রাজবাড়ীতে তরুণদের উদ্যোগে রমজানে ‘২ টাকার ইফতার’

দরিদ্র মানুষদের মধ্যে ইফতার বিতরণ করা হচ্ছে। সম্প্রতি রাজবাড়ী সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের পাশেছবি: সংগৃহীত

রাজবাড়ী সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের এক পাশে ব্যানারে বড় অক্ষরে লেখা ‘পবিত্র মাহে রমজান উপলক্ষে ২ টাকার ইফতার’। টেবিলের ওপর সাজানো ইফতার। সঙ্গে রয়েছে এক বোতল করে পানি। নামেই দুই টাকার ইফতার। এসব খাবার হতদরিদ্র মানুষদের বিনা মূল্যে দেওয়া হয়। রমজান মাসজুড়ে একদল তরুণ এই উদ্যোগ নিয়েছেন।

এর আগে এই তরুণেরা দরিদ্র মানুষদের জন্য শহরের রেলস্টেশন ফুলতলায় ‘২ টাকার হোটেল’ চালু করে অনেক প্রশংসা কুড়িয়েছেন। গত বছর শহরে পাঁচ টাকার ইফতার দিয়ে আলোচনায় আসেন। তাঁদের পরিবারের আর্থিক সহযোগিতায় দুই বছর ধরে তাঁরা এমন মানবিক কাজ করে যাচ্ছেন।

রমজানে প্রতিদিন বিকেলে শহরের রাজবাড়ী সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের পাশে দুই টাকায় বা বিনা মূল্যে ইফতারসামগ্রী দেওয়া হয় জেনে দরিদ্র মানুষের ভিড় জমে। একদল তরুণ রমজানের শুরু থেকে প্রতিদিন বিকেল পাঁচটা থেকে সেখানে ইফতারসামগ্রী নিয়ে হাজির হন। কোনো দিন বিরিয়ানি ও পানি, কোনো দিন বিভিন্ন ফল ও শরবত আবার কোনো দিন ফ্রাইড রাইস ও পানি দেওয়া হয়।

গত শুক্রবার বিকেলে হুইলচেয়ারে বসে অপেক্ষার পর এক প্যাকেট চিকেন বিরিয়ানি ও একটি পানির বোতল পান হালিম খান নামের এক শ্রমিক। মাত্র দুই টাকার বিনিময়ে প্রায় ১৫০ টাকার খাবার পেয়ে তিনি খুব খুশি। তিনি বলেন, তরুণেরা অনেক ভালো কাজ করছেন। প্রতিদিন এখানে ইফতার দেওয়া হয় জেনে তিনি এসেছেন ইফতারি নিতে।

ইফতারি নিতে আসা আনোয়ার ফকির নামের আরেকজন বলেন, তাঁর বাড়ি কুষ্টিয়া। কাজের সন্ধানে রাজবাড়ী আসেন। বিকেল হওয়ায় স্টেশনে বসে ছিলেন। সারা দিন রোজা রেখে শরীর আর চলছিল না। পরে একজনের থেকে জেনে তিনিও এখানে ইফতার নিতে এসেছেন।

একটি বেসরকারি সংস্থার নির্বাহী পরিচালক সোহেল রানা বলেন, এই তরুণেরা কিছুদিন দুই টাকার হোটেল দিয়ে ছিন্নমূল মানুষের খাবার ব্যবস্থা করেছিল। গত বছর তারাই শহরের পান্না চত্বরে পাঁচ টাকার ইফতার দিয়েছিল। তাদের প্রতিটি কর্মকাণ্ড বেশ প্রশংসিত হয়। এ বছর রমজানের শুরু থেকে দুই টাকার ইফতার দিচ্ছে। নামেই দুই টাকার ইফতার। মূলত বিনা মূল্যে ইফতার দিচ্ছে। তাদের এমন উদ্যোগ সত্যিই অনেক প্রশংসার।

ইফতার সামগ্রী বিতরণ করছেন একদল তরুণ। সম্প্রতি রাজবাড়ী সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের পাশে
ছবি: সংগৃহীত

ব্যতিক্রম এই মানবিক কার্যক্রমের অন্যতম উদ্যোক্তা মাহিন শিকদার বলেন, ‘দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে অনেক শ্রমজীবী ভালো ইফতার করতে পারেন না। তাঁদের কথা ভেবে গত বছর প্রথম পাঁচ টাকার ইফতার শুরু করেছিলাম। পরবর্তীতে দুই টাকার হোটেল চালু করি। এ বছর দুই টাকার ইফতার বিতরণ শুরু করেছি। প্রশ্ন আসতে পারে দুই টাকা কেন? আপনি যখন কোনো হোটেলে কিছু খেতে যান, তখন কিন্তু বিনা মূল্যে খেতে পারবেন না। কারণ, প্রত্যেকের আত্মসম্মান আছে। তাঁদের প্রতি সম্মান দেখিয়ে দুই টাকার ইফতার চালু করেছি। যাঁদের কাছে টাকা নাই, তাঁদের আমরা বিনা মূল্যে ইফতার দিচ্ছি।’

মাহিন শিকদার আরও বলেন, ‘এটা কোনো সংগঠনের কাজ নয়। আমরা কয়েকজন বন্ধু ও আমাদের বাবা-চাচাদের দেওয়া আর্থিক সহযোগিতায় এই আয়োজন করছি। আমরা প্রথম দিন ৫০ জনের জন্য আয়োজন করি। পরবর্তীতে চাপ বেড়ে যাওয়ায় এখন ৬০ থেকে ৭০ জনের ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। রমজান মাসজুড়ে প্রতিদিন চিকেন বিরিয়ানি, ফ্রাইড রাইস ও চিকেন, আট প্রকার ফল, শরবত ও পানি থাকছে।’

উদ্যোক্তাদের আরেকজন সাগর শেখ বলেন, ‘মূলত ছিন্নমূল মানুষের অসহায়ত্ব দেখে আমরা প্রথম চার-পাঁচ বন্ধু মিলে মানবিক কাজ শুরু করি। আমি ছাড়াও অন্যতম উদ্যোক্তা হিসেবে রয়েছে মাহিন শিকদার, রাব্বি, তামিম ও হেমায়েত। গড়ে প্রতিদিন ৫০ জনের জন্য আমাদের বাজেট ধরা আছে। এতে প্রতিদিন তিন হাজার টাকার মতো লাগছে। ফলমূল দিতে গেলে খরচ আরেকটু বাড়ে।’

একজন অভিভাবক মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘রমজান মাসে আমরা অনেককে ইফতার করাই। যখন জানলাম, ছিন্নমূল মানুষের জন্য আমাদের সন্তানেরা দুই টাকার ইফতার দিচ্ছে। তাদের কথা চিন্তা করে আমাদের টাকাটা তাদের হাতে তুলে দিয়েছি। অনেকে আছেন, ঠিকমতো ইফতার করতে পারেন না, কিনতেও পারেন না, তাঁদের জন্য এই উদ্যোগ। আমাদের সন্তানদের এমন উদ্যোগ খুবই ভালো লাগছে।’