১০০ টাকায় ১২৫ গ্রাম গরুর মাংস, সঙ্গে দুটি আলু

নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ধর্মগঞ্জ পাকাপুল এলাকায় ১০০ টাকার প্যাকেজে মাংস বিক্রি করেন তরুণ মাংস বিক্রেতা আল আমিনছবি: প্রথম আলো

বাজারে গরুর মাংসের কেজি ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকা। এই দামে মাংস কিনতে হিমশিম খান নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষ। সংসারের খরচ সামলে অনেকের পক্ষেই পাতে মাংস তোলা কঠিন হয়ে যায়। কেউ কেউ অল্প পরিমাণে মাংস কিনতে চাইলেও অনেক বিক্রেতা তা বিক্রি করতে চান না। এমন বাস্তবতায় ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার এনায়েতনগর ইউনিয়নের ধর্মগঞ্জ পাকাপুল এলাকার তরুণ মাংস বিক্রেতা আল আমিন।

‘আলমের গোশতের দোকান’ নামে তাঁর দোকানে প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ১০০ টাকায় ১২৫ গ্রাম হাড় ও চর্বিছাড়া গরুর মাংস বিক্রি করা হচ্ছে। সঙ্গে দেওয়া হচ্ছে দুটি আলু। আট মাস ধরে এভাবে মাংস বিক্রি করছেন আল আমিন। শ্রমজীবী ও নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে এটা ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।

সদরের ধর্মগঞ্জ পাকাপুল এলাকায় আলমের গোশতের দোকান কোথায় জানতে চাইলে স্থানীয় লোকজন সহজেই দেখিয়ে দেন। অনেকে ১০০ টাকায় মাংস বিক্রির বিষয়টিও নিজ উদ্যোগী হয়ে জানালেন। প্রতিদিন একটি গরু জবাই করে বিক্রি করা হয়। সকাল ৬টা থেকে রাত পর্যন্ত চলে বেচাকেনা। তবে শুক্র ও শনিবার বেশি বেচাকেনা হয়।

এনায়েতনগর ইউনিয়নের ধর্মগঞ্জসহ আশপাশের এলাকায় পোশাকশ্রমিক, দিনমজুরসহ স্বল্প আয়ের মানুষের বসবাস বেশি। অনেকে ‘ব্যাচেলর’ হিসেবে কক্ষ ভাড়া নিয়ে থাকেন। তাঁদের পক্ষে এক কেজি বা আধা কেজি মাংস কেনা কষ্টকর। ১০০ টাকার নির্দিষ্ট প্যাকেজ তাঁদের জন্য স্বস্তির।

মাংস বিক্রেতা আল আমিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘অনেকেই দোকানে এসে ১০০ টাকার মাংস চাইতে লজ্জা পান। তাই নির্দিষ্টভাবে ১০০ টাকায় ১২৫ গ্রাম হাড় ও তেলছাড়া মাংস দিচ্ছি, সঙ্গে দুই পিস আলু। এতে আমার বিক্রি বেড়েছে। আর নিম্ন আয়ের মানুষও মাংস খেতে পারছেন।’ তিনি বলেন, হাড় ও তেল আলাদাভাবে হালিমের দোকানে বিক্রি করেন। এতে তাঁর লোকসান হয় না।

মাংস কিনতে আসা রিকশাচালক শাহাদাৎ হোসেন বলেন, ‘পোলাপান মাংস খাইতে চাইলে আগে ভয়ে মাংসের দোকানে যাইতাম না। এক কেজি ও আধা কেজি মাংস কেনার সামর্থ্য নেই। এখানে ১০০ টাকায় কিনে খেতে পারছি।’

ঢালীপাড়া এলাকার গৃহিণী শাহীনা আক্তার বলেন, ‘এই দোকানে ১০০ টাকায় মাংস বিক্রি করে শুনে এসেছি। আমি ২০০ টাকার মাংস কিনেছি। সঙ্গে তারা আলুও দিয়েছে।’

১০০ টাকার প্যাকেজ চালুর বিষয়ে আল আমিন বলেন, আট মাস আগে এক নারী দোকানের সামনে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলেন। তখন তাঁর কাছে জিজ্ঞাসা করলে জানান, কোরবানির ঈদের সময় মাংস খেয়েছিলেন, এরপর আর মাংস খাননি। থলে থেকে ১০০ টাকার নোট বের করে দিয়ে মাংস চাইলে তিনি তাঁকে মাংস দেন। মাংস পেয়ে ওই নারী কেঁদে ফেলেন। ওই ঘটনার পর তিনি সবার জন্য ১০০ টাকার নির্দিষ্ট মাংসের প্যাকেজ চালু করেন। তিনি বলেন, ‘কেউ যেন মাংস না খেয়ে থাকে—একজন মাংস বিক্রেতা হিসেবে এটা দেখতে খারাপ লাগে। আমি হয়তো খুব বেশি লাভ করছি না। কিন্তু মানুষের দোয়া পাচ্ছি।’

আল আমিনের বাবা আলম মিয়া ২২ বছর ধরে সদর উপজেলার এনায়েতনগর ইউনিয়নের চতলার মাঠ এলাকায় আফাজের বাজারে মাংস বিক্রি করেন। প্রতি সপ্তাহে ফরিদপুরের টেপাখোলা, মালিগ্রাম, পাড়াগ্রাম; রাজশাহী সিটি হাটসহ বিভিন্ন হাট থেকে ১০ থেকে ১২টি গরু সংগ্রহ করেন। পরে সেই গরু নারায়ণগঞ্জে এনে বিক্রি করেন।

ছেলের এমন উদ্যোগে খুশি বাবা আলম মিয়া। তিনি বলেন, ‘ছেলেকে বলেছি, যত দিন তোমার এই ব্যবসা থাকবে, তত দিন তুমি এটা চালু রাখবে।’ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম ফয়েজ উদ্দিন বলেন, ‘আল আমিনের মতো অন্যরা এমন উদ্যোগ নিলে সামর্থ্য অনুযায়ী নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষেরাও মাংস কিনে খেতে পারবে।’