তবে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত না নিয়ে গ্রাহক প্রতিনিধি, পেশাজীবীসহ বিভিন্ন পক্ষের মতামত নিতে চার সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে প্রশ্ন উঠেছে, উৎপাদিত পানির বড় একটি অংশের বিল আদায় করতে না পারা, দীর্ঘদিনের সিস্টেম লস বা কারিগরি অপচয় এবং বিপুল পাওনা আদায়ের দুর্বলতা দূর না করেই কেন আবার মূল্যবৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে।
চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম মো. জানে আলম অবশ্য বলছেন, পরিস্থিতি বদলাতে কাজ শুরু হয়েছে। ধাপে ধাপে স্মার্ট ও প্রিপেইড মিটার বসানো হবে। বিলিং ব্যবস্থা ডিজিটাল করা হবে। অবৈধ সংযোগ ও পানি চুরি ঠেকাতেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাঁর লক্ষ্য, আগামী এক বছরের মধ্যে সিস্টেম লস ২৫ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনা। সেলিম মো. জানে আলম প্রথম আলোকে আরও বলেন, ‘আমি চেষ্টা করছি। সামনে ভালো ফল পাওয়া যাবে।’
পানি সরবরাহে গত দেড় দশকে প্রায় সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে চট্টগ্রাম ওয়াসা। নতুন পানি শোধনাগার, শত শত কিলোমিটার পাইপলাইন এবং নদীনির্ভর পানি সরবরাহব্যবস্থার মাধ্যমে উৎপাদন সক্ষমতা বেড়ে দৈনিক প্রায় ৫৬ কোটি লিটারে পৌঁছেছে। এই প্রকল্পগুলোর বড় অংশই বাস্তবায়িত হয়েছে বিদেশি ঋণ ও সরকারি অর্থে। ওয়াসার যুক্তি, এসব প্রকল্পের ঋণের কিস্তি, বিদ্যুৎ, রাসায়নিক ও পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বর্তমান পানির মূল্য যথেষ্ট নয়।
উৎপাদন বেড়েছে, কমেনি মূল সমস্যা
পানি সরবরাহে গত দেড় দশকে প্রায় সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে চট্টগ্রাম ওয়াসা। নতুন পানি শোধনাগার, শত শত কিলোমিটার পাইপলাইন এবং নদীনির্ভর পানি সরবরাহব্যবস্থার মাধ্যমে উৎপাদন সক্ষমতা বেড়ে দৈনিক প্রায় ৫৬ কোটি লিটারে পৌঁছেছে। এই প্রকল্পগুলোর বড় অংশই বাস্তবায়িত হয়েছে বিদেশি ঋণ ও সরকারি অর্থে। ওয়াসার যুক্তি, এসব প্রকল্পের ঋণের কিস্তি, বিদ্যুৎ, রাসায়নিক ও পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বর্তমান পানির মূল্য যথেষ্ট নয়।
কিন্তু উৎপাদন বাড়লেও সবচেয়ে বড় সমস্যা রয়ে গেছে সিস্টেম লস। ওয়াসার মাসিক ব্যবস্থাপনা প্রতিবেদন (এমআইএস) অনুযায়ী, গত নভেম্বরে এটি ছিল ২২ শতাংশ। ফেব্রুয়ারিতে একবার ১৭ শতাংশে নামলেও মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত টানা চার মাস ২৫ শতাংশে রয়েছে। অর্থাৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও উৎপাদিত পানির একটি বড় অংশ এখনো রাজস্বে রূপান্তর করা যাচ্ছে না।
বর্তমানে দিনে গড়ে ৫০ কোটি লিটার পানি উৎপাদিত হচ্ছে। এ হিসাবে প্রতিদিন প্রায় ১২ কোটি ৫০ লাখ লিটার পানি সিস্টেম লসের আওতায় পড়ছে। ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী মো. মাকসুদ আলমের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি এক হাজার লিটার পানি উৎপাদনে বর্তমানে খরচ হয় ৩২ টাকা। সে হিসাবে প্রতিদিন সিস্টেম লসের আওতায় থাকা পানির উৎপাদন ব্যয় প্রায় ৪০ লাখ টাকা। বছরে এর পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১৪৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ উৎপাদিত পানির এক-চতুর্থাংশের কোনো রাজস্ব না পাওয়ায় প্রতিবছর শতকোটি টাকার উৎপাদন ব্যয় আদায় করতে পারছে না সংস্থাটি।
