তিন দিনেই উঠে গেল নতুন সড়কের পিচ, সংস্কারকাজ বন্ধ করে দিলেন এলাকাবাসী

সড়কের পিচ তুলে দেখাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। আজ বিকেলে খুলনার কয়রা উপজেলার মহারাজপুর ইউনিয়নের মাদারবাড়িয়া-রোনবাগ সড়কেছবি: প্রথম আলো

নির্মাণের মাত্র তিন দিনের মাথায় নতুন সড়কের পিচ হাতের চাপে উঠে যাচ্ছে। কোথাও সামান্য টান দিতেই খসে পড়ছে কার্পেটিংয়ের আস্তরণ। এমন দৃশ্য দেখে ক্ষুব্ধ হয়ে আজ মঙ্গলবার বিকেলে খুলনার কয়রা উপজেলার মহারাজপুর ইউনিয়নের মাদারবাড়িয়া-রোনবাগ সড়কের পিচ ঢালাইয়ের কাজ বন্ধ করে দিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের অভিযোগ, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার ও নিয়ম না মেনে কাজ করায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

আজ বিকেল পাঁচটার দিকে সরেজমিন দেখা যায়, মাদারবাড়িয়া থেকে রোনবাগ গ্রাম পর্যন্ত এক কিলোমিটার সড়কের বিভিন্ন স্থানে নতুন কার্পেটিংয়ে ফাটল ধরেছে। কোথাও কোথাও হাতের সামান্য চাপেই উঠে আসছে পিচের আস্তরণ। সড়কের ওপর একটি রোলার গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকলেও সেখানে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কোনো কর্মী ছিলেন না। স্থানীয় বাসিন্দারা সড়কের নতুন পিচ হাত দিয়ে তুলে দেখাচ্ছিলেন। সড়কের মাঝামাঝি অংশে নতুন একটি আরসিসি বক্স কালভার্ট নির্মাণ করা হয়েছে। তবে তার পাশেই ভঙ্গুর অবস্থায় পড়ে আছে পুরোনো একটি কালভার্ট। প্রকল্প এলাকায় কোনো তথ্যফলক বা সাইনবোর্ড দেখা যায়নি।

স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, পুরোনো কালভার্ট অপসারণ না করেই তার ওপর দিয়ে পিচ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। কয়েক দিন ধরে সড়কে পিচ ঢালাইয়ের কাজ চলছিল। তিন দিন আগে দেওয়া পিচের বিভিন্ন অংশ উঠে যেতে শুরু করলে আজ বাকি অংশে পিচ ঢালাইয়ের সময় এলাকাবাসী বাধা দেন।

মহারাজপুর ইউনিয়নের ইউপি সদস্য জামাল ফারুক বলেন, রাস্তার ওপর খুবই পাতলা করে পিচ দেওয়া হয়েছে। পিচের নিচের অংশ পরিষ্কার না করেই ধুলাবালু ও মাটির ওপর ঢালাই করা হয়েছে। তিন দিন আগে দেওয়া পিচ এখন হাত দিলেই উঠে যাচ্ছে। আজ আবার ধুলাবালুর ওপর পিচ দেওয়া শুরু হলে এলাকাবাসী বাধা দেন। প্রতিবাদস্বরূপ স্থানীয় লোকজন সড়কের দুটি স্থানের কিছু অংশের পিচ তুলে ফেলেছেন। পরে সেই ছবি ও ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে।

সড়কের পাশের বাসিন্দা মো. শহিদুল বলেন, ‘আমার বাড়ির পাশে রাস্তা, তারপর খাল। খালের পাড়ঘেঁষা অংশটা অনেক নিচু। সেখানে আজ পিচ দেওয়ার পর রোলার চালাতেই ফাটল ধরিছে। এভাবে কাজ হলি বর্ষার সময় সড়কের ওই অংশ ধসে পড়বেনে।’

মহারাজপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা তরিকুল ইসলাম বলেন, কাজ শুরুর পর থেকেই নিম্নমানের ইটের খোয়া ব্যবহারের অভিযোগ ছিল। স্থানীয় লোকজনের প্রতিবাদের মুখে একবার সেই খোয়া অপসারণও করা হয়েছিল। দীর্ঘদিন কাজ ফেলে রাখার পর আবার পিচ ঢালাই শুরু করা হয়েছে, কিন্তু সেই কাজের মান নিয়েও এখন প্রশ্ন উঠেছে।

কয়রা উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, পল্লি অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় মাদারবাড়িয়া উত্তর সীমানা থেকে রোনবাগ সড়কের এক কিলোমিটার উন্নয়ন, একটি আরসিসি বক্স কালভার্ট নির্মাণ ও বেদকাশী এলাকার প্রায় দেড় কিলোমিটার সড়কের উন্নয়নকাজ একই প্যাকেজের আওতায় বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ২০২৪ সালের মার্চ মাসে ‘মেসার্স কামরুল অ্যান্ড ব্রাদার্স’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ২ কোটি ৬৩ লাখ ৯৯ হাজার টাকার কাজটি পায়। কাজের মেয়াদ ছিল ২০২৪ সালের ৩ এপ্রিল থেকে ১৪ নভেম্বর পর্যন্ত। তবে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হয়নি।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে কাজের দায়িত্বে থাকা মো. হাসান অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘এলজিইডির নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করা হচ্ছে। আমাদের কাজে বড় ধরনের কোনো ত্রুটি নেই। রাস্তার ওপরের অংশ কিছুটা উঠে যাওয়াকে অনেকেই সমস্যা ভাবছেন। কিন্তু এটি কাজের একটি ধাপ। প্রথমে লেভেলিং করা হয়, পরে সিল কোট দেওয়া হয়। এখনো আরও এক দফা পিচ দেওয়া হবে। তখন রাস্তা মজবুত হবে। মূলত ভুল-বোঝাবুঝি থেকেই এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।’

কয়রা উপজেলা এলজিইডির উপসহকারী প্রকৌশলী আফজাল হোসেন বলেন, বিটুমিন ঢালাইয়ের পর রাস্তা পুরোপুরি মজবুত হতে অন্তত সাত দিন সময় প্রয়োজন। তবে কাজে প্রাইম কোট না দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ জন্য পুরোনো প্রাইম কোটের ওপর কার্পেটিং না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিটুমিন দেওয়ার পরও ঢালাই উঠে যাওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। সরেজমিন তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।