সেকেন্দার ফরাজি
ছবি: প্রথম আলো

ভোরের আলো ফোটার পর ঘণ্টাখানেক পেরিয়ে গেছে। ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে তখনো রাস্তায় বেশ ঢিলেঢালা ভাব। তবে খুলনা নতুন বাজারের কেডিএ রূপসা মার্কেটের সামনের চায়ের দোকানে বেশ ভিড়। দোকানের একটু সামনে সিমেন্টের খালি বস্তার ওপর রিকশা-সাইকেল মেরামতের যন্ত্রপাতি থরে থরে সাজিয়ে রাখলেন সেকেন্দার ফরাজি। এরপর পাশের দোকানে গিয়ে চা শেষ করে আয়েশি ভঙ্গিতে বসে পান চিবাচ্ছিলেন। এমন সময় টায়ার বিগড়ানো ভ্যান এসে থামল ফুটপাতের সামনে।

একদিকে সাতসকালে বৃষ্টি, অন্যদিকে চাকা অচল হওয়ায় মেজাজও বিগড়ে আছে ভ্যানচালকের। সরাইখানার সামনে কাউকে না দেখে যেন তাঁর বিরক্তি আরও বাড়ল। এ ঘটনা চোখ এড়াল না সেকেন্দারের। গলা চড়িয়ে সেকেন্দার ভ্যানচালকের উদ্দেশে বলেন, ‘গজগজ কইরো না। এ পাশে আছি। দাঁড়াইতে লাগো, আসতেছি।’

ভ্যানের কাছে গিয়ে টায়ার খুললেন সেকেন্দার। বয়সের ভারে হাত একটু কাঁপলেও দক্ষতার সঙ্গে টিউবের ছিদ্রগুলো মেরামত করলেন। সব সময় ভালো মিস্ত্রির কাছে কাজ করানোর পরামর্শ দিয়ে ভ্যানচালককে বিদায় দিলেন। এরপর আবার বের করলেন পানের কৌটা।

কথায় কথায় জানা গেল, সেকেন্দারের বয়স এখন ৭৪। প্রায় ৫০ বছর ধরে রিকশা-সাইকেল মিস্ত্রির কাজ করছেন তিনি। বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার বড় বাদুরা গ্রামে তাঁদের বাড়ি ছিল। গ্রামে কোনো জমিজমা ছিল না। আবার কাজের তেমন সংস্থানও না থাকায় কাজের আশায় খুলনা শহরে এসেছিলেন সেকেন্দার ও তাঁর বাবা। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর কিছুদিন আগে তাঁরা খুলনায় আসেন। প্রথমে একটি গরুর খামারে কাজ করতেন। তাঁর বাবা কাজ করতেন কয়লার ডিপোতে। দেশ স্বাধীনের কিছুদিন পর নতুন সংসার শুরু হয় সেকেন্দারের। পেশাতেও বদল আসে। রিকশা-সাইকেল মেরামতের কাজ শেখেন। এরপর ওস্তাদের সঙ্গে থেকে কাজ করেছেন প্রায় ২৫ বছর। ২৩-২৪ বছর ধরে নতুন বাজার এলাকায় সাইকেল, রিকশা ও ভ্যান সারাইয়ের কাজ করছেন তিনি।

প্রতিদিন ফজরের নামাজের পর কাজে বের হন সেকেন্দার। বেলা একটার পর চলে যান বাসায়। শরীর সমর্থন না জোগানোয় বিকেলে আর কাজ করা হয়ে ওঠে না।

এখন নতুন বাজার ওয়াপদা কলোনিতে সরকারি বরাদ্দে পাওয়া ঘরে বাস করেন সেকেন্দার। সাত ছেলে আর এক মেয়ে। সবার আলাদা সংসার হয়েছে। স্ত্রী ও এক ছেলের দুই সন্তানকে নিয়ে তাঁর সংসার। কাজ করে প্রতিদিন আয় হয় গড়ে ৪০০ টাকার মতো। তবে শ্রাবণ ও ভাদ্র মাসে তাঁর আয় কিছুটা কমে যায়।

সেকেন্দার ফরাজি বলেন, ‘শ্রাবণ-ভাদ্র মাসে শহরে লোক কম থাকে। বর্ষাকালে গ্রামের দিকে নানা কাজ থাকায় ওই সময়টাতে শহরে আসা কাজের মানুষ গ্রামে চলে যায়। স্বাভাবিকভাবে আমাদের কাজও কমে। আবার আমরা খোলা জায়গায় কাজ করি। বর্ষাকালে বৃষ্টি বেশি হলে ওই দিন আর কাজ করা যায় না।’

সেকেন্দারদের কাজ আগের চেয়ে বেড়েছে। রোজগারও বেড়েছে। তারপরও সংসার চালাতে কষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সেকেন্দার বলেন, এখন শহরে সাইকেল, রিকশা ও ভ্যান আগের চেয়ে বেড়েছে। কাজও আগের চেয়ে বেশি হয়। আগের চেয়ে আয়ও বেড়েছে। তবে কেনার ক্ষমতা কমেছে। আগে ৫০ টাকা আয় করে যা খেতে পারতেন, এখন ২০০ টাকা আয়ে তা হচ্ছে না। বাজারে ডাল ১২০ টাকা, চাল ৬০ টাকা, এক পোয়া মাছ কম করে ১০০ টাকা। এখন দিনে কম করে খরচা লাগছে ৪০০ টাকা। আয়–ব্যয় এক হয়ে যাচ্ছে। অসুখ–বিসুখ বা কোনো বিপদ–আপদ হলে চলবে কী করে, সব সময় সেই চিন্তায় থাকতে হয়।

জীবনসায়াহ্নে এসেও লড়াই চালিয়ে যেতে যেতে ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন সেকেন্দার। হাতুড়ি পেটাতে পেটাতে হাতে ফোস্কা পড়ে গেছে। চামড়া উঠে যাওয়া হাত দেখিয়ে সেকেন্দার বলেন, ‘বয়স হয়েছে। শরীরে আর কুলায় না। বল কমে গেছে, কাজ করতে হাত কাঁপে। বছর তিনেক ধরে শরীরটা খুব খারাপ। জানি না এভাবে আর কত দিন করতে পারব। আবার কাজ না করলে এই দুনিয়ায় কে কয় দিন কাকে খাওয়ায় বলেন!’