চার মাসে ৭ ট্রেন লাইনচ্যুত

রেললাইনের অধিকাংশ স্লিপার নড়বড়ে। রেল ও স্লিপারের সঙ্গে আটকানোর ফিসপ্লেট নেই। অনেক জায়গায় নেই নাটবল্টুও।

যাত্রীবাহী ট্রেনের দুটি বগি লাইনচ্যুত হয়েছে। এর মধ্যে একটি উল্টে পড়ে আছে। গত সোমবার গাজীপুর মহানগরীর ধীরাশ্রম এলাকায়
ছবি: প্রথম আলো

গাজীপুরে গত চার মাসে ট্রেন লাইনচ্যুত হয়েছে সাতবার। এর মধ্যে ছয়টি যাত্রীবাহী এবং একটি তেলবাহী ট্রেন। সব৴শেষ গত রোববার রাতে ঢাকা থেকে পঞ্চগড়গামী দ্রুতযান এক্সপ্রেস ট্রেনের দুটি বগি লাইনচ্যুত হয়। এর মধ্যে একটি বগি লাইনচ্যুত হয়ে উল্টে যায়। অল্পের জন্য প্রাণে বাঁচে যাত্রীরা। বারবার লাইনচ্যুতির ঘটনায় একদিকে যেমন ঘটছে হতাহতের ঘটনা, অন্যদিকে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে সৃষ্টি হচ্ছে দুর্ভোগ।

রেলে নিয়মিত যাতায়াতকারী ব্যক্তি ও স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, গাজীপুর থেকে টঙ্গী পর্যন্ত রেললাইন ডাবল করার কাজ চলছে। এ কাজ করতে গিয়ে রেললাইনের এক পাশের মাটি খনন করতে হচ্ছে, যার ফলে পাথর সরে স্লিপারগুলোর নিচে ফাঁকা হয়ে গেছে। এ ছাড়া রেলপথ নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় না। এসব কারণে অনিরাপদ হয়ে উঠেছে রেলপথ ও ট্রেনযাত্রা।

রেলওয়ের কর্মকর্তারা জানান, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ধীরাশ্রম স্টেশনে রোববার দিবাগত রাত সোয়া নয়টার দিকে দ্রুতযানের সঙ্গে পদ্মা এক্সপ্রেস ট্রেনের ক্রসিং হয়। ক্রসিং শেষে পঞ্চগড়গামী দ্রুতযান যাত্রা শুরু করলে ২ নম্বর লাইন থেকে মূল লাইনে ওঠার সময় ৩টি বগি লাইনচ্যুত হয়। এর মধ্যে একটি বগি উল্টে পড়ে যায়। এতে কমপক্ষে ১২ যাত্রী আহত হয়। দুর্ঘটনার কারণে ১১ ঘণ্টা ঢাকার সঙ্গে ময়মনসিংহসহ দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলে ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকে।

যেখানে প্রতিদিন রেললাইন পরীক্ষা করা প্রয়োজন, সেখানে মাসেও একবার রেললাইন পরীক্ষা করা হয় না।
ফান্তাহিল আলিম, প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, ঢাকা-গাজীপুর ট্রেন পেসেঞ্জার ফোরাম

গত সোমবার ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, রেললাইনের অধিকাংশ স্লিপার নড়বড়ে। রেল ও স্লিপারের সঙ্গে আটকানোর ফিসপ্লেট নেই। অনেক জায়গায় নেই নাটবল্টুও। যেগুলো আছে, সেগুলোও ঢিলেঢালা। প্রত্যক্ষদর্শী ব্যক্তিরা জানান, রোববার ট্রেন লাইনচ্যুত হওয়ার পর চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয় যাত্রীদের। দীর্ঘ সময় পরও রেল কর্তৃপক্ষ যাত্রীদের কোনো খোঁজখবর নেয়নি।

ধীরাশ্রম এলাকার বাসিন্দা আবদুল হাই বলেন, ধীরাশ্রম থকে গাজীপুর স্টেশন পর্যন্ত প্রায়ই লাইন থেকে ট্রেন পড়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। লাইনগুলো মেরামত না করায় নাটবল্টুগুলোও নড়বড়ে হয়ে আছে।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, গত ২৫ জুলাই জয়দেবপুর-যমুনা সেতু রেললাইনের গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার বক্তারপুর এলাকায় রাজশাহীগামী এক্সপ্রেসের একটি বগি লাইনচ্যুত হয়। এতে প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকে। ৩০ জুলাই গাজীপুরের সালনা এলাকায় সুন্দরবন এক্সপ্রেসের দুটি বগি লাইনচ্যুত হয়।

৭ আগস্ট দুপুরে জামালপুর থেকে ঢাকাগামী ব্রহ্মপুত্র এক্সপ্রেসের ইঞ্জিনের হুক ভেঙে শ্রীপুর স্টেশনে আটকা পড়ে। এ ঘটনায় পাঁচ ঘণ্টা ট্রেনটি শ্রীপুর স্টেশনে আটকা পড়ে থাকে। গত ৫ জুন দুপুরে গাজীপুরের জয়দেবপুর স্টেশনে প্রবেশের সময় মালবাহী ট্রেনের কয়েকটি বগি লাইনচ্যুত হয়। এতে ঢাকার সঙ্গে উত্তরবঙ্গের ট্রেন চলাচল প্রায় তিন ঘণ্টা বন্ধ থাকে। জয়দেবপুর লেভেল ক্রসিংয়ে সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

গত ১৬ জুন দুপুরে গাজীপুরের টঙ্গী রেলস্টেশনে একটি তেলবাহী ট্রেনের দুটি বগি লাইনচ্যুত হয়। এতে ঢাকার সঙ্গে সিলেট-চট্টগ্রাম রুটের ট্রেন চলাচল সাময়িক ব্যাহত হয়। ১৪ জুন সকালে গাজীপুরের রাজেন্দ্রপুর এলাকায় ঢাকাগামী ভাওয়াল এক্সপ্রেস ট্রেনের একটি বগি লাইনচ্যুত হয়ে ঢাকা-ময়মনসিংহ লাইনে রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। গত ২৮ মে গাজীপুরের কালিয়াকৈরের মৌচাক এলাকায় পঞ্চগড় এক্সপ্রেসের ইঞ্জিনসহ দুটি বগি লাইনচ্যুত হয়। এতে ঢাকার সঙ্গে উত্তরবঙ্গের ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বগিগুলো উদ্ধারের ১০ ঘণ্টা পর ওই পথে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়।

ঢাকা-গাজীপুর ট্রেন পেসেঞ্জার ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ফান্তাহিল আলিম বলেন, যেখানে প্রতিদিন রেললাইন পরীক্ষা করা প্রয়োজন, সেখানে মাসেও একবার রেললাইন পরীক্ষা করা হয় না। কোথাও সমস্যা থাকলেও মেরামত করা হয় না।

তবে এসব অভিযোগ মানতে নারাজ জয়দেবপুর রেলওয়ে জংশনের মাস্টার রেজাউল ইসলাম। তিনি বলেন, ডাবল লাইনের কাজ চলমান আছে। একই সঙ্গে রক্ষণাবেক্ষণও করা হয়। ট্রেন লাইচ্যুত নানা কারণে হয়ে থাকে।