স্ত্রী-সন্তানসহ বাড়ি ফিরতে চেয়েছিলেন বাবুল, ফিরলেন লাশ হয়ে

একসঙ্গে দাফন করা হয়েছে বাবুল, শাহিদা ও মেহেদীকে। কবরের পাশে আনমনে দাঁড়িয়ে বাবুলের ভাতিজা লোকমান আলী। ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলার কোষারানীগঞ্জ ইউনিয়নের রামদেবপুর ফুলবাড়ী গ্রামে
ছবি: প্রথম আলো

বছর ৩০ ধরে পোশাক তৈরির কারখানায় কাজ করতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়ে ছিলেন মুক্তার হোসেন ওরফে বাবুল (৪৭)। তাই চাকরি ছেড়ে পরিবার নিয়ে বাড়ি ফিরে আসতে চেয়েছিলেন তিনি। অবশেষে পরিবার নিয়েই বাড়ি ফিরেছেন, তবে সবাই লাশ হয়ে।

বাবুলের বাড়ি ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলার কোষারানীগঞ্জ ইউনিয়নের গরুড়া ফুলবাড়ী গ্রামে। গ্রামের মৃত সইর উদ্দিনের চার ছেলে ও তিন মেয়ের মধ্যে বাবুল সবার ছোট। গত শনিবার রাতে ঢাকার সাভারের আশুলিয়ার একটি বহুতল ভবনের ফ্ল্যাট থেকে মুক্তার হোসেন, তাঁর স্ত্রী শাহিদা বেগম (৪০) ও ছেলে মেহেদী হাসানের (১৪) গলাকাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ময়নাতদন্ত শেষে আজ সোমবার ভোরবেলায় তাঁদের লাশ বাবুলদের গ্রামের বাড়িতে এসে পৌঁছায়। পরে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে স্থানীয় কবরস্থানে তাঁদের দাফন করা হয়।

আজ বেলা ১১টার দিকে ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলার গরুড়া ফুলবাড়ী গ্রামে বাবুলদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির সামনে শামিয়ানার নিচে স্বজনরা বসে আছেন। কারও মুখে কথা নেই। বাবুলের বড় ভাই আইনুল হক বললেন, ‘সবার ছোট হওয়ার কারণে বাবুল সবার আদরের ছিল। সেই ভাইকে পরিবার নিয়ে এভাবে মরতে হবে ভাবতে পারছি না।’

আরও পড়ুন

আইনুল জানালেন, বয়স যখন ১৬ কি ১৭, তখন বাড়ি থেকে পালিয়ে চট্টগ্রাম চলে যান বাবুল। সেখানে পোশাক তৈরির একটি কারখানায় চাকরি নেন। কয়েক বছর পরে সেখানে সুমি আক্তার নামের এক সহকর্মীকে বিয়েও করেন। তাঁদের একটি ছেলেসন্তানের জন্ম হয়। একদিন কাউকে কিছু জানিয়ে নিখোঁজ হয়ে যান সুমি। এরপর ছেলে মেহেদীকে পীরগঞ্জের গ্রামের বাড়িতে রেখে ঢাকায় চলে যান বাবুল। আশুলিয়ার পোশাক তৈরি কারখানায় কাজ নেন। সেখানে শাহিদা বেগমের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। পরে বিয়ে হয় তাঁদের। শহিদার বাড়ি রাজশাহীর বাগমারা মধ্যপাড়া গ্রামে। সেই থেকে বাবুল শাহিদাকে নিয়ে আশুলিয়ার জামগড়া এলাকায় থাকতে শুরু করেন। আগের সংসারের ছেলে মেহেদী চাচার বাড়িতে থেকে লেখাপড়া করছিল। কিন্তু গত ঈদুল ফিতরের পর বাবুল ছেলেকে ঢাকায় নিয়ে যান।

বাবুলের বড় বোন মরিয়ম বেগম বললেন, ‘প্রতিবছর দুই ঈদে পরিবার নিয়ে গ্রামে আসতেন বাবুল। সবাইকে নিয়ে হইহুল্লোড় করে মেতে থাকতেন। এবারের ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)–এর আয়োজনে বাড়ি আসার কথা ছিল বাবুলের। আমরা ওদের পথ চেয়েছিলাম। কিন্তু আসবে না বলে বড় ভাইকে (আইনুল) ওরা জানিয়ে দেয়। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বাবুলের সঙ্গে তাদের শেষ কথা হয়। এরপর মুঠোফোন বন্ধ হয়ে যায়।’

পাশে বসে ছিলেন বাবুলের চাচাতো ভাই মোহাম্মদ হাজী। তিনি বললেন, বাবুলদের সঙ্গে কারও কোনো ঝামেলা ছিল না। কেন গোটা পরিবারকেই এভাবে মারা হলো? যার সঙ্গে ঝামেলা শুধু তাকেই মারলে এত কষ্ট থাকত না। ছেলেটা (মেহেদী) কী দোষ করল, যে তাকেও মেরে ফেলতে হবে।

বাবুলদের বাড়ির প্রায় ৬০০ মিটার দূরে রামদেবপুর ফুলবাড়ী কবরস্থান। সেখানে পাশাপাশি দাফন করা হয়েছে মেহেদী, বাবুল ও শহিদাকে। কবরের পাশে ছেলে লোকমান আলীকে নিয়ে কবরের বেড়া তৈরি করছিলেন বাবুলের বড় ভাই ইউসুফ আলী। লোকমান আলী বললেন, ‘মেহেদী (বাবুলের ছেলে) আমাদের সঙ্গে খেলাধুলা করত। সাত দিনের জন্য ঢাকায় গিয়ে আর ফিরে আসেনি। আজ তাকে মা-বাবার সঙ্গে কবরে রেখে দিলাম।’

ফেরার সময় বাবুলের বড় ভাই আইনুল হক ডেকে বললেন, ‘ভাইটা চাকরি ছেড়ে পরিবার নিয়ে এখানে চলে আসতে চাইছিল। আসলো তবে লাশ হয়ে।’ কথাগুলো বলতে বলতে কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে তাঁর। নিজেকে সামলে নিয়ে তিনি বলেলেন, ‘এমন মৃত্যু কেমন করে মানব।’