চাঁদপুরে বেওয়ারিশ লাশ বহনের দুটি অ্যাম্বুলেন্স বিকল, ভোগান্তি

স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘আঞ্জুমানে খাদেমুল ইনসান’এর অ্যাম্বুলেন্স দুটি দীর্ঘদিন ধরে পড়ে আছে। ফলে অটোরিকশা বা খোলা ভ্যানে করে লাশ বহন করতে হয়।

চাঁদপুর বাসস্ট্যান্ড মসজিদ–সংলগ্ন স্থানে আঞ্জুমানে খাদেমুল ইনসানের একটি অ্যাম্বুলেন্স ঢেকে রাখা হয়েছে। গত ১৭ আগস্ট বিকেলেছবি: প্রথম আলো

চাঁদপুরে বেওয়ারিশ লাশ উদ্ধার হলেই দাফনের জন্য ডাক পড়ে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘আঞ্জুমানে খাদেমুল ইনসানের’। এই কাজের জন্য সংস্থাটির দুটি অ্যাম্বুলেন্স আছে। কিন্তু অ্যাম্বুলেন্স দুটি দীর্ঘদিন ধরে নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। এতে বিপাকে পড়েছে বেওয়ারিশ লাশ নিয়ে কাজ করা সরকারি বিভিন্ন দপ্তর। অ্যাম্বুলেন্স সেবা না থাকায় লাশ বহন করা হচ্ছে খোলা অটোরিকশা বা ভ্যানে করে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলায় প্রতি মাসে গড়ে পাঁচটি বেওয়ারিশ লাশ আঞ্জুমানে খাদেমুল ইনসানের সহায়তায় চাঁদপুর পৌর কবরস্থানে দাফন করা হয়। কোনো মাসে এর সংখ্যা কমবেশিও হয়। নৌ দুর্ঘটনা এবং বিভিন্ন থানা থেকে আসা এসব লাশের গোসল, কাফন ও দাফনের কাজ আঞ্জুমানে খাদেমুল ইনসানই করে থাকে।

১৯৫২ সালে সাবেক সংসদ সদস্য মরহুম আবদুল করিম পাটওয়ারীর উদ্যোগে চাঁদপুরে প্রতিষ্ঠিত হয় স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘আঞ্জুমানে খাদেমুল ইনসান’। প্রতিষ্ঠার পর থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তিনি সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ২০০১ সালে তাঁর বড় ছেলে চাঁদপুর জেলা আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) নেতা আবু নঈম দুলাল পাটওয়ারী দায়িত্ব নেন। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে তিনি পলাতক আছেন। ২০২৫ সালের জুলাই থেকে সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে গঠিত ১৭ সদস্যবিশিষ্ট নতুন কমিটি সংস্থাটির দায়িত্ব গ্রহণ করে। সংস্থার বর্তমান সভাপতি রুহুল আমিন সরকার বলেন, ‘দায়িত্ব নেওয়ার পর আমরা একটি অ্যাম্বুলেন্স কুমিল্লা থেকে নিয়ে আসি, যা বর্তমানে হাজীগঞ্জের একটি গ্যারেজে মেরামতের জন্য আছে। অপরটি পুরোনো হওয়ায় অচল অবস্থায় রয়েছে। একজন ম্যানেজার নিয়োগ করেছি, যিনি সব হিসাব-নিকাশ রাখছেন। তবে সংস্থার পূর্বের কোনো হিসাব আমাদের কাছে নেই।’

দায়িত্ব নেওয়ার পর আমরা একটি অ্যাম্বুলেন্স কুমিল্লা থেকে নিয়ে আসি, যা বর্তমানে হাজীগঞ্জের একটি গ্যারেজে মেরামতের জন্য আছে। অপরটি পুরোনো হওয়ায় অচল অবস্থায় রয়েছে।
রুহুল আমিন সরকার, সভাপতি, আঞ্জুমানে খাদেমুল ইনসান, চাঁদপুর

আঞ্জুমানে খাদেমুল ইনসান সূত্রে জানা যায়, বেওয়ারিশ লাশ বহনের জন্য ২০১৪ সালে সংস্থাটি ১৭ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি অ্যাম্বুলেন্স কেনে। ২০১৯ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী আরেকটি অ্যাম্বুলেন্স প্রদান করেন। দুটি অ্যাম্বুলেন্সই সংস্থার তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আবু নঈম দুলাল পাটওয়ারীর নিয়ন্ত্রণে ছিল। তিনি কার্যক্রম নিষিদ্ধ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকও। আয়-ব্যয়সহ সবকিছুই তিনি দেখাশোনা করতেন এবং তাঁর নিজস্ব চালকেরাই এগুলো চালাতেন।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ সালের ১১ মে বিকেলে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার চান্দিনা এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয় অনুদান পাওয়া অ্যাম্বুলেন্সটি। তখন পুলিশ অ্যাম্বুলেন্স থেকে ৬০৯ বোতল ফেনসিডিল উদ্ধার করে। সে সময় গাড়িটির চালক ছিলেন আবু নঈম দুলাল পাটওয়ারীর নিজস্ব চালক হারুন। দুর্ঘটনার পরই তিনি পালিয়ে যান। দীর্ঘদিন কুমিল্লায় পড়ে থাকার পর গাড়িটি চাঁদপুরে এনে মেরামত করে পুনরায় চালু করা হয়েছিল। ২০২৫ সালের ৫ সেপ্টেম্বর সেই অ্যাম্বুলেন্সেই এক মানসিক ভারসাম্যহীন নারীকে (২৪) ধর্ষণের অভিযোগে নতুন চালক মো. মুরাদ হোসেনকে (৩৭) গ্রেপ্তার করে পুলিশ। চাঁদপুর শহরের প্রফেসরপাড়ার বাসিন্দা মুরাদ আঞ্জুমানের অ্যাম্বুলেন্সটি ভাড়ায় পরিচালনা করতেন।

একেকটি অ্যাম্বুলেন্স মেরামত করতে তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা করে প্রয়োজন। কিন্তু হাতে এত টাকা নেই।
মো. আবুল বাশার, ব্যবস্থাপক, আঞ্জুমানে খাদেমুল ইনসান, চাঁদপুর

সর্বশেষ গত জুনের প্রথম সপ্তাহে মতলব এলাকায় আরেকটি দুর্ঘটনার শিকার হয়ে অ্যাম্বুলেন্সটি বর্তমানে হাজীগঞ্জের একটি গ্যারেজে মেরামতের জন্য আছে। অন্যদিকে ২০১৪ সালে কেনা অপর অ্যাম্বুলেন্সটিও ২০২৪ সাল থেকে অকেজো অবস্থায় চাঁদপুর বাসস্ট্যান্ড মসজিদের পাশে ত্রিপল দিয়ে মুড়িয়ে রাখা হয়। গাড়িটি এখনো সেখানেই পড়ে আছে।

সংস্থাটিতে দেড় বছর ধরে ব্যবস্থাপক হিসেবে আছেন মো. আবুল বাশার। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, একেকটি অ্যাম্বুলেন্স মেরামত করতে তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা করে প্রয়োজন। কিন্তু তাঁদের হাতে এত টাকা নেই। তবে সংস্থার ব্যাংক হিসাবে ১৫ লাখ টাকার মতো থাকলেও সেই টাকা ওঠানো যাচ্ছে না। কারণ, ব্যাংকের লেনদেনের বিষয়টি সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবু নঈম দুলাল পাটওয়ারী দেখতেন। দুই বছর ধরে তিনি পালিয়ে থাকায় জরুরি প্রয়োজনেও টাকা ওঠানো যাচ্ছে না।

চাঁদপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফয়েজ আহমেদ জানান, বেশির ভাগ বেওয়ারিশ লাশের ময়নাতদন্ত করতে হয়। এসব লাশ দূরের এলাকার হলে ব্যক্তির নিজ খরচে অটোরিকশা বা সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে নিয়ে আসা হয়। তবে কাছের কোনো লাশ হলে সে ক্ষেত্রে পুলিশের নিজস্ব ডোম দিয়ে ভ্যানে করে নিয়ে আসা হয়।