সুনামগঞ্জে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার সাক্ষীর বাড়িতে হামলা–ভাঙচুর, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ

সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার দৌলতপুর গ্রামের দুলাল মিয়ার বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছেছবি: সংগৃহীত

সুনামগঞ্জের শাল্লায় একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলার এক সাক্ষীর বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। হামলায় ওই পরিবারের পাঁচজন আহত হয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার রাতে উপজেলার দৌলতপুর গ্রামের দুলাল মিয়ার বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় আজ রোববার পরিবারটির পক্ষ থেকে থানায় মামলা করার প্রস্তুতি চলছে।

দুলাল মিয়া ২০১৬ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে করা একটি মামলার সাক্ষী। তাঁর বাবা মামুদ মিয়া ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় শহীদ হন। তাঁর বোন জমিলা খাতুনও মুক্তিযোদ্ধার (বীরাঙ্গনা) স্বীকৃতি পেয়েছেন।

দুলাল মিয়া অভিযোগ করে বলেন, বৃহস্পতিবার রাতে গ্রামের বাসিন্দা জালাল মিয়া, আবদুল হেকিম ও তাঁদের পরিবারের সদস্যসহ অনেকে লাঠিসোঁটা নিয়ে তাঁদের বাড়িতে হামলা করেন। এ সময় ঘরের আসবাব, টেলিভিশন ও রেফ্রিজারেটর ভাঙচুর করা হয়। ছয়টি গরু, স্বর্ণালংকার, টাকাপয়সা ছিনিয়ে নিয়ে যায়।

দুলাল মিয়ার অভিযোগ, নিজের দোকানে চুরি হলে পুলিশকে জানানোর পর তদন্ত করার জন্য গ্রামে পুলিশ আসে। এতে গ্রামের অনেকে ক্ষুব্ধ হন। এ ছাড়া যুদ্ধাপরাধ মামলার সাক্ষী হওয়ায় আসামি ও তাঁদের স্বজনেরা তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন। সেই ক্ষোভ থেকে তাঁর বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়।

তবে অভিযুক্ত ব্যক্তি ও স্থানীয় লোকজনের দাবি, দুলাল মিয়ার ছেলেসহ তাঁর পরিবারের সদস্যরা মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। মাদকের মামলায় তাঁরা কারাগারেও গেছেন। মাদকের কারণে অতিষ্ঠ হয়েই এলাকার লোকজন এই হামলা করেন।

গ্রামের জালাল মিয়া, আব্দুল হেকিমের পরিবারের লোকজন এই হামলা করেছে। এখনো তাঁরা হুমকি দিচ্ছেন। তাঁরা (দুলালের পরিবার) এখন শাল্লা উপজেলা সদরে আছেন। এখন মামলা করতে থানায় যাচ্ছেন।
উজলা আক্তার, ভুক্তভোগী দুলাল মিয়ার মেয়ে

ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দুলাল মিয়ার মেয়ে উজালা আক্তার ও তাঁর স্বামী হেলাল মিয়া তাঁদের সঙ্গে বসবাস করেন। জামাতা–শ্বশুর মিলে বাড়ির সামনে একটি দোকান চালান। গত ২৩ অক্টোবর ওই দোকানে চুরি হয়। এরপর বিষয়টি পুলিশকে জানালে ২৯ অক্টোবর ঘটনা তদন্ত করতে আসে পুলিশ। তারা চলে যাওয়ার পর গ্রামে কেন পুলিশ এল—এ নিয়ে অনেকে ক্ষুব্ধ হন।

দুলাল মিয়া অভিযোগ করে বলেন, বৃহস্পতিবার রাত নয়টার দিকে দৌলতপুর গ্রামের বাসিন্দা জালাল মিয়া, আবদুল হেকিম ও তাঁদের পরিবারের সদস্যসহ অনেকে লাঠিসোঁটা নিয়ে তাঁদের বাড়িতে হামলা করেন। এ সময় পরিবারের সদস্যদের মারধর করা হয়। ঘরের আসবাব, টেলিভিশন ও রেফ্রিজারেটর ভাঙচুর করা হয়। ছয়টি গরু, স্বর্ণালংকার, টাকাপয়সা ছিনিয়ে নিয়ে যায়।

শাল্লা উপজেলার দৌলতপুর গ্রামের দুলাল মিয়ার বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে
ছবি: সংগৃহীত

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ১৯৭১ সালে শাল্লা উপজেলার উজাননগাঁও, শ্যামারচর ও পেরুয়া গ্রামে গণহত্যা, অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ২০১৬ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একটি মামলা করেন পেরুয়া গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা রজনী দাস। মামলায় স্থানীয় জুবায়ের মুনির, জাকির হোসেন, সিদ্দিকুর রহমান, দৌলতপুর গ্রামের আবদুল হেকিম, আবদুল গণি মিয়া, তোতা মিয়াসহ ১১ জন গ্রেপ্তার হন। এই মামলার সাক্ষী দুলাল মিয়া।

আমরা এর সঙ্গে জড়িত নই। এই পরিবার এলাকায় মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত। এ কারণে এলাকার লোকজন তাঁদের ওপর হামলা করতে পারে।
অভিযুক্ত জালাল মিয়া

দুলাল মিয়ার মেয়ে উজলা আক্তার রোববার সকালে মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, গ্রামের জালাল মিয়া, আব্দুল হেকিমের পরিবারের লোকজন এই হামলা করেছে। এখনো তাঁরা হুমকি দিচ্ছেন। তাঁরা (দুলালের পরিবার) এখন শাল্লা উপজেলা সদরে আছেন। এখন মামলা করতে থানায় যাচ্ছেন।

অভিযুক্ত জালাল মিয়া মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার আসামি আবদুল গণি মিয়ার ছেলে। অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা এর সঙ্গে জড়িত নই। এই পরিবার এলাকায় মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত। এলাকার মাদকবিরোধী ঐক্য পরিষদের পক্ষ থেকে বারবার তাঁদের এই ব্যবসা থেকে সরে আসার অনুরোধ করা হয়েছে। কিন্তু তাঁরা ব্যবসা ছাড়েননি। এ কারণে এলাকার লোকজন তাঁদের ওপর হামলা করতে পারে।’

পুলিশ জানিয়েছে, এই পরিবারের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসার অভিযোগ আছে। গত চার বছরে তাঁদের বিরুদ্ধে মাদক, চুরিসহ অন্তত ২৫টি মামলা হয়েছে। দুলাল মিয়ার ছেলে, মেয়ে, মেয়ের জামাই মাদক মামলায় কারাগারে গেছেন।

তবে দুলাল মিয়ার ভাষ্য, মূলত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাক্ষী হওয়ায় তাঁর ছেলে, জামাতা ও মেয়েকে মিথ্যা মামলায় জেল খাটানো হয়েছে। এখনো এই হামলার পেছনে মাদক বলে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।

শাল্লা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সুহেল রোববার দুপুর ১২টায় প্রথম আলোকে বলেন, পরিবারটি এখন থানায় আছে। পুলিশ ঘটনার পরপরই মামলা করতে বলেছে। তাঁদের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসার অভিযোগ আছে, এটা ঠিক। কিন্তু সেটা পুলিশ দেখবে। এ জন্য কেউ কারও বাড়িতে হামলা করতে পারেন না। এ বিষয়ে অভিযোগ পেলে অবশ্যই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।