মেরিন ড্রাইভের পাশেই টানাজালে ধরা পড়ছে কোটি টাকার মাছ

টানাজালে মাছ ধরছেন জেলেরা। গত শনিবার কক্সবাজারের টেকনাফ সৈকতেছবি: প্রথম আলো

ঢেউয়ের শব্দ আর জেলেদের হাঁকডাকে মুখর সমুদ্রসৈকত। জালের দুই প্রান্ত ধরে একসঙ্গে টান দিচ্ছেন ১০ থেকে ১৫ জন। কিছুক্ষণের মধ্যেই ‘ইউ’ আকৃতিতে সৈকতে উঠে আসছে সেই জাল। এসব জালে লাফাচ্ছে নানা প্রজাতির মাছ।

সম্প্রতি কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের শেষ অংশে দেখা যায় এ দৃশ্যের। জেলেরা জানান, ওই এলাকায় জাল ফেললেই ধরা পড়ছে ছুরি, চিংড়ি, পোপা, কাঁকড়াসহ বিভিন্ন প্রজাতির ছোট সামুদ্রিক মাছ। সৈকতের বালুচরে স্তূপ করে রাখার পর মুহূর্তেই এসব তরতাজা মাছ হাতবদল হচ্ছে। যাচ্ছে টেকনাফ, উখিয়া, কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন শহরে। সব মিলিয়ে দৈনিক বিক্রি হচ্ছে অন্তত কোটি টাকার মাছ।

কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের দৈর্ঘ্য ৮৪ কিলোমিটার। পুরো সড়কের পশ্চিম পাশেই সারি সারি ডিঙিনৌকার দেখা পাওয়া যায়। এসব নৌকা টানাজালে মাছ ধরার জন্য ব্যবহার করা হয়। জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বেশ কিছুদিন সাগরে মাছ ধরা পড়েছে কম। তবে গত বৃহস্পতিবার থেকে টেকনাফের খুনকারপাড়া, মহেশখালিয়াপাড়া, সাবরাং ও শাহপরীর দ্বীপের পশ্চিম সৈকতে টানাজালে বিপুল পরিমাণ ছোট মাছ ধরা পড়ছে।

‘চার মণ মাছ বিক্রি করে ২৪ হাজার টাকা পেয়েছি। একটি নৌকা দিনে চার থেকে পাঁচবার জাল টানতে পারে। সারা দিনের মাছ বিক্রি করে এক লাখ টাকা পর্যন্ত আয় সম্ভব।’
—ফিরোজ আহমদ, নৌকা মালিক, টেকনাফ।

সর্বশেষ গত শনিবার টেকনাফ উপজেলার মহেশখালিয়াপাড়ায় এক জেলের জালেই ধরা পড়ে ১০৯ মণ ছুরি মাছ। এসব মাছ বিক্রি হয়েছে ৮ লাখ ১৭ হাজার ৫০০ টাকা। জালটির মালিক ছিলেন টেকনাফ সদরের মহেশখালিয়াপাড়ার বাসিন্দা হাফেজ আহমদ। তিনিই এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

শনিবার সরেজমিনে জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রথমে নৌকা নিয়ে সাগরের প্রায় এক কিলোমিটার গভীরে জাল ফেলা হয়। জালের দুই প্রান্ত বালুচরে রেখে ঘণ্টাখানেক পর ১০ থেকে ১৫ জন জেলে একসঙ্গে টান দেন। এ কারণে এটি টানাজাল নামে পরিচিত। টান শুরু করার আধা ঘণ্টার মধ্যেই ‘ইউ’ আকৃতিতে জাল তীরে উঠে আসে। তখনই জালের ভেতর আটকা পড়ে মাছ লাফাতে দেখা যায়। পরে সেগুলো ঝুড়িতে ভরে বালুচরে আনা হলে দরদাম করে কিনে নেন ব্যবসায়ীরা।

বালুচর থেকে অটোরিকশা ও জিপে করে এসব মাছ বিভিন্ন হাটবাজারে সরবরাহ করেন ব্যবসায়ীরা। আবার অনেকেই শুঁটকির জন্য এসব মাছ নিয়ে যান; বিশেষ করে ছুরি মাছ। বাজারে আকারের ছুরি শুঁটকি কেজিতে ৭০০ থেকে ৯০০ টাকায় বিক্রি হয়। আড়াই কেজি কাঁচা ছুরি রোদে শুকালে এক কেজির বেশি শুঁটকি পাওয়া যায়।

