রাজশাহীতে জামায়াতের ইফতার মঞ্চে ‘মাদক ব্যবসায়ী’ যুবলীগ নেতা, আছে হত্যা মামলাও

রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার মাটিকাটা ইউনিয়ন জামায়াতের ইফতার মাহফিলের মঞ্চে যুবলীগ নেতা ও সরকারের তালিকাভুক্ত মাদক ব্যবসায়ী সেতাবুর রহমান বাবু। সোমবার মাটিকাটা আদর্শ কলেজ মাঠেছবি: সংগৃহীত

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১৭ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশ করা ‘রাজশাহীর প্রভাবশালী মাদক ব্যবসায়ীদের’ তালিকায় ছিল যুবলীগ নেতা সেতাবুর রহমানের (বাবু) নাম। তিনি রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার মাটিকাটা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য ছিলেন। হেরোইনসহ গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে থাকায় বরখাস্ত হন। তাঁর নামে হত্যাসহ আরও মামলা হয়েছে। ৫ আগস্টের গণ–অভ্যুত্থানের পরে পলাতক ছিলেন। হঠাৎ সোমবার (৯ মার্চ) তাঁকে গোদাগাড়ীর একটি ইফতার মাহফিলের মঞ্চে দেখা গেছে।

উপজেলার মাটিকাটা আদর্শ কলেজ মাঠে ইফতার মাহফিলের আয়োজন করে ইউনিয়ন জামায়াত। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির ও রাজশাহী-১ (গোদাগাড়ী-তানোর) আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক মুজিবুর রহমান। মঞ্চে তাঁর পেছনের সারিতে বসে ছিলেন সেতাবুর রহমান।

সেতাবুর রহমানের বাড়ি গোদাগাড়ী উপজেলার রেলগেট এলাকায়। তাঁর বাবার নাম আতাউর রহমান। ২০১৭ সালের তালিকায় সেতাবুরের বয়স লেখা ছিল ২৭ বছর। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত তালিকায় সেতাবুরের বাবার পরিচয় লেখা ছিল দিনমজুর হিসেবে। এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সেতাবুর আগে পাওয়ার টিলারের চালক হিসেবে কাজ করতেন। মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে বিপুল বিত্তবৈভবের মালিক হন। পরে মাটিকাটা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি ইউপি সদস্য থাকা অবস্থায় ২০১৭ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক অধিশাখা-২ থেকে করা প্রভাবশালী মাদক ব্যবসায়ীদের তালিকায় ৯ নম্বরে সেতাবুর রহমান বাবুর নাম ছিল।

একই তালিকায় মাদক ব্যবসায়ীদের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে এক নম্বরে নাম ছিল রাজশাহী-১ আসনের তৎকালীন আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ওমর ফারুক চৌধুরীর। এ নিয়ে ২০১৮ সালের ১৪ জানুয়ারি প্রথম আলোর প্রথম পৃষ্ঠায় ‘মাদকের পৃষ্ঠপোষকতায় সাংসদের নাম’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়, জনশ্রুতি রয়েছে, মাদকদ্রব্যের চোরাকারবারি/ব্যবসায়ীরা গোপনে ও পরোক্ষভাবে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দসহ অন্যান্য দলের কিছু নেতা–কর্মীর ছত্রছায়ায় ব্যবসা পরিচালনা করে থাকে।

আরও পড়ুন

মাটিকাটা ইউনিয়ন পরিষদের সচিব সাব্বির রহমান বলেন, ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে ১০০ গ্রাম হেরোইনসহ গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যান ৮ নম্বর ওয়ার্ডের তৎকালীন ইউপি সদস্য সেতাবুর রহমান। এ কারণে তিনি ইউপি কার্যালয়ে অনুপস্থিত থাকেন। ওই সময় জেলা প্রশাসক স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়ে বিষয়টি অবহিত করেন। তারপর তাঁকে ইউপি সদস্যের পদ থেকে বরখাস্ত করা হয়। তখন থেকেই তিনি বরখাস্ত অবস্থায় আছেন।

সেতাবুরের বিরুদ্ধে একাধিক মাদকের মামলা আছে। আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ওমর ফারুক চৌধুরীর সঙ্গে ছিল তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। সেই সুবাদে হয়েছিলেন মাটিকাটা ইউনিয়নের ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সহসভাপতি। ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন মাটিকাটা এলাকায় ভোটকেন্দ্র দখলে নিতে বিএনপির নেতা–কর্মীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে তাঁর নেতৃত্বেই। সেদিনের ওই হামলায় এলাকার বাসিন্দা জেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক রবিউল ইসলামের (অরণ্য কুসুম) বাবা নজরুল ইসলাম মারা যান। গণ–অভ্যুত্থানের পর নিহত নজরুল ইসলামের বড় ছেলে মাসুম সরকার বাদী হয়ে সেতাবুর রহমানকে প্রধান আসামি করে হত্যা মামলা করেন। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের আমলে ওই এলাকায় জিয়া পরিষদের কার্যালয়ও দখল করেছিলেন। ওই ঘটনাতেও তাঁর বিরুদ্ধে গণ–অভ্যুত্থানের পর আরও একটি মামলা হয়েছে। সেই মামলায় ২০২৪ সালের ২৩ অক্টোবর গ্রেপ্তার হয়ে তিনি কারাগারেও গিয়েছিলেন।

ইফতার মাহফিলের প্রধান অতিথি জামায়াতের সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমানের কাছাকাছি বসে আছেন যুবলীগ নেতা ও সরকারের তালিকাভুক্ত মাদক ব্যবসায়ী সেতাবুর রহমান বাবু। সোমবার জেলার মাটিকাটা আদর্শ কলেজ মাঠে
ছবি: সংগৃহীত

জামায়াতের ইফতার মঞ্চে তাঁকে দেখে অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। নিহত নজরুল ইসলামের ছেলে জেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক রবিউল ইসলাম বলেন, ‘আমরা শুনছি যে জামায়াতের এই ইফতার মাহফিল আয়োজনের পুরো টাকাটাই দিয়েছেন মাদক ব্যবসায়ী সেতাবুর রহমান বাবু। তা না হলে তাঁকে মঞ্চে বসতে দেবে কেন?’ তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগের এই সন্ত্রাসী ভোটকেন্দ্র দখলে নিতে আমার বাবাকে হত্যা করেছে। তাঁকেই এখন দেখা যাচ্ছে জামায়াতের মঞ্চে, একেবারে সংসদ সদস্যের পাশে। এটা খুব দুঃখজনক। জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে অধ্যাপক মুজিবুর রহমান ঢাকায় গিয়ে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিচ্ছেন। আর এলাকায় এসে আওয়ামী লীগ-মাদক ব্যবসায়ী পুনর্বাসন করছেন। এলাকার মানুষ হিসেবে আমাদের এর চেয়ে কষ্টের আর কিছু হতে পারে না।’

এ ব্যাপারে মঙ্গলবার বিকেলে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির ও এলাকার সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমানকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

আরও পড়ুন

গোদাগাড়ী উপজেলা জামায়াতের আমির নুমাউল আলী দাবি করেন তিনি প্রথম সারিতে থাকায় পেছনে দেখতে পাননি। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, মাদকের ব্যাপারে তাঁদের জিরো টলারেন্স। আমজনতা হিসেবে সেতাবুর মঞ্চে উঠতে পারে। আমজনতা কি জামায়াতের মঞ্চের চেয়ারে বসতে পারে—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তিনি নেতা–কর্মীদের কাছে খোঁজ নিয়ে পরে বিষয়টি জানাতে পারবেন যে কীভাবে তিনি মঞ্চে উঠলেন।

সেতাবুরের টাকায় এই অনুষ্ঠানের আয়োজনের অভিযোগ প্রসঙ্গে নুমাউল আলী বলেন, তার প্রশ্নই ওঠে না। তারা বরাবরের মতো যেভাবে আয়োজন করেন, সেভাবেই করেছেন।

কথা বলার জন্য সেতাবুর রহমানের ব্যবহৃত দুটি মুঠোফোন নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও সংযোগ পাওয়া যায়নি।

গোদাগাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাসান বশির বলেন, মাদক ব্যবসায়ী হলে কোনো রাজনৈতিক দলে যোগ দিলেও ছাড় পাবে না। তাঁর নামে কোনো মামলা কিংবা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা আছে কি না দেখে বলতে পারবেন।