‘ছেলের আয়েই আমাদের সংসার চলে, সেই-ই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত’

ডেঙ্গু আক্রান্ত মো. তারেককে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। গতকাল চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেছবি: জুয়েল শীল

‘দুই দিন ধরে ঘরে শুয়ে ছিল। এর মধ্যে ডেঙ্গু ধরা পড়েছে। জ্বর বেড়ে যাওয়ায় রাতে তাকে হাসপাতালে নিয়ে আসি। চিকিৎসক বেশ কিছু পরীক্ষা করতে বলেছেন। কিন্তু টাকার অভাবে সেসব পরীক্ষা করাতে পারছি না। ছেলের আয়েই আমাদের সংসার চলে, সেই-ই এখন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত।’

কথাগুলো বলতে বলতে থেমে গেলেন হোসনে আরা বেগম। তাঁর চোখেমুখে ছেলেকে নিয়ে উদ্বেগ। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার বাসিন্দা হোসনে আরা বেগম গত সোমবার রাতে ডেঙ্গু আক্রান্ত ছেলে মো. তারেককে (৩২) নিয়ে হাসপাতালে আসেন।

ছেলের পুরো শরীরে ব্যথা। কথাও ঠিকমতো বলতে পারছে না। জ্বর আসে, আবার কমে। শরীর খুব দুর্বল হয়ে গেছে। কিছু খেতেও পারছে না। একটিমাত্র ছেলে আমার। তার এমন অসুস্থতায় আমরা সবাই দুশ্চিন্তায় আছি। মেয়েটাকে তার বাবার কাছে রেখে এসেছি।
হোসনে আরা বেগম, মো. তারেকের মা।

তারেক ভাসমান সবজি বিক্রেতা। প্রতিদিনের আয় দিয়েই চলে তাঁর পরিবারের প্রয়োজনীয় খরচ। তাঁর বাবা বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী। বাবা, মা ও বোনকে নিয়ে চারজনের পরিবারের মূল ভরসা তিনি।

তারেক হাসপাতালে শয্যায় থাকার কারণে পরিবারটির আয়-উপার্জন বন্ধ। এর মধ্যে তারেকের চিকিৎসা করাতে এসে অর্থসংকটে হিমশিম খেতে হচ্ছে পরিবারের সদস্যদের। টাকার অভাবে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষাও করাতে পারছেন না।

হোসনে আরা বেগম বলেন, ‘ছেলের পুরো শরীরে ব্যথা। কথাও ঠিকমতো বলতে পারছে না। জ্বর আসে, আবার কমে। শরীর খুব দুর্বল হয়ে গেছে। কিছু খেতেও পারছে না। একটিমাত্র ছেলে আমার। তার এমন অসুস্থতায় আমরা সবাই দুশ্চিন্তায় আছি। মেয়েটাকে তার বাবার কাছে রেখে এসেছি।’

সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে নগরের বাসিন্দা ১ হাজার ৮৬ জন। চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলার বাসিন্দা রয়েছেন ১ হাজার ১৩৪ জন। এর বাইরে অন্যান্য জেলা থেকে চট্টগ্রামের হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ৩২৪ জন।

হোসনে আরা বেগমের দুশ্চিন্তা শুধু ছেলেকে সুস্থ করে ঘরে ফেরানো নিয়ে নয়, ছেলেটি সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত সংসারের চাকা কীভাবে চলবে, তা নিয়েও। হোসনে আরা বেগম বলেন, ‘পরীক্ষা-নিরীক্ষাগুলো করাতে পারছি না। আত্মীয়স্বজনের কয়েকজনকে ফোন করার কথা ভাবছি। যদি তাঁদের কাছ থেকে কিছুটা সহযোগিতা পাওয়া যায়।’

চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর গতকাল পর্যন্ত চট্টগ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ২ হাজার ৫৪৮ জন। মো. তারেক যে উপজেলা থেকে এসেছেন; সেই কর্ণফুলী উপজেলায় আক্রান্ত হয়েছেন ১৭৬ জন। জেলার ১৫ উপজেলার মধ্যে এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। সর্বোচ্চ ৩১১ জন আক্রান্ত হয়েছেন সীতাকুণ্ড উপজেলায়। এ বছর মোট আক্রান্তের ৪৪ শতাংশই নগরের বাইরের বিভিন্ন উপজেলার বাসিন্দা।

ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে সাত দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন আবুল হাশেম
ছবি: জুয়েল শীল

মো. তারেকের পাশের শয্যায় ছিলেন আবুল হাশেম (৫৫)। সীতাকুণ্ডের ছোট কুমিরা থেকে এসেছেন তিনি। বন থেকে শুকনো কাঠ সংগ্রহের পর বিক্রি করে সংসার চালান। পাঁচ সদস্যের পরিবার তাঁর। প্রতিদিনের আয় দিয়েই যেখানে তাঁকে সংসারের খরচ চালাতে হয়, সেখানে তিনি অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ায় বিপাকে পড়তে হয়েছে পরিবারের সদস্যদের।

সাত দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি আবুল হাশেম। জ্বর কমে গেলেও শরীরের দুর্বলতা এখনো কাটেনি। অসুস্থ শরীর নিয়ে হাসপাতালের শয্যায় পড়ে আছেন তিনি। কবে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে কাজে ফিরতে পারবেন, সেটিও অনিশ্চিত।

সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে নগরের বাসিন্দা ১ হাজার ৮৬ জন। চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলার বাসিন্দা রয়েছেন ১ হাজার ১৩৪ জন। এর বাইরে অন্যান্য জেলা থেকে চট্টগ্রামের হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ৩২৪ জন। ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে প্রায় এক হাজার রোগী চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। এ বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে ছয়জনের। এর মধ্যে পাঁচজন বেসরকারি হাসপাতালে ও একজন চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে মারা গেছেন।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন বলেন, এ বছর আক্রান্তের হার বেশি হলেও মৃত্যুহার কম। আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। রোগীদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হাসপাতাল প্রস্তুত রয়েছে।