ঈদের সকালটা অন্য দিনের মতোই শুরু হয়েছিল। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঈদের নামাজ পড়েন এমদাদুল ইসলাম। তাঁদের বাড়িতে পশু কোরবানি হয়নি। তাই বিকেলে বড় বোনের শ্বশুরবাড়িতে যান কোরবানির মাংস আনতে। সেখানে কিছুটা সময় কাটান। স্বজনদের সঙ্গে গল্প করেন। সন্ধ্যার পর মাংস নিয়ে বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন। কেউ জানতেন না, সেটিই হবে স্বজনদের সঙ্গে তাঁর শেষ দেখা।
গত বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে আটটার দিকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের কর্ণফুলী উপজেলার শিকলবাহা এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ২৮ বছর বয়সী এমদাদুল ইসলাম। তাঁর সঙ্গে আরও তিনজন নিহত হন। তাঁরা সবাই চার চাকার একটি লেগুনায় ছিলেন। কক্সবাজার থেকে ছেড়ে আসা চট্টগ্রামমুখী ঈগল পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে লেগুনাটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে আশপাশ। মুহূর্তেই দুমড়েমুচড়ে যায় লেগুনাটি। আহত হন অন্তত ১০ জন।
পটিয়ার আশিয়া ইউনিয়নের মল্লাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা এমদাদুল ইসলাম ছিলেন মৃত আবদুল মোমিনের দ্বিতীয় ছেলে। দুই ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট। পরিবারের আদরের সন্তান। মায়ের সবচেয়ে বেশি স্নেহ পাওয়া ছেলেও ছিলেন তিনি। সংসারের নানা কাজে যাঁকে সবার আগে ডাকা হতো।
এমদাদুলের মামাতো ভাই কামরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘ঈদের দিন বিকেলে এমদাদুল বোনের শ্বশুরবাড়ি থেকে কোরবানির মাংস আনতে গিয়েছিল। রাতে মাংস নিয়ে বাড়ি ফিরছিল। আমরা কল্পনাও করিনি, কয়েক ঘণ্টা পর তার মৃত্যুর খবর শুনতে হবে। ’
কামরুল বলেন, দুর্ঘটনার কিছুক্ষণ পর এমদাদুলের মুঠোফোন থেকে কল আসে। তখন জানানো হয়, ভাই দুর্ঘটনায় আহত হয়েছে। খবর পেয়ে স্বজনেরা দ্রুত ঘটনাস্থল ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছুটে যেতে যেতে সব শেষ।
হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে তখন স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, এমদাদুলের মা বুক চাপড়ে কাঁদছেন। বারবার বলছেন, ‘আমার ছেলেকে কোথায় পাব? আমার ছেলেকে এনে দে তোরা। আমার ছেলেকে এনে দে।’
মায়ের কান্না থামছিল না। কখনো ছেলের নাম ধরে ডাকছিলেন, কখনো নিথর হয়ে বসে থাকছিলেন। পাশে বসা মেয়েও কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন। স্বজনেরা তাঁদের সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। যে ছেলে সকালে ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়ে ঘর থেকে বের হয়েছিলেন, রাতে তাঁর নিথর দেহ দেখতে হবে—এ বাস্তবতা তাঁরা কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না।
স্বজনেরা জানান, পটিয়ার আমজুরহাট এলাকার একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন এমদাদুল। সংসারে টানাপোড়েন ছিল। তবু পরিবারকে নিয়ে তাঁর অনেক স্বপ্ন ছিল। শান্ত স্বভাবের ও পরিশ্রমী একজন তরুণ ছিলেন তিনি। কারও সঙ্গে তাঁর বিরোধ ছিল না। গ্রামের মানুষের প্রয়োজনে এগিয়ে আসতেন। সবার সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতেন। আজ শুক্রবার জুমার নামাজের পর গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়েছে। জানাজায় কয়েক শ মানুষ অংশ নেন।