যশোরে মালচিং পদ্ধতিতে সবজি চাষে ঝুঁকেছেন কৃষকেরা
যশোরের মনিরামপুর উপজেলার হায়াতপুর গ্রামের কৃষক মুকুল হোসেন ৪৫ শতক জমিতে করলা চাষ করেছেন। করলা বিক্রি করে ইতিমধ্যে তিনি খরচ বাদে লাভ করেছেন ৮০ হাজার টাকা। চলতি করলা মৌসুমে খরচ বাদে তিনি লক্ষাধিক টাকা লাভের আশা করছেন। মালচিং পদ্ধতিতে করলা চাষ করে তিনি এই সাফল্যের দেখা পেয়েছেন।
শুধু মুকুল হোসেন নন, মনিরামপুরে রাজগঞ্জ এলাকার হায়াতপুর, মোবারকপুরসহ কয়েকটি গ্রামের অন্তত ১০ জন কৃষক একটি বেসরকারি সংস্থার সহায়তায় মালচিং পদ্ধতিতে সবজি চাষ করে লাভের মুখ দেখেছেন। তাঁদের সাফল্য দেখে স্থানীয় অনেক কৃষক এই পদ্ধতিতে সবজি চাষ করেছেন। কম উৎপাদন খরচে বেশি লাভ হওয়ায় মালচিং পদ্ধতিতে সবজি চাষে ঝুঁকেছেন তাঁরা।
মালচিং পদ্ধতি মূলত একটি আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি, যেখানে জমি ভালোভাবে প্রস্তুত করে বেড তৈরি করার পর তা বিশেষ ধরনের পলিথিন শিট দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয় এবং নির্দিষ্ট দূরত্বে পলিথিন ফুটো করে সবজির চারা রোপণ করা হয়। এ পদ্ধতিতে মাটির আর্দ্রতা দীর্ঘদিন সংরক্ষিত থাকে, আগাছার উপদ্রব একপ্রকার থাকেই না এবং অতিরিক্ত পানি সহজেই বেডের দুই পাশ দিয়ে নিষ্কাশিত হয়ে যায়। এ ছাড়া পলিথিনের প্রতিফলিত আলো সবজি গাছের পাতার নিচে লুকিয়ে থাকা ক্ষতিকর পোকামাকড় ও তাদের ডিম দূর করতে দারুণ ভূমিকা রাখে, ফলে কীটনাশকের ব্যবহার কমে এবং তুলনামূলক কম খরচে নিরাপদ ও সতেজ সবজির বাম্পার ফলন পাওয়া সম্ভব হয়।
শ্রাবণের এই সময়ে ফসলের মাঠে পানি জমে সবজির গোড়া পচে গাছ মারা যায়। কিন্তু মালচিং পদ্ধতি ব্যবহার করলে গাছের গোড়ায় পানি জমতে পারে না। পলিথিন দিয়ে সবজির বেড ঢাকা থাকার কারণে আগাছা জন্মাতে পারে না।
হায়াতপুর গ্রামের কৃষক মুকুল হোসেন বলেন, শ্রাবণের এই সময়ে ফসলের মাঠে পানি জমে সবজির গোড়া পচে গাছ মারা যায়। কিন্তু মালচিং পদ্ধতি ব্যবহার করলে গাছের গোড়ায় পানি জমতে পারে না। পলিথিন দিয়ে সবজির বেড ঢাকা থাকার কারণে আগাছা জন্মাতে পারে না। পোকামাকড়ের আক্রমণ কম থাকে। এতে ওষুধ ছিটানো লাগে কম। শ্রমিক খরচ বেঁচে যায়। যে কারণে উৎপাদন খরচ কম হয়। ফলন বৃদ্ধি পায়।
গত ৩০ জুলাই মনিরামপুর উপজেলার হায়াতপুর ও মোবারকপুর গ্রামে দেখা যায়, দিগন্তজোড়া ফসলের মাঠ। বিশেষ করে বেগুন, করলা, খিরাই, পটোল, কাকরোলসহ বিভিন্ন ধরনের সবজিতে মাঠ পরিপূর্ণ। অথচ আগে শ্রাবণের এই সময় সবজির চাষ তেমন দেখাই যেত না। ফলে সবজির দাম বেড়ে যায়। কারণ, বৃষ্টির পানি পড়লে সবজিখেত নষ্ট হয়ে যায়। গোড়া পচে সবজির গাছ মারা যায়। ফলে এই সময়ে ফসলের মাঠ থাকে প্রায় ফাঁকা। অথচ রাজগঞ্জের হায়াতপুর ও মোবারকপুর গ্রামে গিয়ে দেখা গেল ভিন্নচিত্র। মাঠভরা ফসল থাকার কারণ একটাই, মালচিং পদ্ধতিতে সবজির আবাদ।
শুধু মুকুল হোসেন নন, মনিরামপুরে রাজগঞ্জ এলাকার হায়াতপুর, মোবারকপুরসহ কয়েকটি গ্রামের অন্তত ১০ জন কৃষক একটি বেসরকারি সংস্থার সহায়তায় মালচিং পদ্ধতিতে সবজি চাষ করে লাভের মুখ দেখেছেন।
হায়াতপুর গ্রামের মাঠে ছয় বছর আগে প্রথম মালচিং পদ্ধতিতে সবজির আবাদ শুরু করেন স্থানীয় বাসিন্দা মিজানুর রহমান টুকু। তিনি বলেন, এবার তিনি চার বিঘা (স্থানীয়ভাবে ৪৮ শতকে বিঘা) জমিতে সবজি চাষ করেছেন। এর মধ্যে আড়াই বিঘা জমিতে মালচিং পদ্ধতিতে খিরাই ও বেগুন চাষ করেছেন। নবলোক পরিষদ নামের একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার পক্ষ থেকে তাঁকে মালচিং পদ্ধতিতে এসব চাষে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। প্রথম দিকে লোকজন এই পদ্ধতি মেনে নিতে পারতেন না। তাঁরা এটিকে ঝামেলা মনে করতেন। কিন্তু তাঁর চাষের সাফল্য দেখে অনেকেই মালচিং পদ্ধতিতে সবজি চাষে ঝুঁকেছেন। এখন প্রায় এলাকার সব কৃষক মালচিং পদ্ধতি ব্যবহার করছেন।
পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) আর্থিক সহায়তায় বেসরকারি সংস্থা নবলোক পরিষদ মনিরামপুর উপজেলার ১০ জন কৃষককে প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রতি জনকে ১৫ হাজার টাকা মূল্যের মালচিং পদ্ধতির বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে সহায়তা করেছে। এ বিষয়ে নবলোক পরিষদের কৃষি কর্মকর্তা প্রিন্স হালদার বলেন, পিকেএসএফের অর্থায়নে তাঁরা প্রথম পর্যায়ে ১০ জন কৃষককে উত্তম কৃষি চর্চার আওতায় আনতে পেরেছেন। এতে কৃষকেরা আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন। ভবিষ্যতে তাঁরা ৫০ জন কৃষককে এই পদ্ধতি আওতায় নিয়ে আসার পরিকল্পনা আছে।
সবজিতে মালচিং পদ্ধতি ব্যবহার করলে ২০ শতাংশ শ্রমিক ও ৩০ শতাংশ রাসায়নিক সার কম লাগে বলে জানান মনিরামপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহমুদা আক্তার। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, আবহাওয়ার তারতম্যের ওপর ভিত্তি করে ১০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। এ জন্য তাঁরা কৃষকদের মালচিং পদ্ধতি ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করছেন।