হাকালুকি হাওরপারের বাতাসে ভেজা–পচা ধানের গন্ধ

রোদ উঠায় সড়কে ভেজা ধান শুকানোর তোড়জোড়। সোমবার মৌলভীবাজারের জুড়ীর উত্তর জাঙ্গিরাই-খালেরমুখ বাজার সড়কেছবি: প্রথম আলো

মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার হাকালুকি হাওরপারের উত্তর জাঙ্গিরাই এলাকায় পাকা সড়কের এক পাশে বসে চুলায় বড় ডেকচিতে (সিলভারের পাতিল) ধান সেদ্ধ করছিলেন জমিলা খাতুন নামের এক নারী। পাশে বেশ কিছু ভেজা ধান স্তূপ করে রাখা। জমিলার স্বামী কৃষক ফুল মিয়া পাশের হাকালুকি হাওরে ১৫ বিঘা জমিতে বোরো ধানের আবাদ করেছেন। কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে অন্যদের মতো তাঁদের জমিও তলিয়ে যায়। কিছু ধান কেটে আনেন। কিন্তু রোদের অভাবে শুকানো যাচ্ছিল না। প্রায় অর্ধেক ধান অঙ্কুরিত হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে ভেজা ধান সেদ্ধ করে রক্ষার চেষ্টা চালাচ্ছেন।

চুলায় আগুন দিতে দিতে জমিলা বললেন, ‘ছয়-সাত দিন ধরি রোদ নাই, খালি মেঘ-বৃষ্টি অর (হচ্ছে)। ধান মাড়া (মাড়াই) দিয়া হুকানি গেছে না। ভিজা ধান জালা (অঙ্কুরিত) অই গেছে। চউখের সামনে ধানটা নষ্ট অই যার (যাচ্ছে)। ভিজা ধানরে বাঁচাইবার লাগি সিদ্ধ দিয়ার, শুকাইতে না পারলে এইটাও নষ্ট অই যাইব।’

একপর্যায়ে জমিলার স্বামী ফুল মিয়া সেখানে হাজির হন। ফুল মিয়া জানালেন, হাওরে ১৫ বিঘা জমিতে বোরো ধানের আবাদ করেন। সব জমির ফসল পানির নিচে চলে যায়। এর মধ্যে তিন বিঘা অথই পানিতে থাকায় ধান কেটে আনা সম্ভব হয়নি।

সড়ক দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন স্থানীয় বাসিন্দা স্কুলশিক্ষক রফিকুল ইসলাম। তিনি বললেন, এবারের মতো হাওরের ফসলের ক্ষতি কয়েক বছরের মধ্যে হয়নি।

উত্তর জাঙ্গিরাই গ্রাম থেকে হাকালুকি হাওরের পাশ ঘেঁষে নয়াগ্রাম খালেরমুখ বাজার সেতু পর্যন্ত একটি আরসিসি সড়ক গেছে। গতকাল সোমবার বিকেলের দিকে গিয়ে দেখা য়ায়, আবহাওয়া অন্য দিনের চেয়ে ভালো। দুপুরে কয়েক ঘণ্টা রোদ ছিল। পুরো সড়কের দুই পাশে কয়েক হাত পরপর ভেজা ধানের স্তূপ। বাতাসে ভেজা, পচা ধানের গন্ধ ছড়াচ্ছিল। সেখানে কেউ যন্ত্রে ধান মাড়াই করছিলেন আবার কেউ রাস্তায় ধান শুকাচ্ছিলেন।

নয়াগ্রাম বাজারের কাছে জুড়ী নদীতে ধানবোঝাই একটি নৌকা থেকে কয়েকজন শ্রমিক ভেজা ধানের আঁটি মাথায় করে নিয়ে সড়কের পাশে স্তূপ করছিলেন। সেখানে দাঁড়ানো সুফিয়া বেগম জানালেন, ধানগুলো তাঁদের জমির। পাশের বাছিরপুর গ্রামে তাঁদের বাড়ি। হাওরে তিন বিঘা জমির ধান ডুবে যায়। শ্রমিকদের দিয়ে এক বিঘার ধান কেটে এনেছেন।

