টানা বৃষ্টি ও অমাবস্যার উচ্চ জোয়ারে প্লাবিত ভোলার চরাঞ্চল, ঘরের চালে আশ্রয়
জোয়ার কখন আসবে, কখন নামবে—এই অপেক্ষায় কাটছে ভোলার হাজারো মানুষের দিন–রাত। অমাবস্যার প্রভাবে টানা তিন দিনের অস্বাভাবিক উচ্চ জোয়ার উপকূলের মানুষের জীবন ও জীবিকাকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। দখিনা বাতাসের প্রভাবে জোয়ারের পানি আরও বেড়ে যাওয়ায় জেলার ১২টি ইউনিয়ন ও ৭৪টি চরাঞ্চলের হাজারো মানুষ দিনে দুবার প্লাবিত হচ্ছে। পাশাপাশি প্লাবিত হচ্ছে ঘরবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাটবাজার, মাছের ঘের, কৃষিজমি ও সড়ক। পানি ঢুকছে ঘরে, মানুষ আশ্রয় নিচ্ছে টিনের চাল কিংবা ঘরের মাচায়।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা যায়, সদর উপজেলার রাজাপুর, কাচিয়া, ভেলুমিয়া ও ভেদুরিয়া ইউনিয়নের অংশবিশেষ; দৌলতখান উপজেলার মদনপুর, মেদুয়া, ভবানীপুর ও হাজিপুর; তজুমদ্দিন উপজেলার সোনাপুর, মলংচরা ও চাঁদপুর; মনপুরা উপজেলার কলাতলী, মনপুরা, হাজিরহাট, উত্তর ও দক্ষিণ সাকুচিয়া; লালমোহন উপজেলার পশ্চিম চর উমেদ এবং চরফ্যাশন উপজেলার ঢালচর, কুকরিমুকরি ও মুজিবনগর ইউনিয়নের ৭৪টি চর ও বাঁধের বাইরের নিম্নাঞ্চল গত মঙ্গলবার রাত থেকে জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হচ্ছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানিয়েছে, আগামী রোববার পর্যন্ত এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকতে পারে। ভোলা পাউবো–১–এর নির্বাহী প্রকৌশলী জিয়া উদ্দিন আরিফ জানান, আজ শুক্রবার বিকেল চারটার দিকে দৌলতখানের মেঘনা নদীতে জোয়ারের উচ্চতা ছিল ৩ দশমিক ৩৬ মিটার, যেখানে বিপৎসীমা ২ দশমিক ৯৫ মিটার। সন্ধ্যার দিকে জোয়ারের উচ্চতা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাউবো ডিভিশন–২–এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আসাফউদ্দৌলা বলেন, গত বুধবার ও গতকাল বৃহস্পতিবার জোয়ার বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। আগামী শনি ও রোববার পর্যন্ত জোয়ারের উচ্চতা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এরপর পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।
সরেজমিনে দেখা যায়, জোয়ারের কারণে ইলিশা ফেরিঘাট ও লঞ্চঘাটে যাত্রী ও পণ্যবাহী চালকদের দুর্ভোগ দেখা দিয়েছে। সদর উপজেলার ইলিশা ফেরিঘাট ও লঞ্চঘাট এলাকা জোয়ারের পানিতে তলিয়ে গেছে। যাত্রীরা পানির মধ্যে হেঁটে, কেউবা নৌকায় চড়ে লঞ্চে ওঠানামা করছেন। ফেরিতে যানবাহন ওঠানামাও ব্যাহত হচ্ছে। ইলিশা ফেরিঘাটের ব্যবস্থাপক কাওসার আহমেদ বলেন, উচ্চ জোয়ারের কারণে ভোলার ইলিশা ও লক্ষ্মীপুরের মজু চৌধুরীর হাট ফেরিঘাটে ফেরিতে গাড়ি ওঠানামা বন্ধ থাকে। ফলে পণ্যবাহী যানবাহনের চালকেরা খুব সমস্যায় পড়ছেন।
ভোলা সদর উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নের চর মোহাম্মদে দেখা যায়, পাঁচ শতাধিক পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। বাড়ির পুরুষ সদস্যরা ইলিশা নদীর তীরে চর মোহাম্মদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। তাঁরা জানান, বাড়ির নারী ও শিশুরা ঘরের মাচার ওপর অবস্থান করছে। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে বন্যা নিয়ন্ত্রণে স্থায়ী বাঁধের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
