বিরল ও বিপন্ন ৪৩ গাছ তাঁর সংগ্রহে
শখের বশে দুর্লভ গাছ পেলেই সংগ্রহ করে বাড়িতে রোপণ করতেন মাহবুবুল ইসলাম। ধীরে ধীরে তা নেশায় পরিণত হয়। যেখানেই বিরল প্রজাতির গাছের সন্ধান পান, সেখানেই ছুটে যান। এভাবে বৃক্ষ সংগ্রহ করে প্রায় সাড়ে ৩০০ বিপন্ন ও দুর্লভ বৃক্ষের বাগান গড়ে তুলেছেন তিনি। কয়েক বছর ধরে এই বাগানে তিনি প্রকৃতির পাঠশালা চালু করেছেন। যেখানে শিশুদের পরিচয় ঘটে নানা প্রজাতির গাছের সঙ্গে। বৃক্ষরোপণ ও পরিচর্যা বিষয়ে হাতে–কলমে প্রশিক্ষণ পান শিশুসহ আগ্রহী মানুষেরা।
মাহবুবুল ইসলাম সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলার বাজার ভদ্রঘাট শেখপাড়ার বাসিন্দা। কর্মসূত্রে রাজশাহীতে থাকেন। পেশায় একজন বেসরকারি ব্যাংক কর্মকর্তা। তবে শুক্র–শনিবারসহ ছুটির দিনে বাড়িতে এসে সময় দেন বাগানে। সরকারি চাকরিজীবী বাবা মো. আবুল আজাদ শেখ ২০১৬ সালে মারা গেছেন। মা তাকমিনা খাতুন বাড়িতেই থাকেন। স্থানীয় শামছুন-মহসিন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০০৪ সালে এসএসসি পাশ করেন মাহবুবুল। রাজশাহীর একটি কলেজে উচ্চমাধ্যমিকের পাঠ চুকিয়ে বেসরকারি একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন।
সিরাজগঞ্জ শহর থেকে নলকা মোড় যাওয়ার পথে হাতের বাঁয়ে পড়ে ভদ্রঘাট বাজার। বাজার থেকে একটু সামনে গিয়ে আবারও বামে ঘুরে দক্ষিণ দিকে গেলেই চোখে পড়ে ছায়া সুনিবিড় শান্ত পরিবেশ। এ গ্রামেই মাহবুবুল ইসলাম গড়ে তুলেছেন অনন্য এক বাগান। পাখির কলকাকলিতে মুখর থাকে চারপাশ।
বিরল ও বিপন্ন ৪৩ বৃক্ষ তাঁর সংগ্রহে
২০০৩ সালে ইউক্যালিপটাসগাছের অপকারিতার কথা জেনে দেশি গাছ বাগানে রোপণ শুরু করেছিলেন বলে জানালেন মাহবুবুল ইসলাম। গাছের প্রতি তাঁর আগ্রহ বাড়িয়ে দেন রাজশাহীর তৎকালীন বন কর্মকর্তা আবুল কাশেম। ২০১০ সালে তিনি মাহবুবুলকে সরবরাহ করেন ৭০০ সেগুনের চারা। এরপর দুর্লভ বৃক্ষের সন্ধানে নেমে পড়েন মাহবুবুল ইসলাম। প্রথমে তিনটি সুন্দরীগাছের চারা রোপণের মাধ্যমে বাগান শুরু করেন। ১৫ বছরের ব্যবধানে এখন তাঁর ৬ বিঘা জমির বাগানে দেশি–বিদেশি ৩৪৫ প্রজাতির গাছ রয়েছে। ২০১২ সালে বন বিভাগের ঘোষিত বিরল ও বিপন্ন ৪৫ প্রজাতির বৃক্ষের মধ্যে ৪৩টি তাঁর সংগ্রহে রয়েছে বলে জানান তিনি।
গত ১০ মে সকালে বাগানে ঢুকতেই পাখালির কলরব ভেসে আসে। ঘুরে ঘুরে বাগানের বিরল ও বিপন্ন প্রজাতির নানা বৃক্ষের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন মাহবুবুল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বৈলাম, গর্জন, ঢাকিজাম, চাপালিশ, তেলসুর, নাগেশ্বর, মহুয়া, বান্দরহোলা, গুটগুটিয়া, গান্ধীগজারি, বুদ্ধনারিকেল, নাগলিঙ্গম, কাঠবাজনা, তিতপাই, খুদে বড়লা, জামালগোটা, মণিরাজ, রাজ অশোক, বঁইচি ইত্যাদি।
বৈলামগাছের বিষয়ে মাহবুবুল জানালেন, বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামে পাওয়া যায় এই গাছ। বাংলাদেশের ২০১২ সালের বন্য প্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনের তফসিল-৪ অনুযায়ী, এ প্রজাতি সংরক্ষিত। বাংলাদেশে সবচেয়ে উঁচু বৃক্ষ বৈলাম। এ গাছ ২০০-৩০০ ফুট লম্বা হয়। ভুবনচিল বাসা বাঁধে এ বৃক্ষের ডালে ডালে।
বিরল সব গাছ সংগ্রহ করতে গিয়ে নানা রকম অভিজ্ঞতার কথা তুলে মাহবুবুল ইসলাম বলেন, একবার কক্সবাজারের মালুমঘাট এলাকায় গাছ আনতে গিয়ে বুনো হাতির তাড়া খেয়েছিলেন। আরেকবার পঞ্চগড় থেকে শালগাছ নিয়ে নলকা বাসস্ট্যান্ডে ফিরতে মাঝরাত হয়ে গিয়েছিল। ঝুমবৃষ্টিতে কয়েক ঘণ্টা আটকে ছিলেন। অল্পের জন্য বজ্রপাত থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন সেদিন।