তবে সিস্টেম লসের সবটাই পাইপলাইনের ফুটোয় নষ্ট হওয়া পানি নয়। এর মধ্যে অবৈধ সংযোগ, পানি চুরি, অচল বা ত্রুটিপূর্ণ মিটার, গড় বিল এবং বিলিং-সংক্রান্ত ত্রুটিও রয়েছে। এই ক্ষতির উৎস নিয়েই ওয়াসার ভেতরে মতভেদ রয়েছে। প্রকৌশল বিভাগের দাবি, পাইপলাইনের ফুটোয় সিস্টেম লসের মাত্র ৩ শতাংশ হয়। কিন্তু রাজস্ব বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, শুধু পাইপলাইনের লিকেজেই ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পানি হারিয়ে যাচ্ছে। একই প্রতিষ্ঠানের দুই বিভাগের এই ভিন্ন হিসাবই দেখাচ্ছে, সিস্টেম লসের প্রকৃত কারণ ও পরিমাণ নিয়ে এখনো স্পষ্ট অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি ওয়াসা।
বিল হচ্ছে, টাকা আসছে না
শুধু উৎপাদিত পানির বিলই নয়, যেসব বিল করা হচ্ছে, সেগুলোর সব টাকাও সময়মতো আদায় করতে পারছে না ওয়াসা। এপ্রিল শেষে গ্রাহকদের কাছে সংস্থাটির মোট পাওনা দাঁড়িয়েছে ২৪০ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে বেসরকারি গ্রাহকদের কাছে ১৭৩ কোটি ৮৬ লাখ এবং সরকারি গ্রাহকদের কাছে ৬৬ কোটি ৮১ লাখ টাকা আদায়যোগ্য রয়েছে।
এ অবস্থায় ওয়াসা একদিকে উৎপাদিত পানির একটি বড় অংশের রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে করা বিলের বিপুল অর্থও আদায় করতে পারছে না। ফলে রাজস্ব আহরণের দুটি প্রধান ক্ষেত্রেই দুর্বলতা থেকে যাচ্ছে।
বর্তমানে দিনে গড়ে ৫০ কোটি লিটার পানি উৎপাদিত হচ্ছে। এ হিসাবে প্রতিদিন প্রায় ১২ কোটি ৫০ লাখ লিটার পানি সিস্টেম লসের আওতায় পড়ছে। ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী মো. মাকসুদ আলমের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি এক হাজার লিটার পানি উৎপাদনে বর্তমানে খরচ হয় ৩২ টাকা। সে হিসাবে প্রতিদিন সিস্টেম লসের আওতায় থাকা পানির উৎপাদন ব্যয় প্রায় ৪০ লাখ টাকা। বছরে এর পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১৪৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ উৎপাদিত পানির এক-চতুর্থাংশের কোনো রাজস্ব না পাওয়ায় প্রতিবছর শতকোটি টাকার উৎপাদন ব্যয় আদায় করতে পারছে না সংস্থাটি।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) বলছে, মূল্যবৃদ্ধির আগে নিজেদের অদক্ষতা ও অনিয়ম কমানোই হওয়া উচিত ওয়াসার প্রথম কাজ। অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা, পানি চুরি রোধ, গড় বিলের অবসান, অচল মিটার পরিবর্তন এবং বকেয়া আদায়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া নতুন করে গ্রাহকের ওপর মূল্যবৃদ্ধির চাপ দেওয়া যৌক্তিক নয়।
ক্যাবের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন প্রথম আলোকে বলেন, সেবার মান না বাড়িয়ে শুধু দাম বাড়ালে তার বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ গ্রাহকের ঘাড়েই পড়ে। এখনো নগরের বড় অংশে নিয়মিত পানি পৌঁছায় না। কোথাও ময়লা পানি, কোথাও পর্যাপ্ত চাপ নেই, কোথাও আবার কয়েক দিন পরপর পানি আসে। তাই দাম বাড়ানোর আগে সিস্টেম লস কমানো, বকেয়া আদায় এবং সেবার মান নিশ্চিত করাই ওয়াসার অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।