ককটেল–গুলির শব্দে ঘুম ভাঙল শান্তিপুর গ্রামের মানুষের, দুই পক্ষের সংঘর্ষে টেঁটাবিদ্ধ হয়ে তরুণ নিহত

সংঘর্ষের পর শান্তিপুর গ্রামে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছেছবি: সংগৃহীত

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরে দুই পক্ষের সংঘর্ষে টেঁটাবিদ্ধ হয়ে জুয়েল রানা (১৯) নামের একজন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় দুজন গুলিবিদ্ধসহ উভয় পক্ষের কমপক্ষে ২০ জন আহত হয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্ব থেকে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে বলে স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।

আজ সোমবার ভোরে বাঞ্ছারামপুর উপজেলার সোনারামপুর ইউনিয়নের শান্তিপুর গ্রামে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ঘটনাস্থল থেকে একটি বন্দুকসহ পাঁচটি গুলি ও পাঁচটি ককটেল উদ্ধার করেছে পুলিশ।

নিহত জুয়েল রানা (১৯) নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার গোপীনাথপুর গ্রামের সেন্টু মিয়ার ছেলে। তাঁর লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। একটি পক্ষের দাবি তিনি আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে এসেছিলেন।

সংঘর্ষের ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হন ফারুক মিয়া ও সোহেল মিয়া। ককটেল বিস্ফোরণে আহত হন শাহ পরান, খোকন মিয়া ও ফজর আলী। এ ছাড়া বকুল মিয়া, আশরাফুল ইসলাম, হাবি মিয়া, সুমন মিয়া, আলমগীর হোসেন ও স্বাধীন টেঁটাবিদ্ধ হয়ে আহত হন। তাঁদের মধ্যে স্বাধীনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

বাঞ্ছারামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা রঞ্জন বর্মন প্রথম আলোকে বলেন, জুয়েল রানাকে মৃত অবস্থায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আনা হয়। তাঁর পেটে ও পায়ে তিনটি টেঁটা বিদ্ধ হয়। স্বাধীন পায়ে আঘাত পেয়েছেন।

সংঘর্ষের পর পড়ে আছে দেশে তৈরি একটি বন্দুক
ছবি: সংগৃহীত

স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, শান্তিপুর গ্রামের শেবু সরকার বাড়ির সঙ্গে আধিপাত্য বিস্তার নিয়ে একই গ্রামের আজগর আলী সরকার বাড়ির দীর্ঘদিন বিরোধ চলে আসছে। পূর্ববিরোধের জেরে গত ৩০ জুন দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনার পর শেবু সরকার বাড়ির লোকজন এলাকা ছেড়ে অন্যত্র অবস্থান করছিল।

গতকাল রোববার দিবাগত রাত আনুমানিক তিনটার দিকে শেবু সরকার বাড়ির লোকজন বহিরাগত লোকজন নিয়ে এলাকায় ফিরে আসেন। আজ ভোর চারটার দিকে শেবু সরকারের নাতি মোক্তার হোসেনের নেতৃত্বে একদল লোক বন্দুক, রামদা, ছুরি, টেঁটা, বল্লম ও এককাইট্টা (দেশীয় ধারালো অস্ত্র) নিয়ে প্রতিপক্ষ আজগর আলী সরকার বাড়ির লোকজনের ওপর হামলা চালায়। এ সময় প্রতিপক্ষের লোকজনও পাল্টা হামলা চালায়। সংঘর্ষের সময় ককটেল বিস্ফোরণ ও গুলির শব্দ শোনা যায়।

খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এ সময় ঘটনাস্থল থেকে দেশীয় একটি বন্দুকসহ পাঁচটি গুলি ও পাঁচটি তাজা ককটেল উদ্ধার করে পুলিশ। এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

গ্রাম পুলিশ আবদুর রহমান জানান, ‘ভোরে ককটেল বিস্ফোরণের শব্দ শুনে ঘুম থেকে উঠি। এ সময় গুলির শব্দও শুনতে পাই।’ তিনি বলেন, মুক্তার হোসেনের লোকজনের সঙ্গে আজগর আলী বাড়ির লোকজনের সংঘর্ষ হয়। আহত দুজনকে হাসপাতালে নেওয়া হলে একজন মারা যান।

আজগর আলী সরকার বাড়ির ইসমাইল মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘মুক্তারের নেতৃত্বে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ডাকাতেরা ককটেল বিস্ফোরণসহ রাইফেল ও বন্দুক নিয়ে আমাদের ওপর হামলা চালায়। পরে গ্রামের লোকজন তাদের ঘেরাও করে প্রতিহতের চেষ্টা করে। গুলি ও ককটেলের আঘাতে আমাদের পাঁচজন আহত হয়। হামলাকারী বেশির ভাগ নরসিংদী এলাকার লোকজন।’

হামলার পর গ্রামবাসী ধাওয়া করলে মুক্তারের লোকজন পালিয়ে যায় বলে জানান ইসমাইল মিয়া। তিনি আরও বলেন বলেন, ‘আড়াই মাস আগে মুক্তার আমাদের লোকজনের ওপর হামলা করেছিল। সে সময় গ্রামবাসী প্রতিহত করেছিল। এর পর থেকে মুক্তারসহ তাঁর লোকজন এলাকাছাড়া ছিল।’

জানতে চাইলে শেবু সরকার বাড়ির মুক্তার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘১০০ বছর ধরে আজগর আলী বাড়ির সঙ্গে আমাদের বিরোধ। তিন মাসে আগে তাঁদের সঙ্গে এলাকায় সংঘর্ষ হয়। এর পর থেকে আমাদের এক শ–দেড় শ লোক এলাকার বাইরে নরসিংদীর মাধবদী থানায় অবস্থান করছিল। গতকাল রোববার রাতে কিছু লোকজন বাড়ি ফেরে।’

বহিরাগত নিয়ে হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেন মুক্তার হোসেন। তিনি বলেন, ‘আজ ভোরে আরও কিছু লোকজন বাড়ি ফিরলে প্রতিপক্ষের লোকজন টেঁটা, ককটেল নিয়ে আমাদের ওপর হামলা চালায়। চাচাতো ভাই দুলাল মিয়ার মেয়ের শ্বশুরবাড়ি থেকে বেড়াতে আসা আত্মীয় জুয়েল টেঁটাবিদ্ধ হয়ে মারা যান। নরসিংদীর আরেক আত্মীয়কে অস্ত্র দিয়ে পুলিশে ধরিয়ে দিয়েছে প্রতিপক্ষের লোকজন।’

বাঞ্ছারামপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ ইয়াসিন প্রথম আলোকে বলেন, এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বহু বছর ধরে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ চলে আসছে। ভোরে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় টেঁটাবিদ্ধ হয়ে জুয়েল নামের একজন নিহত হন।