বাজারের জমি ‘বাড়ি’ শ্রেণিভুক্ত করে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ, মানববন্ধন

বাজারের জমিকে বাড়ি শ্রেণিভুক্ত করে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণের প্রতিবাদে মানববন্ধন। সোমবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে নেত্রকোনা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনেছবি: প্রথম আলো

নেত্রকোনায় মদনপুর বাজারের জমিকে ‘বাজার’ বা ‘দোকান’ শ্রেণির পরিবর্তে ‘বাড়ি’ শ্রেণিভুক্ত করে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণের প্রতিবাদে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ হয়েছে। আজ সোমবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাবাসীর ব্যানারে এ কর্মসূচি পালন করা হয়।

ঘণ্টাব্যাপী কর্মসূচি চলাকালে বক্তব্য দেন মদনপুর এলাকার বাসিন্দা সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক তাজ উদ্দিন ফারাস, সুমন ফারাস, সেলিকুর রহমান, সৈয়দ নাজিম প্রমুখ।

এ সময় বক্তারা বলেন, সদর উপজেলার মদনপুর মৌজার যে জমিগুলো সড়ক সম্প্রসারণ প্রকল্পের আওতায় অধিগ্রহণ করা হয়েছে, তার বড় একটি অংশ বহু বছর ধরে হাটবাজার ও ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। সেখানে রয়েছে স্থায়ী দোকানপাট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, ধান-চালের আড়ত, বিভিন্ন মিল, সাপ্তাহিক হাট ও গরুর বাজার। অথচ এসব বাণিজ্যিক জমিকে বাজার বা দোকান শ্রেণিতে মূল্যায়ন না করে বাড়ি শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

স্থানীয় বাসিন্দা, সড়ক ও জনপথ এবং জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ শাখা সূত্রে জানা গেছে, নেত্রকোনা-কেন্দুয়া-আঠারোবাড়ি-ঈশ্বরগঞ্জ মহাসড়ক সম্প্রসারণ প্রকল্পের জন্য ভূমি অধিগ্রহণের কাজ চলছে। ৪১ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য সড়কটির নেত্রকোনার শহরের বনোপাড়া এলাকা থেকে কেন্দুয়া পর্যন্ত ২৬ কিলোমিটার অংশে প্রায় ৯২ একর জমি অধিগ্রহণের জন্য নির্ধারণ করা হয়। এ জন্য প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২৫০ কোটি টাকা। এর মধ্যে নেত্রকোনা সদরের অংশে ১২৯ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে সদর উপজেলার মদনপুর বাজারে সড়কের ৮২০ মিটার অংশের দুই পাশে অবস্থিত অন্তত ৬২৫টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানকে ‘দোকান’ শ্রেণির পরিবর্তে ‘বাড়ি’ শ্রেণিভুক্ত করে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করা হয়েছে। এর প্রতিবাদে বছরখানেক আগে ক্ষতিগ্রস্তরা জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। কিন্তু কাজ না হওয়ায় একই দাবিতে আজ মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করা হয়। পরে জেলা প্রশাসকের কাছে একটি স্মারকলিপি জমা দেন আন্দোলনকারীরা।

মানববন্ধনে ক্ষতিগ্রস্ত ভূমিমালিক ও ব্যবসায়ী তাজ উদ্দিন ফারাস বলেন, বাজার এলাকার জমির প্রচলিত মূল্য সাধারণ বাড়ি বা ভিটার জমির তুলনায় অনেক বেশি। বর্তমানে প্রতি শতাংশ ভূমির দাম ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা। এ ছাড়া বাজার পার হয়ে রাস্তার দুই পাশের জমিও প্রায় ২ লাখ টাকা শতক। কিন্তু সরকারি হিসাবে ধরা হয়েছে শতকপ্রতি মাত্র ১৩ হাজার টাকা। দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা পরিচালনার কারণে এসব জমির মালিকদের সরকারকে অধিক হারে ভূমি উন্নয়ন কর ও অন্যান্য রাজস্বও দিতে হয়। কিন্তু অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে সেই বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।

ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী সুমন ফারাস জানান, মদনপুর বাজারটি ঐতিহাসিকভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র। হজরত শাহ সুলতান কমর উদ্দিন রুমি (রহ.)-এর মাজারকে কেন্দ্র করে এখানে প্রতিদিন বিপুল মানুষের সমাগম ঘটে। ফলে বাজার এলাকার জমির বাণিজ্যিক গুরুত্ব ও মূল্য সাধারণ আবাসিক জমির তুলনায় অনেক বেশি। ১৯৮২ সালের বিআরএস রেকর্ডে অনেক ভূমি শ্রেণি হিসেবে দোকান অন্তর্ভুক্ত আছে। কিন্তু অধিগ্রহণে তা না দেখে শুধু বাড়ি দেখানো হয়েছে।

সুমন ফারাস বলেন, ‘এতে করে আমরা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। একে তো সরকার নির্ধারিত ভূমির মূল্য কম, অন্যদিকে বাড়ি শ্রেণিতে মূল্যায়ন করায় ভূমির মালিক ও ব্যবসায়ীরা মারাত্মক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন। তাই আমরা সরকারের কাছে দাবি জানাই পুনঃ শ্রেণিবিন্যাস করে মূল্য নির্ধারণ করা হোক।’

এ বিষয়ে সওজের নেত্রকোনা কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহমুদ আলনূর সালেহীন প্রথম আলোকে বলেন, সড়কের সংস্কারকাজ আড়াই বছর আগে শেষ হয়েছে। ভূমি অধিগ্রহণের কাজটি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এলএ শাখা করে থাকে। এ বিষয়ে ভূমির মালিকেরা যদি কোনো রকম আপত্তি করে থাকেন, তবে বিষয়টি জেলা প্রশাসক দেখবেন।

জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, বিষয়টি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দেখতে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সুখময় সরকারকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। জমির প্রকৃত শ্রেণি না দেখিয়ে যদি অন্য কোনো শ্রেণি দেখানো হয়, তবে ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।