প্রকৃতির এক পাঠশালা
বৃক্ষ সংগ্রহ, রোপণ ও পরিচর্যার পাশাপাশি ২০২০ সালে বাগানে চালু করেছেন পরিবেশ ও প্রকৃতি পাঠশালা। শিশুশিক্ষার্থী ও আগ্রহী মানুষদের জন্য উন্মুক্ত এ পাঠশালায় প্রতি শুক্র ও শনিবার বৃক্ষ নিয়ে চলে ব্যতিক্রমী পাঠদান।
বিরল ও বিপন্ন প্রজাতির নানা ধরনের বৃক্ষের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার এ উদ্যোগে প্রথম দিকে আগ্রহীর সংখ্যা কম থাকেলও পরবর্তী সময়ে অনেকেই আসছে বলে জানান মাহবুবুল ইসলাম। এখন পর্যন্ত বাজার ভদ্রঘাট ও আশপাশের এলাকার ৭০ জন খুদে শিক্ষার্থী তালিকাভুক্ত হয়ে এই পাঠশালায় পাঠ নিয়েছে। বর্তমানে প্রতি সপ্তাহেই এখানে পাঠ নিতে আসে ১০ থেকে ১৫ জন করে শিক্ষার্থী।
মাহবুবুল ইসলাম জানান, শিশুদের সব ধরনের বৃক্ষের সঙ্গে পরিচয় করানো, বৃক্ষরোপণ ও তার পরিচর্যার বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য জানানো, বৃক্ষের উপকারিতা, কোন কোন বৃক্ষ পরিবেশের জন্য উপকারী তা জানানো, পরিযায়ী পাখি এলে তাদের শিকার না করা, কোন কোন পোকামাকড় উপকারী তা জানানো, ব্যাঙ ফসলের জন্য অপকারী নয়, বরং উপকারী; তা জানানো এ পাঠশালার লক্ষ্য।
পাঠশালায় আসা স্থানীয় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অহনা শেখ বলে, ‘আমি এখন বান্দরহোলা, কর্পূর, চন্দনসহ অনেক গাছ চিনতে পারি। এ পাঠশালায় এসে গাছের উপকারিতা সম্পর্কে জানতে পারছি।’
পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী কাওছার হোসেন বলেছে, ‘গাছে কখন কোন ফুল ফোটে, কোন পাখি আসে, তা আমাদের বলা হয়। চিনে রাখি বিভিন্ন শ্রেণির গাছের নাম।’
বৃক্ষ নিয়ে জাদুঘর প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন
বিরল বৃক্ষের বাগান গড়ে তুলে ২০২২ সালে জাতীয় কৃষি পুরস্কার (১৪২৬ বঙ্গাব্দের জন্য) পেয়েছেন মাহবুবুল ইসলাম। ফারাজ আইয়াজ স্মৃতি পরিষদের সম্মাননা, নবান্ন কৃষি খামার পদকসহ আরও অনেক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তিনি। বিভিন্ন সময় তাঁর বাগান দেখতে এসেছেন সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, শিক্ষার্থী, বিদেশি নাগরিকসহ বৃক্ষপ্রেমী অনেক মানুষ।
মাহবুবুলের এমন কর্মকাণ্ডে গর্বিত পরিবার ও এলাকার মানুষ। রায়গঞ্জ উপজেলা সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দেওয়ান শহিদুজ্জামানের কাছ থেকেও বিভিন্ন সময় গাছ সংগ্রহ করেছেন মাহবুবুল। দেওয়ান শহিদুজ্জামানও বিভিন্ন সময় বাগানটি পরিদর্শন করেছেন। তিনি বলেন, ‘বৃক্ষপ্রেমী মাহবুবুল ইসলামের জন্য আমরা গর্ববোধ করি।’
ভদ্রঘাট গ্রামের বাসিন্দা শাহ আলম বলেন, ‘বৃক্ষপ্রেমী মাহবুবুল ইসলামের সংগ্রহে থাকা বিরল ও বিপন্ন জাতের গাছ দেখতে প্রতিদিনই বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষজন আসেন।’
মাহবুবুল ইসলামের মা মোছা. তাকমিনা খাতুন বলেন, ‘ছেলেটা আমার বৃক্ষপ্রেমী। তবে তার ঝোঁক বিরল ও বিপন্ন বৃক্ষ সংগ্রহ করা। অনেক সংগ্রহ করেছে, এখনো করছে।’
মাহবুবুল ইসলাম বলেন, ‘কিছু গাছ টিকে থাকে ৬০০ থেকে ৭০০ বছর। বিরল ও বিপন্ন এসব বৃক্ষ নিয়ে কৃষি জাদুঘর ও গবেষণাগার হবে এখানে, এমন স্বপ্ন দেখি আমি। আমার অনুপস্থিতিতে এ প্রতিষ্ঠান চলবে, এমন উদ্যোগ নিতে চাই।’