সুফিয়া খাতুন নামের এক গৃহিণী বলেন, ‘চাইরজন (চার) কামলা লাগাইছি, আগে কামলার রোজ আছিল ৭০০-৮০০ টেকা (টাকা)। অখন লাগে ১ হাজার টেকা (টাকা)। ধান আনতে নৌকা লাগে। ছোট নৌকার ভাড়া ১ হাজার, বড় নৌকার ২ হাজার টেকা। পানিত থাকতে থাকতে ধান হিজি (ভিজা) গেছে। অখন মেশিনে মাড়া দিয়া হুকানি লাগব। টিকানি যাইবনি অউটাউ চিন্তা করিয়ার।’

দুপুরে রোদ ওঠায় নয়াগ্রামের আরসিসি রাস্তায় আশপাশের লোকজনের ধান শুকানোর ধুম পড়ে। নারীরা শুকাতে দেওয়া ধান পা দিয়ে নেড়ে দিচ্ছিলেন। মিনারা বেগম নামের এক নারী বললেন, ‘মানুষর কষ্ট দেখিয়া আল্লাহ দিন ভালা করছইন (রোদ ওঠা)। অলা তিন-চার দিন থাকলেই অইলো।’

সড়কে যন্ত্রে ধান মাড়াই চলছে। মৌলভীবাজারের জুড়ীর নয়াগ্রামে
ছবি: প্রথম আলো

খালেরমুখ বাজারের পাশ দিয়ে জুড়ী নদীর সঙ্গে যুক্ত একটি ছোট খাল হাকালুকি হাওরে গিয়ে মিশেছে। ওই খাল দিয়ে ধানবোঝাই একটি নৌকায় রশি বেঁধে টেনে টেনে আনছিলেন দক্ষিণ কালনীগড় গ্রামের তরুণ রাজু দাস। কয়েক দিনের বৃষ্টিতে খালের পাড়ের কাঁচা রাস্তা কাদায় একাকার অবস্থা। ওই রাস্তারও দুই পাশে ভেজা ধানের স্তূপ লেগে আছে।

রাজু জানালেন, হাওরে তাঁদের সাড়ে ১৪ বিঘার মধ্যে ৯ বিঘা জমির ফসল পানির নিচে। বৈরী আবহাওয়ার মধ্যেও চার দিন ধরে সাতজন শ্রমিক দিয়ে ৫ বিঘার ধান কাটাতে পেরেছেন। রাজু বলেন, ‘মেহনত করি খেত করছি। খেতের ধানে ঘরে বছরর খানি চলে। কিছু বেচতামও। ধান লাগানি, কাটানির খরচ হিসাব করলে অনেক টেকা। ধানটা ঘরো তুলতে পারলেউ শান্তি।’

হাওরে ওই অংশের ফসলের ক্ষয়ক্ষতির কারণ হিসেবে সেচের অভাবে দেরিতে চাষাবাদ শুরু করাকে দায়ী করেন উত্তর জাঙ্গিরাই এলাকার বাসিন্দা গবাদিপশুর খামারি হাবিবুর রহমান। তিনি বলেন, বোরো মৌসুমের শুরুতে উপজেলা সদরের উত্তর ভবানীপুর এলাকায় জুড়ী নদীতে মাটির বাঁধ স্থাপন করে কণ্ঠিনালা শাখা নদী দিয়ে পানি ছেড়ে দেওয়া হয়। এতে হাওরের একাংশের কৃষকেরা সেচসুবিধা পান। সঠিক সময়ে চাষাবাদ করে তাঁরা ফসল ঘরে তুলতে পারেন। এদিকে দেরিতে বাঁধ অপসারণ করায় এ এলাকায় ধান আবাদে দেরি হয়ে যায়। ফসলও দেরিতে আসে। তখন আগাম বন্যায় প্রায়ই ফসলহানি ঘটে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল আলম খান গতকাল সোমবার বিকেলে হাওরের ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখেন। নয়াগ্রাম এলাকায় দেখা হলে তিনি বললেন, উপজেলার ৬ হাজার ১৭০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। অতিবৃষ্টি ও উজানের পাহাড়ি ঢলে হাকালুকি হাওরের ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ ধান পানির নিচে চলে গেছে। যাঁরা ধান কাটতে পেরেছেন, রোদের অভাবে শুকাতে পারছেন না। প্রায় প্রতিদিনই বৃষ্টি হচ্ছে। অনেকের ধান চারা হয়েও যাচ্ছে। কৃষি বিভাগ উপজেলায় প্রায় আড়াই হাজার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা তৈরির কাজ করছে। তাঁদের প্রণোদনা দিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হবে।