সাপের কামড়ে মৃত নারীকে ‘জীবিত’ করতে কবরের পাশে ওঝার ঝাড়ফুঁক

সখীপুরে সাপের কামড়ে মারা যাওয়া নারীকে দাফনের দুই দিন পর কবরের পাশে ঝাড়ফুক করছেন ওঝা (পাঞ্জাবি পরিহিত)। আশপাশে উৎসুক লোকজনের ভিড়ছবি: ভিডিও থেকে সংগৃহীত

টাঙ্গাইলের সখীপুরে সাপের কামড়ে মারা যাওয়া এক নারীকে দাফনের দুই দিন পর ‘জীবিত’ করতে পারবেন দাবি করে কবরের পাশে ঝাড়ফুঁক করেছেন এক ওঝা। হাসনা বেগম (৫৮) নামের ওই নারীর কবরের এক পাশে সামান্য খুঁড়ে গন্ধ শুঁকে ওঝা দাবি করেন, লাশে পচন না ধরলে ঝাড়ফুঁকের মাধ্যমে তাঁকে ‘জীবিত’ করা সম্ভব। গতকাল শনিবার উপজেলার চতলবাইদ গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।

কবরের পাশে ওঝার ঝাড়ফুঁক ও গন্ধ শোঁকার একাধিক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় কৌতূহল ও চাঞ্চল্য তৈরি হয়। ওই ওঝার নাম গাজী মিয়া। তাঁর বাড়ি জেলার বাসাইল উপজেলার কৈলাণপুর গ্রামে।

মৃত হাসনা বেগমের বাড়ি সখীপুর উপজেলার হতেয়া-ভাতকুড়াচালা এলাকায়। গত বৃহস্পতিবার বিষধর সাপ কামড় দেওয়ার পর স্বজনেরা তাঁকে সখীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। পরে উপজেলার চতলবাইদ গ্রামে তাঁর মেয়ে খালেদা বেগমের বাড়ির পাশে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, সাপে কাটার খবর পেয়ে চতলবাইদ গ্রামে আসেন গাজী মিয়া নামের ওই ওঝা। তিনি দাবি করেন, হাসনা বেগম মারা যাননি। গতকাল তিনি কবরের এক পাশে সামান্য সুড়ঙ্গের মতো করে খুঁড়ে গন্ধ শোঁকেন। পরে দাবি করেন, তিনি তেলের গন্ধ পেয়েছেন। তাঁর দাবিতে উৎসুক এলাকাবাসী কবরের পাশে গিয়ে গন্ধ শোঁকার চেষ্টা করেন।

মৃত হাসনা বেগমের মেয়ে খালেদা বেগমকে ওই ওঝা বলেন, আগামী মঙ্গলবার তিনি আবার কবরের পাশে আসবেন। তখন কবরের গন্ধ শুঁকে যদি দুর্গন্ধ না পাওয়া যায়, তাহলে মরদেহ উত্তোলন করে ঝাড়ফুঁকের মাধ্যমে সাপের বিষ নামিয়ে তাঁকে জীবিত করা সম্ভব। তবে লাশে পচন ধরে গেলে আর জীবিত করা সম্ভব হবে না।

এ ঘটনার সাড়ে তিন মিনিটের একটি ভিডিও প্রথম আলোর হাতে এসেছে। ভিডিওতে দেখা যায়, পাঞ্জাবি-লুঙ্গি পরিহিত এক ব্যক্তি হাসনা বেগমের কবরের ওপর প্লাস্টিকের ব্যাগ থেকে কিছু বের করে ছিটাচ্ছেন। কবরের চারপাশে স্থানীয় কয়েকজন ভিড় করছেন। কিছুক্ষণ পর তিনি কবরের এক পাশে বাঁশ দিয়ে সামান্য সুড়ঙ্গের মতো করেন। এরপর তিনি সেখানে গন্ধ শোঁকেন এবং উপস্থিত লোকজনকে গন্ধ শুঁকতে বলেন। পরে কয়েকজন সেখানে গন্ধ শোঁকেন।

খালেদা বেগম প্রথম আলোকে বলেন, ‘গতকাল আমার মধ্যে আশা তৈরি হয়েছিল। মাকে আবার জীবিত পাওয়ার আশায় অপেক্ষাও করছিলাম। কিন্তু আধা ঘণ্টা আগে ওঝা আমাকে ফোন করে জানিয়েছেন, রাতে ধ্যানে বসে তিনি দেখেছেন, মা বেঁচে নেই। এখন আশাহত হলাম।’

আজ রোববার বেলা সোয়া ১১টার দিকে খালেদা বেগমের কাছ থেকে নম্বর নিয়ে পরিচয় গোপন রেখে ওঝা গাজী মিয়ার মুঠোফোনে কথা বলেন এই প্রতিবেদক। তিনি বলেন, ‘গতকাল তিনি (হাসনা বেগম) জীবিত ছিলেন। এখন ওই রোগীকে বাঁচানো সম্ভব নয়। তিনি চলে গেছেন।’ এর বেশি কিছু বলতে তিনি রাজি হননি।

সখীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা রেহেনা পারভীন আজ সকালে প্রথম আলোকে বলেন, ‘একজন মানুষকে চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে মৃত ঘোষণা করেছেন এবং তাঁকে কবরও দেওয়া হয়েছে। এরপর ওই নারী আবার বেঁচে উঠবেন—এমন দাবি হাস্যকর ও অকল্পনীয়। ওই ওঝাকে পুলিশের হাতে সোপর্দ করা দরকার।’ তিনি বলেন, সাপে কামড়ে মারা যাওয়া রোগীকে কবর দেওয়ার পর ঝাড়ফুঁক করে জীবিত করার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। এ ধরনের প্রচারণায় বিভ্রান্ত না হয়ে সাপে কাটার পর দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।