রংতুলি দিয়ে বাক্হীন সাবা কথা ফুটিয়ে তোলে ক্যানভাসে

ছবি আঁকায় নিমগ্ন ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার বাক্‌ ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী কিশোরী সাবা ইসলাম। পাশে দাঁড়িয়ে মা। ৬ মার্চ দুপুরে তোলাছবি: প্রথম আলো

মা-বাবার আদরের সন্তান সাবা ইসলাম (বর্ণ)। দুই ভাই–বোনের মধ্যে বড় সাবা সপ্তম শ্রেণিতে পড়ালেখা করছে। ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার এই কিশোরীর মুখে কোনো কথা নেই, কানেও শোনে না; কিন্তু তার হাতের ছোঁয়ায় আলো ফোটে ক্যানভাসে। রংতুলিতে নিজের জীবনের নতুন দিগন্ত খুঁজে পেয়েছে বাক্হীন সাবা।

ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা পৌরসভা থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরের গ্রাম কাঠগড়া। গ্রামের নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান সাবা ইসলাম। তার বাবা শফিউল আলম একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। মা মুসলিমা খাতুন গৃহিণী। সাবার ছোট ভাইয়ের নাম আহনাফ ইসলাম (অর্ণব)। সাবা স্থানীয় আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ালেখা করছে।

গ্রামের টিনশেডের ঘরে বসবাস সাবার পরিবারের। সম্প্রতি এক দুপুরে সাবাদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, দুই কক্ষের ঘরের বিভিন্ন স্থানে ঝোলানো নানা চিত্রকর্ম। আছে কাজী নজরুল ইসলাম ও জয়নুল আবেদিনের পোর্ট্রেট। অপর একটি কক্ষের শোকেস পুরস্কারে ঠাসা। ছবি এঁকে পুরস্কার হিসেবে পাওয়া ক্রেস্ট, মেডেল আর বই আছে সেখানে। দেয়ালে শোভা পাচ্ছে হরেক রকম চিত্রকর্ম। সাবার আঁকা ছবির মধ্যে নজর কাড়ে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের রঙিন পোর্ট্রেট। এর বুকে কালো রঙে আঁকা জয়নুলের ‘দুর্ভিক্ষ চিত্রমালা (১৯৪৩)’ সিরিজের একটি ছবি। আর্জেন্টাইন তারকা ফুটবলার মেসি, বই হাতে খুদে শিশু, ষাঁড়ের লড়াই—আরও কত কী যে ছবি। মেয়ের আঁকা ছবি বিছানায় ছড়িয়ে দেখাচ্ছিলেন মা মুসলিমা খাতুন।

সাবা ইসলামের আঁকা চিত্রকর্ম দেখান তার মা মুসলিমা খাতুন। ৬ মার্চ দুপুরে তোলা
ছবি: প্রথম আলো

ওই সময় টেবিলে বসে জলরঙে অমর একুশের ছবি আঁকছিল সাবা ইসলাম। পাশে দাঁড়িয়ে মেয়ের ছবি আঁকা দেখেন মা। সাবা জলরং, তেলরং বা পেনসিল স্কেচ—সব মাধ্যমেই স্বচ্ছন্দ। এই বয়সেই এঁকেছে কয়েক শ ছবি। অর্জনও করেছে অনেক পুরস্কার। নির্বাক সাবার আঁকা ছবি যেন কথা বলে তার হয়ে। সাবা চোখের সামনে যা দেখে, তা–ই এঁকে ফেলে নিজের ক্যানভাসে।

বাক্‌প্রতিবন্ধী হয়ে জন্ম নেওয়া সাবা ইসলাম কীভাবে দক্ষ হলো ছবি আঁকায়, সে গল্প বলেন মা মুসলিমা খাতুন। তিনি বলেন, ‘মেয়ের ৯ মাস বয়সে বুঝতে পারি, সে কানে শোনে না এবং কথা বলতে পারবে না। যখন বিষয়টি আমরা নিশ্চিত হই, তখন খুব কষ্ট হয়েছে। তখন নিজেদের মানিয়ে নিয়েছি আমরা। ছোটবেলায় মেয়েকে দেখতাম, মাটিতে নানা কিছু আঁকত। এটি দেখে সে যখন প্লে ক্লাসে ভর্তি হয়, তখনই আঁকা শেখার জন্য স্কুলে ভর্তি করে দিই। টাঙ্গাইলের শিশু একাডেমি ও শিল্পকলা একাডেমিতে সে প্রশিক্ষণ নিয়ে দক্ষ হয়ে ওঠে।’

বাক্‌ ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী কিশোরী সাবা ইসলামের আঁকা চিত্রকর্ম
ছবি: প্রথম আলো

মুসলিমা খাতুন বলেন, ‘সে জলরং, তেলরং, পেস্টিং, মোমরংসহ সব ধরনের রং দিয়ে ছবি আঁকতে পারে। যেকোনো প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে সে কোনো না কোনো পর্যায়ে পুরস্কৃত হয়। তার ক্রেস্ট আছে অন্তত ৬০টি, বই আছে চার-পাঁচ শ, সনদ আছে দুই থেকে আড়াই শ। সে মানুষের পোর্ট্রেট ও গ্রামীণ দৃশ্য বেশি আঁকে। সে যা দেখে, তা–ই আঁকতে পারে। মা হিসেবে আমার গর্ব হয় যে আমার প্রতিবন্ধী মেয়েকে নিয়ে এতদূর আগাতে পারছি।’

সাবার বাবা শফিউল আলম বলেন, ‘যখন বুঝতে পারি মেয়ে বাক্ ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী, তখন আমরা চিকিৎসকের কাছে যাই। চিকিৎসক পরামর্শ দিয়েছিলেন উন্নত চিকিৎসার জন্য। চিকিৎসায় ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকা দরকার। তিন-চার বছর পরপর আবার তিন-চার লাখ করে টাকা লাগবে। আমাদের মতো নিম্নবিত্ত পরিবারের পক্ষে এটি করা সম্ভব হয়নি।’ তিনি আরও বলেন, ‘মেয়ের চার-পাঁচ বছর বয়সে আমরা যখন দেখি, সে কোনো কিছু দেখেই লিখতে পারে, ছবি আঁকতে পারে; তখন বুঝতে পারি, তার ছবি আঁকার প্রতি আলাদা আকর্ষণ রয়েছে।’

সাবা ইসলামের আঁকা চিত্রকর্ম
ছবি: প্রথম আলো

সাবার দাদি আনোয়ারা বেগমের সঙ্গে কথা হয় বাড়ির আঙিনায়। নাতনির সাফল্যে আনন্দাশ্রু এই বৃদ্ধার চোখে। তিনি বলেন, ‘জন্মের পর যখন দেখেছি মেয়েটা কথা বলতে পারে না, কানে শোনে না তখন অনেক দুঃখ হয়েছে; কিন্তু আমাদের তো করার কিছুই নেই। এখন আমার নাতনি যে পর্যায়ে গেছে, সে যেন আরও ভালো করে, তার নাম যেন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে, সেই দোয়া করি। সে যা  দেখে, তা–ই আঁকতে পারে। এখন আর দুঃখ করি না, নাতনিকে নিয়ে গর্ব হয়।’

সাবার আঁকা শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের রঙিন পোর্ট্রেট
ছবি: প্রথম আলো

সাবার স্কুলের প্রধান শিক্ষক বছির উদ্দিন বলেন, ‘সাবা আমাদের বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী। সে অনেক ভালো ছবি আঁকে। সে একদিন আমার ছবি এঁকে নিয়ে আসে, যা দেখে অভিভূত হই। সে কিছু দেখলেই হুবহু আঁকতে পারে। তার অদম্য মেধা সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়ুক।’