সদরের কন্দ্রকপুর ও দক্ষিণ রাজাপুর এলাকা ঘুরে জানা যায়, পানির কারণে আমন ধানের বীজতলা, আধা পাকা আউশ ধান, লাউখেত, সবজিখেত ও মাছের পুকুর ডুবে আছে; ডুবে আছে রাস্তাঘাট। ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা করছেন কৃষকেরা। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. কামরুল হাসান বলেন, টানা বৃষ্টি ও উচ্চ জোয়ারের পানিতে আমনের বীজতলা, সবজি ও পানের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
ভোলার রাজাপুর ও দৌলতখানে একই পরিস্থিতির তথ্য পাওয়া গেছে। দৌলতখানের মেঘনার মধ্যে জেগে ওঠা মদনপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম চৌকিদার ও ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন সিকদার জানান, জোয়ারের পানিতে রাস্তাঘাট প্লাবিত হচ্ছে। ফলে জমিতে ধান চাষ ব্যাহত হচ্ছে, খেতখামারের কাজ বন্ধ থাকায় মানুষের কর্মসংস্থান কমে গেছে। মাঠে পানি থাকায় গবাদিপশুর জন্য ঘাসের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।
মনপুরা উপজেলায় চরম দুর্ভোগের তথ্য পাওয়া গেছে। কলাতলী ইউনিয়নের মনির বাজারের পল্লিচিকিৎসক মো. আল আমিন মুঠোফোনে প্রথম আলোকে জানান, দখিনা প্রবল বাতাসে জোয়ারের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় মেঘনার মধ্যে জেগে ওঠা কলাতলী ইউনিয়নের কলাতলী ও কাজীর চর মৌজা মঙ্গলবার রাত থেকেই প্লাবিত হচ্ছে। এতে প্রায় ২০ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি বলেন, টানা বৃষ্টির পর উচ্চ জোয়ারে হাটবাজার, স্কুলের মাঠ, মাছঘাট, খেয়াঘাট, আমনের খেত ও বসতবাড়ি পানিতে তলিয়ে গেছে। শিশুরা পানির মধ্যে স্কুলে যাতায়াত ও খেলাধুলা করতে গিয়ে পানিবাহিত রোগের ঝুঁকিতে পড়ছে।
কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উপজেলার ১ নম্বর মনপুরা ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব পাশের আশ্রয়ণ প্রকল্পে শতাধিক ঘর প্লাবিত হয়েছে। বুকসমান পানির মধ্যে অনেকে ঘরের টিনের চালে আশ্রয় নিয়েছেন। নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে অনেক পরিবার উঁচু রাস্তা, ভবন ও অন্যান্য স্থানে চলে যাচ্ছে।
মনপুরার ষাট কলোনির বাসিন্দা মো. ইয়াছিন, মো. কামাল, সখিনা বিবিসহ একাধিক ব্যক্তি জানান, দিন ও রাতে দুই দফা জোয়ারের পানিতে তাঁদের এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। রাতের জোয়ারে পরিবারের সবাইকে নিয়ে ঘরের টিনের চালে আশ্রয় নিতে হয়। কখন জোয়ার আসবে, আর কখন নামবে—এই অপেক্ষার মধ্যেই কাটছে তাঁদের দিন–রাত।
রামনেওয়াজ ঘাট এলাকার বাসিন্দা নাহিদ ইসলাম, মো. মোস্তফা ও মমিন তালুকদার বলেন, তিন দিন ধরে রামনেওয়াজ ঘাট ও মাছঘাট এলাকা জোয়ারের পানিতে তলিয়ে রয়েছে। এতে হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে।
চরফ্যাশনেও দুর্ভোগ দেখা দিয়েছে। উপজেলার ঢালচর ইউনিয়নের মৎস্য ব্যবসায়ী শাহে আলম ফরাজী বলেন, জোয়ারের কারণে মানুষের ঘরবাড়ি ও গবাদিপশু ভেসে যাওয়ার মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে এবং মাছের ঘের তলিয়ে গেছে। পূর্ব ঢালচরে একটি কিল্লা (আশ্রয়কেন্দ্র) নির্মাণ করা হলেও সেটি বসতি এলাকার বিপরীত পাশে খালের ওপারে। খালের ওপর কোনো সেতু নেই। ফলে সাধারণ মানুষ প্রয়োজনে সেখানে যেতে পারে না।