কেউ চান, গ্রামের রাস্তা পাকা হোক। কেউ চান, ফসলের ন্যায্যমূল্য। কেউ চান বিপদে জনপ্রতিনিধিকে পাশে পেতে। কারও ভাষ্য, ভোটের আগে প্রার্থীদের কত প্রতিশ্রুতি, ভোটের পর আর তাঁদের দেখা মেলে না। আবার দ্রব্যমূল্যের চাপে সংসার চালাতে হিমশিম খাওয়া কেউ কেউ বলছেন, ভোটের চেয়ে তাঁদের কাছে এখন চাল, ডাল ও তেল কেনার চিন্তাই বড়।
ঠাকুরগাঁও-১ আসনের (সদর–রুহিয়া–ভূল্লী) উপনির্বাচনকে সামনে রেখে গতকাল বৃহস্পতিবার সদর উপজেলার পৌরসভার বিভিন্ন এলাকার ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের এমন মনোভাবের কথা জানা গেছে।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতির শপথ নেওয়ার পর আসনটি শূন্য ঘোষণা করা হয়। ২৯ অক্টোবর অনুষ্ঠিতব্য উপনির্বাচনে রাষ্ট্রপতির ছোট ভাই ও জেলা বিএনপির সভাপতি মির্জা ফয়সল আমীন (ধানের শীষ), জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরার সদস্য দেলাওয়ার হোসেন (দাঁড়িপাল্লা), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের খাদেমুল ইসলাম (হাতপাখা), বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আবদুল আলীম নিজামী (বটগাছ) ও বাংলাদেশ কংগ্রেসের হুসাইন মুহাম্মদ ওমর ফারুক (ডাব) প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এ আসনে মোট ভোটার ৫ লাখ ১১ হাজার ৬২৯ জন।
রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম বলেন, অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু পরিবেশে নির্বাচন আয়োজনের জন্য সর্বোচ্চ নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
মো. রফিকুল ইসলাম (৫৫) একসময় শহরের কালীবাড়ি বাজারে সবজির ব্যবসা করতেন। সেই ব্যবসায় টিকতে না পেরে এখন বাইসাইকেলে গ্রামে গ্রামে ঘুরে শুঁটকি বিক্রি করেন। তাঁর বাড়ি সদর উপজেলার আকচা ইউনিয়নের কাজীপাড়ায়। ঠাকুরগাঁও রোড এলাকায় তাঁর সঙ্গে কথা হয়। এলাকার বড় সমস্যা কী—জানতে চাইলে প্রথমে কিছুটা বিরক্ত হন রফিকুল। পরে বলেন, ‘ভোটের আগে প্রার্থীর লোকজন কত কথা কয়। ভোটের পর তাগো আর দেখা পাওয়া যায় না। সমস্যার কথা কইয়া লাভ কী?’
আগের নির্বাচনে ভোট দিয়েছিলেন কি না, জানতে চাইলে রফিকুল বলেন, ‘আগেরবার ভোট দিছি। ভোটটা ভালোই হইছিল; কিন্তু দলের লোকজন যেসব ওয়াদা করে ভোট নিল, তা পূরণ না করলে ভোটারের ভোট নিয়া আগ্রহ থাকে?’ কাকে ভোট দেবেন, তা অবশ্য স্পষ্ট করে বলতে চাইলেন না তিনি। শুধু বললেন, ‘কারা কেমন, তা দেইখা ভোট দিমু। দেশের মানুষের মনে শান্তি ফিরুক—এটাই তাঁর বড় প্রত্যাশা।’ রফিকুল বলেন, ‘দেশটা কেমন জানি চলতাছে। মানুষের মনে শান্তি নাই। সবার মনে শান্তি আসলেই খুশি আমি।’
শহরের গৌধুলী বাজার এলাকায় রিভারভিউ উচ্চবিদ্যালয়ের সামনে খাবারের হোটেল চালান আমেনা বেগম (৫৬)। তাঁর হোটেলে এলাকার বিভিন্ন পেশার মানুষের আড্ডা জমে। এখন সেই আড্ডার বড় একটি বিষয় ভোট।
শহরের শহীদ মোহাম্মদ আলী সড়কে রিকশাভ্যানে ফল বিক্রি করেন শাহ আলম (৫৭)। তাঁর চোখে এবার উপনির্বাচনকে ঘিরে উৎসবের আমেজ রয়েছে।
তবে ভোটের আগ্রহ সবার সমান নয়। দ্রব্যমূল্য অনেকের কাছে ভোটের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে। সদর উপজেলার শিবগঞ্জ এলাকার একটি পাটক্রয় কেন্দ্রের সামনে কয়েকজন ভ্যানচালকের আড্ডা। সেখানে ভোটের প্রসঙ্গ উঠতেই বাবুল হোসেন (৪৮) বলেন, ‘আট মাসের মধ্যে দুইটা ভোট হচ্ছে। প্রথমবারের ভোটে সরকার ঠিক করে দিছি। তাই এবারের ভোটে আগ্রহটা কম।’ আগ্রহ কমার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সব জিনিসের দাম বাড়ে গেছে। সংসার চালাতেই জান বাহির হয়ে যায়। তাই সংসারের ভাবনায় ভোটের কথা মনে আসে না।’ তারপরও তো ভোট দেওয়া উচিত, এ কথা বলতেই বাবুল পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘ভোট দিব, তবে কি চাল, ডাল, তেল, বিদ্যুৎসহ জিনিসপত্রের দাম কমবে? কমলে ভোট দিতে অবশ্যই যাব।’
বাবুলের কথায় যেন দ্রব্যমূল্যের চাপে থাকা মানুষের অন্য এক বাস্তবতা উঠে আসে। নির্বাচন নিয়ে আলোচনা থাকলেও নিত্যদিনের খরচ মেটানোর চিন্তা তাঁদের কাছে বেশি জরুরি।
শহরের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে শাক বিক্রি করেন ভন মোহন (৭০)। তাঁকে পাওয়া গেল কালীবাড়ি এলাকায়। নির্বাচনের প্রসঙ্গ উঠতেই তাঁর কণ্ঠে অন্য রকম উদ্বেগ। তিনি বলেন, ‘এইবার হামাক ধরে টানাটানি হচে। অনেকে কহছে, হামরা যাক ভোট দিমো, সেই জিতিবে। এইতানে ভয়ত আছু।’ কেন ভয় পাচ্ছেন—জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘হামার গ্রামের বেশির ভাগই আমাদের সম্প্রদায়ের। আমরা কাকে ভোট দিছি, তা কিন্তু বোঝা যাবে। ভোটে যে হারবে, তাঁরা যদি আসে আমাদের ধরে।’ তবে ভোট দিতে যাবেন বলে জানান ভন মোহন।
সদর উপজেলার কালীতলা এলাকার ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর পল্লিতে থাকেন মিনতি ঋষি (৫৭)। খেতখামারে শ্রম দিয়ে তাঁর সংসার চলে। কাকে ভোট দেবেন—এ প্রশ্নে তিনি বলেন, দশজনে যাকে ভালো বলবে, তাঁকেই ভোট দেবেন। বিপদে পাশে থাকাটাই তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।