আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া পাহাড়চূড়ার সেই বিহারে প্রতিদিন যাচ্ছেন পর্যটকেরা, কী আছে এতে

একসময় এ বৌদ্ধবিহার আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। তবে এখন প্রতিদিন গড়ে অন্তত ৬০০ পর্যটক পাহাড়চূড়ায় উঠে এই অনন্য স্থাপনা ঘুরে দেখছেন। অনেকে পরিবার-পরিজন নিয়ে, আবার কেউ বন্ধুদের সঙ্গে এখানে আসছেন।

পর্যটকের নজর কাড়ছে পাহাড়চূড়ার ১০০ ফুট লম্বা ‘সিংহ শয্যা’ গৌতমবুদ্ধের মূর্তি। সম্প্রতি কক্সবাজার রামু থেকে তোলাছবি: প্রথম আলো

পাহাড়ের গা বেয়ে উঠে গেছে পাকা সিঁড়ি। ধাপে ধাপে ওপরে উঠতে উঠতে চোখে পড়ে সারিবদ্ধ বুদ্ধমূর্তি। মাঝেমধ্যে ভেসে আসে দর্শনার্থীদের কথাবার্তা আর ক্যামেরার ক্লিকের শব্দ। শেষ ধাপে পৌঁছাতেই সামনে ভেসে ওঠে বিশাল সিংহশয্যা গৌতম বুদ্ধমূর্তি।

কক্সবাজারের রামুর উত্তর মিঠাছড়ির পাহাড়চূড়ায় অবস্থিত প্রাচীন বৌদ্ধবিহার বিমুক্তি বিদর্শন ভাবনা কেন্দ্রে দেখা যায় এ দৃশ্য। দেশের সর্ববৃহৎ ১০০ ফুট লম্বা সিংহশয্যা বুদ্ধমূর্তি দেখতে এখানে প্রতিদিনই আসছেন পর্যটকেরা। বিশেষ করে সম্প্রতি মূর্তির পথে ওঠার সিঁড়ির দুই পাশে ৩৯টি নতুন বুদ্ধমূর্তি স্থাপনের পর দর্শনার্থীর সংখ্যা বেড়েছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একসময় এ বৌদ্ধবিহার আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। তবে এখন প্রতিদিন গড়ে অন্তত ৬০০ পর্যটক পাহাড়চূড়ায় উঠে এই অনন্য স্থাপনা ঘুরে দেখছেন। অনেকে পরিবার-পরিজন নিয়ে, আবার কেউ বন্ধুদের সঙ্গে এখানে আসছেন।

‘রাত প্রায় দুইটার দিকে হঠাৎ হামলা শুরু হয়। আমরা কেউ ভাবতেই পারিনি, এমন কিছু ঘটবে। প্রাণভয়ে জঙ্গলে পালিয়ে যাই। মনে হয়েছিল যে সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। সকালে এসে দেখি, বিহার পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। কিন্তু বুদ্ধমূর্তিটি টিকে আছে।’
—করুণাশ্রী মহাথের, প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, বিমুক্তি বিদর্শন ভাবনা কেন্দ্র

সম্প্রতি বৌদ্ধবিহারে গিয়ে কথা হয় কুমিল্লা থেকে আসা ব্যবসায়ী নাজমুল হুদার সঙ্গে । তিনি বলেন, ‘কক্সবাজারে ঘুরতে এসে এই বুদ্ধমূর্তির কথা জানতে পারি। এত বড় বুদ্ধমূর্তি দেশে আগে কোথাও দেখিনি।’

ঢাকার শ্যামলী এলাকার স্কুলশিক্ষক রুপালী চাকমা বলেন, ‘খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, রাঙামাটিতে অনেকবার গিয়েছি। কিন্তু এমন বিশাল ও ভিন্নধর্মী বুদ্ধমূর্তি আগে কোথাও চোখে পড়েনি। গৌতম বুদ্ধের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই এখানে আসা।’

সিঁড়ি দিয়ে চূড়ায় উঠতেই চোখে পড়ে ছোট মূর্তি। সম্প্রতি কক্সবাজার রামু থেকে তোলা
ছবি: প্রথম আলো

যে কারণে ‘সিংহশয্যা’ নাম

বিহারের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক করুণাশ্রী মহাথের বলেন, ‘সিংহশয্যা’ নামটির একটি বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। সিংহ ডান কাতে শুয়ে সতর্ক অবস্থায় ঘুমায়। গৌতম বুদ্ধও ধ্যানমগ্ন অবস্থায় ডান পাশে শুয়ে, ডান হাতের ওপর মাথা রেখে বিশ্রাম নিতেন। সেই ভঙ্গিমা অনুসরণ করেই মূর্তিটির নামকরণ করা হয়েছে ‘সিংহশয্যা’। তিনি বলেন, বুদ্ধত্ব লাভের আগে দীর্ঘ সময় ধরে বুদ্ধ এভাবেই ধ্যানচর্চা করতেন। সে চিত্রই এখানে তুলে ধরা হয়েছে।

বিহার এলাকায় প্রায় দুই একর জায়গাজুড়ে নেওয়া হয়েছে নতুন উন্নয়ন প্রকল্প। এর আওতায় একটি পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ে যাওয়ার জন্য নির্মাণ করা হচ্ছে ২০০ ফুট দীর্ঘ ঝুলন্ত সেতু। সেতুর শেষ প্রান্তে তৈরি হবে ১২০ ফুট উচ্চতার একটি স্বর্ণজাদি। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা।

এই বিশাল মূর্তি নির্মাণের পরিকল্পনা অবশ্য করেছিলেন করুণাশ্রী মহাথের নিজেই। ২০০৬ সালে মিয়ানমার থেকে দক্ষ কারিগর এনে শুরু হয় নির্মাণকাজ। শুরুতে ব্যক্তিগত অর্থে কাজ শুরু হলেও পরে ভক্তদের অনুদান ও বিদেশ থেকে আসা সহায়তায় কাজ এগিয়ে চলে। মূর্তিটির দৈর্ঘ্য ১০০ ফুট, উচ্চতা ৫০ ফুট ও প্রস্থে ২২ ফুট। মাথা দক্ষিণ দিকে এবং পা উত্তর দিকে রেখে নির্মাণ করা হয়েছে এটি। ২০১২ সালের আগস্টে মূল কাঠামোর কাজ শেষ হয়।

তবে এ মূর্তির উদ্বোধনের আগেই ঘটে যায় এক ভয়াবহ ঘটনা। ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে কয়েক শ দুর্বৃত্ত লাঠিসোঁটা ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে বৌদ্ধবিহার ও মূর্তির ওপর হামলা চালায়। অগ্নিসংযোগে পুড়িয়ে দেওয়া হয় বিহারটি। মূর্তির ভেতরে ঢুকে ককটেল বিস্ফোরণও ঘটানো হয়। পরবর্তী সময়ে সরকার ও সেনাবাহিনীর সহায়তায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো পুনর্গঠন করা হয়। সিংহশয্যা বুদ্ধমূর্তিটিও সংস্কার করে সোনালি রঙে নতুনভাবে সাজানো হয়।

সেই রাতের কথা স্মরণ করে করুণাশ্রী মহাথের বলেন,‘রাত প্রায় দুইটার দিকে হঠাৎ হামলা শুরু হয়। আমরা কেউ ভাবতেই পারিনি, এমন কিছু ঘটবে। প্রাণভয়ে জঙ্গলে পালিয়ে যাই। মনে হয়েছিল যে সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। সকালে এসে দেখি, বিহার পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। কিন্তু বুদ্ধমূর্তিটি টিকে আছে। তখন মনে হয়েছে, কোনো অদৃশ্য শক্তি হয়তো এটিকে রক্ষা করেছে।’

বিহার দেখতে প্রতিদিনই ভিড় করেন শতাধিক পর্যটক ও দর্শনার্থী। সম্প্রতি কক্সবাজার রামু থেকে তোলা
ছবি: প্রথম আলো

সিঁড়িজুড়ে নতুন বুদ্ধমূর্তি

বৌদ্ধবিহারে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে দৃষ্টিনন্দন প্রধান ফটক। সেখান থেকে পাহাড়চূড়ায় উঠতে রয়েছে ৮৮ ধাপের প্রায় ২০০ ফুট দীর্ঘ পাকা সিঁড়ি। এই সিঁড়ির দুই পাশে নতুন করে বসানো হয়েছে ৩৯টি বুদ্ধমূর্তি। এর মধ্যে উত্তর পাশে সারিবদ্ধভাবে রয়েছে ২১টি দাঁড়ানো মূর্তি। এগুলোর প্রতিটির উচ্চতা ৭ ফুট। আর দক্ষিণ পাশে রয়েছে ১৮টি বসা মূর্তি, প্রতিটির উচ্চতা ৪ ফুট। মিয়ানমারের কারিগরদের দিয়ে তিন বছরে এসব মূর্তি তৈরি করা হয়েছে। এতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩৫ লাখ টাকা। বিহারের ভিক্ষু, শ্রমণ ও সেবকেরা এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ করছেন।

শুধু এটুকুই নয়। বিহার এলাকায় প্রায় দুই একর জায়গাজুড়ে নেওয়া হয়েছে নতুন উন্নয়ন প্রকল্প। এর আওতায় একটি পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ে যাওয়ার জন্য নির্মাণ করা হচ্ছে ২০০ ফুট দীর্ঘ ঝুলন্ত সেতু। সেতুর শেষ প্রান্তে তৈরি হবে ১২০ ফুট উচ্চতার একটি স্বর্ণজাদি। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা। ইতিমধ্যে পাইলিংয়ের কাজ শুরু হয়েছে। অনুদানের অর্থেই ধাপে ধাপে এগোচ্ছে নির্মাণ।

করুণাশ্রী মহাথের বলেন, ‘আমার স্বপ্ন ছিল এমন একটি বুদ্ধমূর্তি নির্মাণ করা, যা বাংলাদেশে অনন্য হবে। কক্সবাজারে প্রতিবছর লাখো পর্যটক আসেন। তাঁদের সামনে বৌদ্ধধর্মের ঐতিহ্য তুলে ধরা এবং পর্যটনকে আরও সমৃদ্ধ করাই ছিল মূল লক্ষ্য। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ধর্মীয় উপাসনার পাশাপাশি এই স্থান দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে বলে আশা করছি।’