কক্সবাজারে বন্ধ ৬০০ মহাল, যে কারণে কমছে শুঁটকি উৎপাদন
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, অতিরিক্ত মাছ আহরণ, নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার, সাগরদূষণসহ ছয়টি কারণে সাগরে মাছের প্রাপ্যতা কমেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে কক্সবাজারের শুঁটকি উৎপাদনে।
দেশের অন্যতম বৃহৎ শুঁটকি উৎপাদনের মহাল (খামার) গড়ে উঠেছে কক্সবাজার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের নাজিরারটেক এলাকায়। সমুদ্র উপকূলীয় এ এলাকায় ছোট–বড় ৭০০টি মহালে প্রতি মৌসুমে উৎপাদিত হয় প্রায় ৫৫ হাজার মেট্রিক টন শুঁটকি, যার বাজারমূল্য প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা। কিন্তু গত কয়েক মাসে মহালগুলোয় শুঁটকির উৎপাদন ক্রমান্বয়ে কমছে। মূলত সাগরে কম মাছ ধরা পড়ায় শুঁটকির উৎপাদন কমছে।
সাগরে কম মাছ ধরা পড়া ও শুঁটকির উৎপাদন কমার কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে নাজিরারটেক মহালের ১০ জন মহালমালিক, ৯ জন শুঁটকি ব্যবসায়ী, ১৫ জন পর্যটক, পরিবেশ অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, মৎস্য কর্মকর্তা, ট্রলারমালিক ও জেলেদের সঙ্গে কথা হয় প্রথম আলোর। মাছ ও শুঁটকির উৎপাদন কমার পেছনে ছয়টি কারণের কথা জানিয়েছেন তাঁরা।
এগুলো হলো, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বঙ্গোপসাগরে ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ (ঘূর্ণিঝড়, নিম্নচাপ, লঘুচাপ) সৃষ্টি, ট্রলিং জাহাজের বেপরোয়া মাছ আহরণ, নিষিদ্ধ কারেন্ট জালে মাছের পোনা ধ্বংস, উপকূলে জাটকা ইলিশ নিধন, সাগরের পানিদূষণ ও লবণাক্ততার পরিমাণ বৃদ্ধি।
কক্সবাজার শুঁটকি প্রক্রিয়াজাত ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি মো. জয়নাল আবেদীন প্রথম আলোকে বলেন, সাত মাস ধরে কক্সবাজার উপকূলে ইলিশ দূরের কথা, অন্যান্য প্রজাতির সামুদ্রিক মাছও তেমন ধরা পড়ছে না। আগে ট্রলারের জালে ধরা পড়া মাছের উল্লেখযোগ্য অংশ নাজিরারটেক, নুনিয়াছটা, মগচিতাপাড়াসহ বিভিন্ন উপকূলের শুঁটকি মহলে চলে যেত। সেখানে শুঁটকি তৈরি হতো। এখন মাছ নেই, তাই শুঁটকি উৎপাদনও দ্রুত কমছে। কাঁচা মাছের সংকটের কারণে প্রায় ৬০০ মহালে শুঁটকি উৎপাদন বন্ধ আছে।
জয়নাল আবেদীন বলেন, এখন শতাধিক মহালে যে শুঁটকি উৎপাদিত হচ্ছে, তার ৮০ শতাংশ কাঁচা মাছ সংগ্রহ করা হচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে। এসব মাছ আমদানি করা হচ্ছে ভারত ও ওমান থেকে। অবশিষ্ট ২০ শতাংশ শুঁটকি উৎপাদিত হচ্ছে কক্সবাজার উপকূলের মাছ দিয়ে।
সমিতির দেওয়া তথ্যমতে, গত বছর ৭০০ মহালে উৎপাদিত হয়েছিল ৫৫ হাজার মেট্রিক টন শুঁটকি। চলতি মৌসুমের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) শুঁটকির উৎপাদন হয়েছে প্রায় ২০ হাজার মেট্রিক টন। সাগরে মাছ ধরা না পড়লে চলতি মৌসুমে শুঁটকির উৎপাদন অর্ধেক কমে আসতে পারে।
কক্সবাজার ফিশিংবোট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন বলেন, টেকনাফ, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, পেকুয়া, চকরিয়াসহ জেলার ৯টি উপজেলায় সাগরে মাছ ধরার ট্রলার আছে প্রায় ৬ হাজার। কিন্তু গত ছয়-সাত মাস ৮০ শতাংশ ট্রলারের জালে তেমন মাছ ধরা পড়েনি। বলতে গেলে বঙ্গোপসাগর থেকে ইলিশসহ অন্যান্য সামুদ্রিক মাছ উধাও হয়ে গেছে। কক্সবাজার উপকূল থেকে মাছ কেন উধাও হচ্ছে, তার কারণ অনুসন্ধানে গবেষণা দরকার।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. নাজমুল হুদা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবসহ নানা কারণে সাগরে মাছের আহরণ অনেক কমেছে। এ কারণে শুঁটকির উৎপাদনও কমে যাচ্ছে। গত ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে কক্সবাজারে শুঁটকি উৎপাদিত হয়েছিল ৪৮ হাজার ২৮৫ মেট্রিক টন, যার বাজারমূল্য ৩০০ থেকে ৩৫০ কোটি টাকা। চলতি ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর) শুঁটকির উৎপাদন হয়েছে ১১ হাজার মেট্রিক টনের বেশি।