কক্সবাজারের টেকনাফ সৈকতে সাগর থেকে ধরে আনা ছোটমাছ বাছাই করা হচ্ছে। গত শনিবার সকালে
ছবি-প্রথম আলো

খুনকারপাড়া সৈকতে একটু হাঁটতেই দেখা যায়, সৈকতে ফিরোজ আহমদের মালিকানাধীন একটি নৌকার জালে ধরা পড়েছে চার মণ ছোট মাছ। এর বেশির ভাগই ছুরি। অন্য মাছের মধ্যে রয়েছে ফাইস্যা, পোপা, কাঁকড়া ও চিংড়ি। মাছের সঙ্গে ছোট আকৃতির শতাধিক জেলিফিশও (নুইন্যা) দেখা গেছে। জানতে চাইলে ফিরোজ আহমদ (৪৫) বলেন, ‘৪ মণ মাছ বিক্রি করে ২৪ হাজার টাকা পেয়েছি। একটি নৌকা দিনে চার থেকে পাঁচবার জাল টানতে পারে। সারা দিনের মাছ বিক্রি করে এক লাখ টাকা পর্যন্ত আয় সম্ভব।’

মাছের খোঁজে এসব এলাকায় ভিড় করছেন ব্যবসায়ীরাও। মহেশখালিয়াপাড়ার আবুল কালামের একটি নৌকায় সকাল ৭টা থেকে ১০টার মধ্যে দুবার জাল টেনেছেন জেলেরা। সেখানে দুবারে ৩৬ হাজার টাকার মাছ পাওয়া গেছে। মাছগুলো কিনেছেন উখিয়ার জালিয়াপালং এলাকার ব্যবসায়ী সিরাজুল ইসলাম। জানতে চাইলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘এসব মাছ কুতুপালং রোহিঙ্গা বাজারে নেওয়া হবে। সেখানে প্রতি কেজি ১৩০ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি করা যাবে।’

এ এলাকার ঘাটে আরও ৯টি নৌকায় ছোট মাছ ধরতে দেখা গেছে জেলেদের। প্রতি টানে একেকটি নৌকার জালে ধরা পড়ছে ২০ থেকে ৫০ হাজার টাকার মাছ। সাবরাং ও শাহপরীর দ্বীপ সৈকতে আরও ২০ থেকে ২৫টি নৌকায় জেলেদের মাছ ধরতে দেখা গেছে। জেলেদের হিসাবে, সব মিলিয়ে সৈকতের বিভিন্ন এলাকা থেকে কোটি টাকার মাছ বাজারে যাচ্ছে।

একটি নৌকার মালিক আবুল গফুর (৫২) বলেন, তাঁর নৌকায় ১০ থেকে ১৫ জন জেলে–শ্রমিক কাজ করেন। জালের দুই মাথা টানতে দুই পাশে পাঁচ থেকে সাতজন শ্রমিক লাগে। তাঁদের দৈনিক মজুরি দিতে হয় ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা।

জানতে চাইলে জেলে কেফায়ত উল্লাহ বলেন, আগে টানাজালে লাল কোরাল, লইট্যা, টুইট্যা, মাইট্যা বেশি পাওয়া যেত। এখন লাল কোরাল বা লইট্যা প্রায় নেই। আগে জালে একটি বা দুটি জেলিফিশ ধরা পড়ত, এখন শত শত জেলিফিশ উঠছে।

টেকনাফ ডিঙিনৌকা মালিক সমিতির সভাপতি সুলতান আহমদ বলেন, সমিতির আওতায় প্রায় এক হাজার নৌকা রয়েছে। এর মধ্যে শতাধিক নৌকা এখন ছোট মাছ ধরছে। সব মিলিয়ে কোটি টাকার মাছ ধরা পড়ছে। এরপরও সব জায়গায় মাছ ধরা না পড়ায় পাঁচ থেকে ছয় হাজার জেলে-শ্রমিক বেকার। তাঁরা মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন।