পাহাড়চূড়ার সম্রাট অশোকের করা বিহার, রয়েছে গৌতম বুদ্ধের বক্ষাস্থি

কারুকার্য খচিত ড্রাগন ফটক দিয়ে সিঁড়ি ভেঙে উঠলেই পাহাড় চূড়ায় ঐতিহাসিক রাংকূট বৌদ্ধবিহার। কক্সবাজারের রামুতে। সম্প্রতি তোলা
ছবি: প্রথম আলো

কক্সবাজারের রামুর চৌমুহনী থেকে দক্ষিণ দিকে কয়েক কিলোমিটার গেলে বাঁকখালীর নদীর ওপর নির্মিত শিকলঘাটা বেইলি সেতু। তার কিছুটা আগেই সড়কের বাম পাশে চোখে পড়ে রাংকূট বনাশ্রমের বিশাল গেট। ওপরে সোনালি রং খচিত লেখা ‘ঐতিহাসিক রাংকূট বনাশ্রম মহাতীর্থ বিহার। প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট অশোক, স্থাপিত খ্রিষ্টপূর্ব ২৬৮ অব্দে।’

ভারতীয় উপমহাদেশের তৃতীয় মৌর্য সম্রাট অশোক বৌদ্ধধর্মে দিক্ষিত হয়ে সারা ভারতবর্ষে অহিংসার বাণী ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। রাংকূট বিহারে রাখা খোদাই করা তথ্য এবং দলিল অনুযায়ী, খ্রিষ্টপূর্ব ২৬৮ অব্দে মৌর্য সম্রাট অশোক এই বিহারটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। জনশ্রুতি রয়েছে, সম্রাট অশোক বুদ্ধের বাণী প্রচারের উদ্দেশ্যে যে ৮৪ হাজার চৈত্য বা স্তূপ নির্মাণ করেছিলেন, তার একটি এই রাংকূট বিহারে রয়েছে।

রাংকূট বনাশ্রমে ঢুকতে হয় টিকিট কেটে। মূল ফটক দিয়ে ঢুকতেই সামনে পড়ে পাহাড়ি টিলার সড়কের পাশে স্থাপন করা সারি সারি ব্রোঞ্জের ৮৪টি বুদ্ধমূর্তি। নিরিবিলি ধ্যানমগ্ন এই রাস্তার নাম দেওয়া হয়েছে ‘বুদ্ধনগর’। এরপরই একটি জাদুঘর ও মন্দির। জাদুঘর পার হলে বিশাল একটি বটগাছ। তার নিচে সম্রাট অশোক ও হিউয়েন সাংয়ের মূর্তি। এরপর ড্রাগন গেট পার হয়ে সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠলে পাহাড় চূড়ায় হাজার বছরের প্রাচীন বৌদ্ধবিহার।

পাহাড়চূড়ার স্থাপিত বৌদ্ধবিহারের নামকরণেই লুকিয়ে আছে এর ইতিহাস। ‘রাং’ শব্দের অর্থ বুদ্ধের বক্ষাস্থি এবং ‘কূট’ শব্দের অর্থ পর্বত বা চূড়া। এই দুই শব্দের সংমিশ্রণে হয়েছে ‘রাংকূট’ , যার অর্থ দাঁড়ায় ‘বুদ্ধের বক্ষাস্থি–সংবলিত পর্বত’। জায়গাটির নাম ছিল রাং-উ। কালক্রমে সেটি হয়ে গেল রামু। বিহারের ভিক্ষু-শ্রমণদের ভাষ্য, এই বিহারে গৌতম বুদ্ধের বক্ষাস্থি সংরক্ষিত আছে বলেই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ, ভিক্ষু, গবেষক ও বৌদ্ধধর্মাবলম্বীরা ছুটে আসছেন।

সম্রাট অশোক এই বৌদ্ধ বিহার স্থাপন করেন বলে কথিত আছে। বিহার প্রাঙ্গণে বড় বটবৃক্ষের নিচে অশোকের ভাস্কর্য। সম্প্রতি তোলা
প্রথম আলো

সম্রাট অশোকের স্মৃতিধন্য বিহারে যা আছে

রাংকূট বিহারের জাদুঘরে ৬০০ থেকে ১৬০০ শতাব্দীর বিভিন্ন দলিল, পুস্তক, শিলালিপি, মূর্তি সংরক্ষণ করা আছে।  রয়েছে বিশাল একটি বিশাল বটবৃক্ষ। বৃক্ষের গোড়ায় স্থাপন করা হয় বুদ্ধের প্রথম ধর্মপ্রচার দৃশ্য ‘প্রতীকী সারনাথ’ ভাস্কর্য। তার পূর্ব পাশে ভাবি বুদ্ধ সিদ্ধার্থের জন্ম দৃশ্য ‘প্রতীকী লুম্বিনী’ ভাস্কর্য। বটবৃক্ষের দক্ষিণ পাশে খোলামাঠে নির্মিত হয় দোতলা জাদি ‘মারবিজয়ী অরহত উপগুপ্ত ভান্ডের চৈত্য’। ভেতরে বড় একটি বুদ্ধমূর্তি। বটবৃক্ষের পূর্বপাশে বিহারে ওঠার সিঁড়ি–সংবলিত আকর্ষণীয় ড্রাগন গেট। সিঁড়িতে ধাপ আছে ৬৭টি। গেটের পূর্ব পাশে গৌতম বুদ্ধের ১৮ ফুট উঁচু বন্দনা মূর্তি।

ড্রাগন সিঁড়ি মাড়িয়ে পাহাড়চূড়ায় উঠলে সামনে পড়ে সেই মূল বিহার। এর ভেতরেই রয়েছে গৌতম বুদ্ধের বক্ষাস্থিসংবলিত মহা বুদ্ধমূর্তি। কক্ষের বাইরে লেখা ‘বিশ্ব ঐতিহাসিক রাং-উ রাংকূট ঋদ্ধিময় বুদ্ধবিম্ব’। কষ্টিপাথর নির্মিত মহামূল্যবান এই মূর্তির মাথায় স্থাপিত রয়েছে গৌতম বুদ্ধের বক্ষাস্থি।

ভারতীয় উপমহাদেশের তৃতীয় মৌর্য সম্রাট অশোক বৌদ্ধধর্মে দিক্ষিত হয়ে সারা ভারতবর্ষে অহিংসার বাণী ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। রাংকূট বিহারে রাখা খোদাই করা তথ্য এবং দলিল অনুযায়ী, খ্রিষ্টপূর্ব ২৬৮ অব্দে মৌর্য সম্রাট অশোক এই বিহার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। জনশ্রুতি রয়েছে, সম্রাট অশোক বুদ্ধের বাণী প্রচারের উদ্দেশ্যে যে ৮৪ হাজার চৈত্য বা স্তূপ নির্মাণ করেছিলেন, তার একটি এই রাংকূট বিহারে রয়েছে।

বিহারে তিন পাশে উঁচুনিচু পাহাড়। পাহাড় ঘিরে তৈরি হয় রাংকূট মিরাকেল গার্ডেন। দর্শনার্থীদের এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ে যাতায়াত সুবিধার্থে নির্মাণ করা হয় দৃষ্টিনন্দন ঝুলন্ত সেতু ‘প্রজ্ঞাবংশ ফ্লাইওভার’, ইকো মেডিটেশন পার্ক, সাগরকলা, তরমুজ, ডাব, হাতির ভাস্কর্যসহ বিনোদনের নানা কিছু।

জানা গেছে, বিহারের প্রতিদিন ৭০০-৯০০ জন মানুষ পরিদর্শন করেন। বেশির ভাগ পর্যটক। বিহারের পরিচালক ও অধ্যক্ষ কে শ্রী জ্যেতিসেন থের প্রথম আলোকে বলেন, দেড় শ বছর আগেও রাংকূট মহাবিহারের সীমানা ছিল পাহাড়িভূমির ১০০ একর জুড়ে। এখন আছে মাত্র ১২ একর। অন্যান্য ভূমি অরক্ষিত, কিছু বেদখলে চলে গেছে। মহাবিহারে তিনিসহ ১২ জন ভিক্ষু ও ৪৩ জন শ্রমণ আছেন। সরকারি বরাদ্দ তেমন নেই। দেশ ও বিদেশের লোকজনের দানের টাকায় চলে মহাবিহারের সংস্কার, উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ। প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত মহাবিহার ভ্রমণের সুযোগ থাকে। টিকিটের বিপরীতে ২০ টাকা করে নেওয়া হয়, যা খরচ হয় ঝুলন্ত সেতু ও বিহারের সংস্কার কাজে।

বৃক্ষতলায় গৌতমবুদ্ধের ধর্ম প্রচারের দৃশ্যের অনুকৃতি
ছবি: প্রথম আলো

বিহারে গৌতম বুদ্ধের ‘বুকের হাড়’ এল যেভাবে

বিহারের মূর্তিতে গৌতম বুদ্ধের বক্ষাস্থি কীভাবে এল জানতে চাইলে জ্যোতিসেন থের প্রথম আলোকে বলেন, মহারাজা সম্রাট অশোক বুদ্ধের ৪৫ বছরব্যাপী প্রচারিত ৮৪ হাজার ধর্মবাণীকে জ্ঞানের প্রতীক বিবেচনা করতেন। সেসব বাণী নিয়ে বুদ্ধের অস্থি সংযোজিত ৮৪ হাজার চৈত্য স্থাপন করেছিলেন তিনি। যার মধ্যে অন্যতম রামুর এই চৈত্য। খ্রিষ্টপূর্ব ৩০৮ অব্দে আরাকান রাজা চন্দ্রজ্যোতি  বুদ্ধের বক্ষাস্থিটি কষ্টিপাথরের ৬ ফুট উঁচু বুদ্ধবিম্বের মাথায় সংযোজিত করেন।

দলিল দস্তাবেজের উদ্ধৃতি দিয়ে জ্যোতিসেন থের বলেন, ১৯৩০ সালে জগৎচন্দ্র মহাথের নামে একজন ব্রহ্ম দেশীয় ভিক্ষু শ্রীলঙ্কা থেকে প্রাপ্ত প্রাচীন পুঁথি ও তথ্যের সূত্র ধরে এই স্থান আবার আবিষ্কার করেন। সেই সঙ্গে আবিষ্কৃত হয় বৃহদাকার অভয়মুদ্রায় খচিত বুদ্ধমূর্তি, তা ছাড়া বিহারের পূর্বদিকে পাহাড়ে একটি বৃহদাকার দালানের ধ্বংসাবশেষ আছে। এর চারদিকে ছড়িয়ে আছে বেলেপাথর নির্মিত ভাস্কর্যের নানা ভগ্নাংশগুলো। সেখানে পাওয়া যায় ধাতব বাটি, প্রদীপ এবং ধূপদানিসহ অনেক কিছু।

রাংকূট বিহারের জাদুঘরে ৬০০ থেকে ১৬০০ শতাব্দীর বিভিন্ন দলিল, পুস্তক, শিলালিপি, মূর্তি সংরক্ষণ করা আছে।  রয়েছে বিশাল একটি বিশাল বটবৃক্ষ। বৃক্ষের গোড়ায় স্থাপন করা হয় বুদ্ধের প্রথম ধর্মপ্রচার দৃশ্য ‘প্রতীকী সারনাথ’ ভাস্কর্য। তার পূর্বপাশে ভাবি বুদ্ধ সিদ্ধার্থের জন্ম দৃশ্য ‘প্রতীকী লুম্বিনী’ ভাস্কর্য। বটবৃক্ষের দক্ষিণ পাশে খোলামাঠে নির্মিত হয় দোতলা জাদি ‘ মারবিজয়ী অরহত উপগুপ্ত ভান্ডের চৈত্য’। ভেতরে বড় একটি বুদ্ধমূর্তি। বটবৃক্ষের পূর্বপাশে বিহারে ওঠার সিঁড়িসংবলিত আকর্ষণীয় ড্রাগন গেট। সিঁড়িতে ধাপ আছে ৬৭টি। গেটের পূর্ব পাশে গৌতম বুদ্ধের ১৮ ফুট উঁচু বন্দনা মূর্তি।

ভিক্ষুদের ভাষ্য মতে, খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে গৌতম বুদ্ধ তাঁর প্রধান শিষ্য আনন্দকে নিয়ে এই পাহাড়ের ওপর বিশ্রাম নিয়েছিলেন এবং ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে ভবিষ্যতে এখানে একটি স্তূপ নির্মিত হবে। এরপর সময়ের বিবর্তনে এই স্থানটি বৌদ্ধদের পবিত্র তীর্থ স্থানে পরিণত হয়।

রাংকূট বিহারে প্রতি বছর বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে দর্শণার্থীরা আসেন
প্রথম আলো

পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা

বিহারের পরিদর্শন বই ঘেঁটে দেখা গেছে, গত কয়েক বছরে মহাবিহার পরিদর্শন করেন রাশিয়া, চীন, ফ্রান্স, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কোরিয়া, ইতালি, ডেনমার্ক, কসোভো, পাকিস্তান, ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ভিয়েতনাম, ভ্যাটিকান, ভুটান, স্পেন, আর্জেন্টিনা, লিবিয়া, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া, মিসরসহ বিভিন্ন দেশের কয়েক শ মানুষ। তার মধ্যে বাংলাদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রধান ও মিশন প্রধানরা রয়েছেন। গত বছরের ২২ নভেম্বর রাংকূট মহাবিহার পরিদর্শন করেন ব্রাজিল ও রাশিয়ার একদল গবেষক ও পর্যটক।

প্রতিবছর মে মাসে মহাবিহারে আয়োজন করা হয় ‘বুদ্ধ বর্ষ বরণ’ উৎসব। পার্বত্য জেলা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ছাড়াও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে উৎসবে ছুটে আসেন লাখো পূজারি।