বিদেশি মাছনির্ভর শুঁটকি উৎপাদন
পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের নাজিরারটেক সড়কের পশ্চিম পাশে গেলে চোখে পড়ে ‘রাঙাবালি শুঁটকি মহাল’। ভেতরে ২০টি বাঁশের মাচায় শুকানো হচ্ছে ছুরি, ফাইস্যা, কামিলা, পোপা, মাইট্যা মাছ। তিনজন নারী শ্রমিক মাছগুলো রোদে উল্টেপাল্টে দিচ্ছিলেন। মহালের মালিক স্থানীয় কুতুবদিয়া পাড়ার বাসিন্দা ফজল কাদের বলেন, এখন শুঁটকি উৎপাদনের ভরমৌসুম। কিন্তু কক্সবাজার উপকূলে মাছ নেই। চট্টগ্রাম থেকে কাঁচা মাছ কিনে এনে মহালে শুঁটকি করা হচ্ছে। গত বছর এই মহালে প্রায় ৫০০ মেট্রিক টন শুঁটকি উৎপাদিত হয়েছিল। এবার ২০০ টন হয় কি না, সন্দেহ।
মহালে উৎপাদিত শুঁটকি বিক্রি হচ্ছে পাশের একটি দোকান রাঙাবালি শুঁটকি শপে। দোকানে প্রতি কেজি ছুরি শুঁটকি বিক্রি হচ্ছে ৬০০ থেকে ২৫০০ টাকায়, লইট্যা ৭০০ থেকে ১২০০ টাকায়, লাক্ষা ২ হাজার (ওমান থেকে আনা) এবং স্থানীয় ৩ হাজার ২০০ টাকায়, কোরাল ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায়, পোপা ২৫০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকায়, কামিলা (বাইন) ৮০০ টাকায়, চিংড়ি ৩০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায়, ফাইস্যা, ছিটকিরি, মলাসহ ছোট মাছ ২৫০ থেকে ৬০০ টাকায়। দোকানের পরিচালক মো. তানভির বলেন, বিদেশি মাছে শুঁটকি তৈরি করতে হয় বলে শুঁটকির দাম দ্বিগুণ হয়ে গেছে।
নাজিরারটেক, কুতুবদিয়াপাড়া, সমিতিপাড়া, ফদনারডেইল, মোস্তাইক্যাপাড়া, বাসিন্যাপাড়াসহ ১ নম্বর ওয়ার্ডের ১৮টি উপকূলীয় পল্লিতে অন্তত ৭০ হাজার জলবায়ু–উদ্বাস্তু পরিবারের বসবাস। এর মধ্যে অন্তত ৪৫ হাজার নারী-পুরুষ শুঁটকি মহালে শ্রমিকের কাজ করেন। ১ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর আকতার কামাল বলেন, মাছের সংকটের কারণে ইতিমধ্যে ৮০ শতাংশ মহালে শুঁটকি উৎপাদন বন্ধ থাকায় অন্তত ৪০ হাজার শ্রমজীবী মানুষ অর্থসংকটে পড়েছেন। অনেকে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন।
নাজিরারটেক বহুমুখী মৎস্য ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সদস্যসংখ্যা ৯৭১। সমিতির বাইরে শুঁটকির ব্যবসা করেন আরও অন্তত ১ হাজার ব্যবসায়ী। প্রতিবছর ব্যবসায়ীরা নাজিরারটেকের শুঁটকি চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করছেন। সমিতির সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমান বলেন, টানা কয়েক দিন ছুটি পড়লে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে ভিড় জমান তিন থেকে চার লাখ পর্যটক। বছরে আসেন ৬০ থেকে ৭০ লাখ মানুষ। এর ৫০ শতাংশ পর্যটক বাড়ি ফেরার সময় কয়েক কেজি করে শুঁটকি কিনে নিয়ে যান। প্রতিবছর শুঁটকির চাহিদা ৫৫ হাজার মেট্রিক টনের বেশি হলেও কাঁচা মাছের সংকটের কারণে চাহিদার অর্ধেকও উৎপাদন করা যাচ্ছে না।
সংকটে শ্রমিকেরা
নাজিরারটেক, কুতুবদিয়াপাড়া, সমিতিপাড়া, ফদনারডেইল, মোস্তাইক্যাপাড়া, বাসিন্যাপাড়াসহ ১ নম্বর ওয়ার্ডের ১৮টি উপকূলীয় পল্লিতে অন্তত ৭০ হাজার জলবায়ু-উদ্বাস্তু পরিবারের বসবাস। এর মধ্যে অন্তত ৪৫ হাজার নারী-পুরুষ শুঁটকি মহালে শ্রমিকের কাজ করেন।
১ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর আকতার কামাল বলেন, মাছের সংকটের কারণে ইতিমধ্যে ৮০ শতাংশ মহালে শুঁটকি উৎপাদন বন্ধ থাকায় অন্তত ৪০ হাজার শ্রমজীবী মানুষ অর্থসংকটে পড়েছেন। অনেকে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন।
একটি মহালে কথা হয় শুঁটকিশ্রমিক মায়েশা বেগমের সঙ্গে। সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত টানা ১২ ঘণ্টা কাজ করে মায়েশা মজুরি পান ৫০০ টাকা। এ টাকায় ছয় সদস্যের সংসার চলে না জানিয়ে মায়েশা বেগম (৪০) প্রথম আলোকে বলেন, নাজিরারটেকের কয়েক শ মহাল বন্ধ আছে, কাজের খুবই অভাব। ৫০০ টাকায় কাজ না করলে ঘরের সবাইকে না খেয়ে থাকতে হবে।